মো. কামরুল ইসলাম, নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি : নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। নদীর পাড়জুড়ে দুলছে ধবধবে সাদা কাশফুল। কখনো মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে রোদ, আবার কখনো মৃদু বাতাসে একসঙ্গে দুলে উঠছে কাশের শীষ। শরতের এমন নান্দনিক সৌন্দর্যে সেজেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার পশ্চিম ইউনিয়নের মেঘনাপাড়। কাশবনের শুভ্রতা আর মেঘনার বিস্তীর্ণ জলরাশি মিলে সেখানে তৈরি হয়েছে প্রকৃতির এক মনোরম দৃশ্য।
শরতের এই সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিনই মেঘনাপাড়ে ছুটে আসছেন স্থানীয় মানুষ। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, আবার কেউ একাই চলে আসছেন প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছুটা সময় কাটাতে। নদীর সোনালি বালুতে পড়ে থাকছে দর্শনার্থীদের পায়ের ছাপ। কাশফুলের ফাঁকে ফাঁকে চলছে ছবি তোলার আয়োজন। প্রকৃতির এই সাজ যেন ব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমি থেকে মানুষকে সাময়িক মুক্তি দিচ্ছে।
বর্ষার শেষভাগে প্রকৃতিতে শরতের আগমনী বার্তা পাওয়া যায়। আকাশে সাদা মেঘের আনাগোনা, বাতাসে কোমলতা আর মাঠ-ঘাটে কাশফুলের দোলা জানান দেয় ঋতু পরিবর্তনের কথা। শরৎকে বলা হয় শুভ্রতার ঋতু। শিউলি, স্বচ্ছ নীল আকাশ, জ্যোৎস্না আর কাশফুল—সব মিলিয়ে বাংলার প্রকৃতিতে শরতের রয়েছে আলাদা পরিচয়।
নবীনগরের বিভিন্ন নদীর পাড়, চরাঞ্চল, জলাভূমি ও অপেক্ষাকৃত শুকনো এলাকায় এখন দেখা যাচ্ছে কাশফুল। তবে পশ্চিম ইউনিয়নের মেঘনাপাড়ের কাশবন স্থানীয় মানুষের কাছে বিশেষ আকর্ষণের জায়গা হয়ে উঠেছে। প্রাকৃতিকভাবেই গড়ে ওঠা এসব কাশবনে এখন প্রতিদিনই দর্শনার্থীদের আনাগোনা।
কাশফুল দেখতে আসা তাহসিন তাবাসসুম, শাহরিয়ার , সজিব ও তাসনিম বলেন, “যান্ত্রিক নাগরিক জীবনের একঘেয়েমি কাটানোর জন্য এখানে আসি। কাশফুলের শুভ্রতা মনকে প্রশান্ত করে। এখানকার পরিবেশও খুব ভালো। তাই পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে সময় কাটাতে ভালো লাগে।”
বন্ধুদের নিয়ে কাশবন দেখতে এসেছিলেন কবি আবদুল কাদির। কাশফুলের সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “বৃষ্টি আর রোদ-ছায়ার খেলার মধ্য দিয়ে যখন কাশবন ধবধবে সাদা ফুলে ভরে ওঠে, তখন মৃদু বাতাসে দুলতে থাকা কাশফুল দেখে মন ভরে যায়। মনে হয়, এটি সৃষ্টিকর্তার অপূর্ব এক সৃষ্টি।”
বাংলা সাহিত্যেও কাশফুলের উপস্থিতি দীর্ঘদিনের। শরতের প্রকৃতি বর্ণনায় কবি-সাহিত্যিকেরা কাশফুলকে ব্যবহার করেছেন নানা উপমা ও চিত্রকল্পে। গ্রামবাংলার নদীর পাড়, চরাঞ্চল কিংবা বিস্তীর্ণ মাঠে কাশফুলের দোলা শরতের চিরচেনা দৃশ্যের অংশ হয়ে আছে। তাই কাশফুল শুধু একটি উদ্ভিদ নয়, বাঙালির ঋতুচেতনা ও প্রকৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি পরিচিত প্রতীক।
নবীনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম লিটন বলেন, কাশ ঘাসজাতীয় উদ্ভিদ। এর মঞ্জরিদণ্ড সাধারণত ১৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। বীজে সূক্ষ্ম সাদা লোম থাকে। কাশের পাতা রুক্ষ এবং শিরাবিন্যাস সমান্তরাল। এর ফুল পালকের মতো নরম ও সাদা। নদীর পাড়, জলাভূমি, চরাঞ্চল ও অপেক্ষাকৃত শুকনো জায়গায় কাশ জন্মাতে দেখা যায়।
নবীনগরের মেঘনাপাড়ে এখন শরৎ যেন মানুষের জন্যও এক উৎসব নিয়ে এসেছে। শহরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে মানুষ আসছেন নদীর কাছে, কাশবনের কাছে। কেউ দাঁড়িয়ে দেখছেন সাদা ফুলের দোলা, কেউ নদীর বাতাসে মুগ্ধ হয়ে বসে আছেন, আবার কেউ মুঠোফোনে ধারণ করছেন সেই মুহূর্ত।
ঋতু বদলের সঙ্গে একসময় কাশফুল ঝরে যাবে। বদলে যাবে প্রকৃতির এই শুভ্র সাজও। কিন্তু তার আগে নবীনগরের মেঘনাপাড়ে নীল আকাশ, সাদা মেঘ, মেঘনার জল আর দিগন্তজোড়া কাশফুল মিলে যেন এঁকে দিয়েছে শরতের এক জীবন্ত ছবি। সেই ছবির টানেই প্রতিদিন সেখানে ছুটে যাচ্ছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা।