শাহাজাদা এমরান, স্টাফ রিপোর্টার, কুমিল্লা : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও তৈরি, দামি মোবাইল ফোন ও মোটরসাইকেলকে কেন্দ্র করে কুমিল্লা নগরীতে কিশোর-তরুণদের বিভিন্ন দল সক্রিয় হয়ে উঠছে। এসব দলের কেউ কেউ প্রকাশ্যে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিচ্ছে। এতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় তৈরি হচ্ছে আতঙ্ক। সাম্প্রতিক অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুমিল্লা শহরে বর্তমানে অন্তত ২০টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। চলতি বছরের সাড়ে আট মাসে অন্তত ২৫টি আলোচিত অপরাধের ঘটনায় এসব দলের সদস্যদের নাম এসেছে। সর্বশেষ ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে আইফোন ছিনিয়ে হত্যা করার ঘটনায় দুই কিশোরসহ কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। এ ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সামনে এসেছে। এর আগে গত মে মাসে কুমিল্লার গোমতী নদীর তীরবর্তী ভাটারপুকুর থেকে কাপ্তানবাজার, বৌবাজার, চানপুর ও সংরাইশ এলাকায় শতাধিক কিশোর ও তরুণের অস্ত্র নিয়ে মহড়ার ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ১০০ থেকে ১৫০ জন কিশোর-তরুণ ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে রামদা, চাপাতি ও লাঠি নিয়ে এলাকায় ঘোরাফেরা করে। তাদের সামনে উচ্চ শব্দে মোটরসাইকেল চলছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দিয়েই ওই মহড়া দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।
কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি তৌহিদুল আনোয়ার ওই সময় দলটির নাম ‘ক্রাইম সেটআপ’ বলে জানিয়েছিলেন। পুলিশের নজরে ওই দলটির আত্মপ্রকাশের বিষয়টি সেদিনই আসে। কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা অবশ্য কুমিল্লায় নতুন নয়। ২০১৫ সালের দিকে নগরীতে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। তখন তিন-চারটি দল সক্রিয় থাকলেও ২০২২ সালের দিকে এ সংখ্যা কমপক্ষে ২০টিতে পৌঁছায়। শাখা ও উপদল বিবেচনায় সংখ্যা আরও বেশি ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। নগরীর কান্দিরপাড়, ধর্মসাগর, রানীর দিঘি, তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়াসহ কয়েকটি এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ও সংঘাতের ঘটনা বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। হাউজিং এলাকার কেটিসিসি মাঠে ‘কিং স্কোয়াড’ এবং গোমতীর তীরবর্তী ভাটারপুকুর, কাপ্তানবাজার, বৌবাজার, চানপুর ও সংরাইশ এলাকায় ‘ক্রাইম সেটআপ’-এর তৎপরতার তথ্যও পাওয়া গেছে।
গত বছরের ২৫ এপ্রিল রানীর দিঘির পাড়ে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে কিশোরদের মহড়ার ঘটনায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়ায়। একই বিকেলে তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়াতেও অস্ত্রধারী কিশোরদের উপস্থিতির কথা জানা যায়। এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতেও রানীর দিঘির পাড়ে অস্ত্রের মহড়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৩০ নভেম্বর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ২৫০ জনের বেশি কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে বয়স কম হওয়ায় গ্রেপ্তারের পর অনেকেই দ্রুত মুক্তি পেয়ে একই ধরনের অপরাধে আবার জড়িয়ে পড়ছে। অনেকের অভিভাবককে ডেকে মুচলেকাও নেওয়া হয়েছে। অপরাধের ধরনেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। টিকটক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও তৈরির মাধ্যমে কিশোরদের একত্র করা, দামি মোবাইল ফোন ব্যবহার, মোটরসাইকেল নিয়ে উচ্চ শব্দে
চলাফেরা এবং নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের প্রবণতা এসব দলের মধ্যে রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপ ব্যবহার করেও সদস্য সংগ্রহ ও যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, দামি মোবাইল ফোন ও মোটরসাইকেলকেন্দ্রিক বন্ধুত্বের বিষয়টি সামনে এসেছে। মামলার প্রধান অভিযুক্ত ১৯ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম তুহিনও একটি কিশোর গ্যাং গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অপ্রতিমকেও ওই দলে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য রয়েছে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও অপ্রতিম হত্যার পর কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। গত মঙ্গলবার ক্যাম্পাসে মৌন মিছিল করে তাঁরা এ দাবি জানান। একই সঙ্গে অপ্রতিম হত্যার পেছনে অন্য কোনো কারণ বা পূর্ববর্তী বিরোধ ছিল কি না, তা তদন্তের দাবিও ওঠে।
কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সংঘর্ষ, অস্ত্রের মহড়া ও অপরাধের ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু অভিযান ও গ্রেপ্তারের মাধ্যমে এ সমস্যা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, চলাফেরা ও বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও অভিভাবকদের নজরদারি প্রয়োজন। সচেতন নাগরিক কমিটি কুমিল্লার সভাপতি অধ্যাপক নিখিল চন্দ্র রায় বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সতর্ক হওয়ার পাশাপাশি সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে এবং কী করছে—সেদিকে পরিবারেরও নজর রাখা প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে নাগরিক অধিকার ফোরাম কুমিল্লার সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক কুমিল্লার জমিনের সম্পাদক শাহাজাদা এমরান বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি কুমিল্লার সামাজিক নিরাপত্তার জন্যও একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিকটক ভিডিও, দলবদ্ধ চলাফেরা, মোটরসাইকেলের মহড়া এবং প্রকাশ্যে দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শনের মতো কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কিশোর-তরুণদের একটি অংশ অপরাধের দিকে জড়িয়ে পড়ছে। এদের নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করলেই হবে না; একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে কারা প্রভাব বা পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিভাবকদের সন্তানদের চলাফেরা, বন্ধুত্ব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আজকের কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরাই আগামী দিনে আরও বড় অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারে।