হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর প্রতিনিধি: টানা চার দিনের সংঘর্ষ, হামলা ও বাড়িঘর ভাঙচুরের পর প্রশাসনের উদ্যোগে সমঝোতা বৈঠকের মাধ্যমে শান্ত হয়েছিল ফরিদপুরের বোয়ালমারী-সালথা উপজেলা সীমান্তের ময়েনদিয়া-খারদিয়া এলাকা। কিন্তু সেই শান্তি স্থায়ী হলো না একদিনও।
মীমাংসার ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে ফের হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনায় দুই পক্ষের দুই যুবক কুপিয়ে জখম হয়েছেন। এ ঘটনায় এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, যেকোনো সময় আবারও বড় ধরনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বোয়ালমারী উপজেলার পরমেশ্বরদী ইউনিয়নের ময়েনদিয়া বাজার ও পাশের সালথা উপজেলার খারদিয়া এলাকা ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের বিরোধ চলে আসছে। বাজারের নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দিনে এ বিরোধ সংঘর্ষে রূপ নেয়।
গত শুক্রবার থেকে সোমবার পর্যন্ত দফায় দফায় হামলা ও সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হন। তাদের মধ্যে গুরুতর আহত তিনজনকে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সোমবার সকালে ধুলজোড়া সেতু এলাকায় ফের সংঘর্ষের পাশাপাশি কয়েকটি বাড়িতে ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মঙ্গলবার রাতে বোয়ালমারী ও সালথা উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দুই পক্ষের লোকজনকে নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে দুই উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সংঘাত বন্ধ করে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য দুই পক্ষকে সতর্ক করা হয়।
তবে বৈঠকের পরদিন বুধবার বিকেলেই ফের হামলার ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, পরমেশ্বরদী এলাকায় জাকারিয়া নামে এক যুবককে কুপিয়ে আহত করা হয়। স্থানীয়ভাবে তিনি সালথার খারদিয়া গ্রামের মুশফিক বিল্লাহ জিহাদের সমর্থক হিসেবে পরিচিত। এর কিছুক্ষণ পর সিফাত নামে অপর এক যুবকও হামলার শিকার হন। স্থানীয়ভাবে তিনি ময়েনদিয়ার আবদুল মান্নান মাতুব্বরের সমর্থক হিসেবে পরিচিত।
পৃথক ঘটনায় দুই পক্ষের দুই যুবক আহত হওয়ায় এলাকায় ফের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। দুটি ঘটনার জন্যই পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। তবে হামলায় কারা জড়িত, তা তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।
স্থানীয় সূত্র ও এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, ময়েনদিয়ার আবদুল মান্নান মাতুব্বরের সঙ্গে খারদিয়ার মুশফিক বিল্লাহ জিহাদের পরিবারের বিরোধ দীর্ঘদিনের। জিহাদের বাবা মাওলানা আবুল কালাম আজাদ একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আসামি ছিলেন। ওই মামলায় আবদুল মান্নান মাতুব্বরকে প্রধান সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পরে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আজাদ দেশে ফেরেন বলে স্থানীয় সূত্র জানায়।
সময়ের সঙ্গে পুরোনো পারিবারিক বিরোধের সঙ্গে স্থানীয় রাজনীতি, ময়েনদিয়া বাজারের নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারের বিষয়টি যুক্ত হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান। সীমান্তবর্তী হওয়ায় বাজারটির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতাও রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিরোধ আরও প্রকাশ্য রূপ নেয়। এরপর বিভিন্ন সময় দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে হামলা, সংঘর্ষ ও বাড়িঘর ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।
মীমাংসার পরদিন ফের হামলার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ‘হাছিবুল’ নামে এক ব্যক্তি ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন, কয়েক দিনের সংঘাতের পর প্রশাসনের উদ্যোগে সমঝোতা হলেও পরদিনই খারদিয়ার এক যুবক হামলার শিকার হয়েছেন। তিনি দ্রুত জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং জয়পাশা বাজারসহ আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ও নিয়মিত টহলের দাবি জানান।
তবে ওই ফেসবুক পোস্টে করা অভিযোগেরও স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বোয়ালমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মঙ্গলবার রাতে দুই উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দুই পক্ষের সঙ্গে মীমাংসা বৈঠক হয়েছে। সেখানে দুই থানার রাজনৈতিক নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। কেউ আইন অমান্য করে পুনরায় হামলা বা সংঘাতে জড়ালে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ‘জাকারিয়া আহত হওয়ার ঘটনায় অভিযোগ পেয়েছি। এ ঘটনায় মামলা হবে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত আছে। আগের সংঘর্ষের ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।’
সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দাবিরউদ্দিন বলেন, মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব। বিরোধ নিরসনে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, আলোচনার মাধ্যমেও উত্তেজনা প্রশমনের প্রয়োজন রয়েছে। শান্তিপ্রিয় মানুষ ও রাজনৈতিক কর্মীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম রাকিবুল হাসান বলেন, এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রশাসন সব সময় কাজ করছে। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ও মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে।
ফরিদপুর সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সদস্য হাসানউজ্জামান বলেন, দীর্ঘদিনের বিরোধ নিরসনে প্রশাসনের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে স্থায়ী সমাধান না হলে এ ধরনের সংঘাত আবারও ফিরে আসতে পারে। মানুষের জানমাল রক্ষায় প্রয়োজন হলে প্রশাসনকে একাধিকবার আলোচনায় বসতে হবে। আধিপত্যের বিরোধে আর কোনো প্রাণহানি বা সম্পদের ক্ষতি কাম্য নয়।