মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক : সিলেট—প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য ও শান্তিপ্রিয় মানুষের শহর হিসেবে অধিক পরিচিতি, সেই সিলেটে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক হত্যাকাণ্ড উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে। কখনো জমি নিয়ে বিরোধ, কখনো পারিবারিক কলহ, কখনো পূর্বশত্রুতা, আবার কখনো অপরাধজগতের দ্বন্দ্ব—বিভিন্ন কারণেই ঝরছে মানুষের প্রাণ। প্রশ্ন উঠছে, সিলেটে কেন থামছে না খুনোখুনি? আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে?
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিষয়টির ভয়াবহতা নতুন করে সামনে এনেছে। জুলাই মাসে সিলেটের জালালাবাদ এলাকায় জমি-সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে আব্দুল্লাহ আল মামুন নামে এক যুবককে হামলা চালিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও কয়েকজনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা হয়েছে। একই সময়ে সিলেটে পৃথক দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আসামিদের চিহ্নিত করার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
এর আগে চার বছরের শিশু ফাহিমা হত্যাকাণ্ড সিলেটবাসীর বিবেককে নাড়া দিয়েছে। মামলার প্রধান আসামিকে আদালতে নেওয়ার সময় উত্তেজিত জনতার হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনা শুধু অপরাধের বিস্তার নয়, আইনের প্রতি মানুষের আস্থার সংকটেরও ইঙ্গিত দেয়। মানুষ যখন বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে, তখন কেউ কেউ নিজের হাতেই বিচার তুলে নিতে চায়। এটি রাষ্ট্র ও সমাজ—উভয়ের জন্যই ভয়ংকর বার্তা।
সিলেটে হত্যাকাণ্ডের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো তুচ্ছ বিরোধের দ্রুত সহিংসতায় রূপ নেওয়া। জমি, সীমানা, পারিবারিক সম্পত্তি, ব্যবসায়িক স্বার্থ কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুতার মতো বিষয়গুলো বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। বিরোধ মীমাংসার কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে গড়ায়। অস্ত্রের সহজলভ্যতা এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের প্রশ্রয় পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
আরেকটি বড় কারণ মাদক ও কিশোর অপরাধের বিস্তার। মাদকাসক্তি মানুষের বিবেক ও নিয়ন্ত্রণবোধ দুর্বল করে। এর সঙ্গে যখন অপরাধীচক্রের যোগাযোগ তৈরি হয়, তখন ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মারামারি থেকে হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত ঘটতে পারে। সিলেট মহানগর পুলিশ অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, মাদক ও কিশোর গ্যাং দমনে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করেছে বহু ব্যক্তিকে। কিন্তু অভিযানই শেষ কথা নয়; অপরাধের সামাজিক শিকড়ও উপড়ে ফেলতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব অবশ্যই সবচেয়ে বেশি। হত্যাকাণ্ডের পর মামলা নেওয়া, আসামি গ্রেপ্তার এবং তদন্ত করা জরুরি। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো অপরাধ ঘটার আগেই তা প্রতিরোধ করা। কোনো এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে জমি নিয়ে বিরোধ, সন্ত্রাসী তৎপরতা বা আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চললে প্রশাসনকে আগেই সক্রিয় হতে হবে। সম্ভাব্য সংঘাতের জায়গাগুলো চিহ্নিত করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পুলিশ ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
একই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে হবে। কোনো হত্যাকাণ্ডের পর আসামি গ্রেপ্তার হলেও যদি বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, তাহলে অপরাধীদের মধ্যে আইনের ভয় কমে যায়। অপরাধীরা বুঝতে পারে, মামলা হলেও দ্রুত শাস্তির সম্ভাবনা কম। তাই তদন্তে গাফিলতি, সাক্ষী সুরক্ষার দুর্বলতা কিংবা বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা—কোনোটিই আর চলতে দেওয়া যায় না।