শিরোনাম
◈ মিয়ানমারের স্ক্যাম কারখানার নেপথ্যে যেভাবে কাজ করে আন্তর্জাতিক মাফিয়া নেটওয়ার্ক ◈ হবিগঞ্জে এনসিপির জুলাই পদযাত্রায় হামলায় আহত সারজিস-পাটওয়ারী, জানালেন আসিফ মাহমুদ (ভিডিও) ◈ পুলিশসহ সরকারি কর্মকর্তাদের নাম ভাঁড়িয়ে প্রতারণা বেড়েছে, সতর্ক করল পুলিশ ◈ এক বছরে বাংলাদেশ রেলওয়ের আয় বেড়েছে ২২১ কোটি টাকা ◈ দেশে বিক্রি হওয়া যে ৮ টুথপেস্টে কোনো মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি ◈ ওয়ান‌ডে দ‌লের অধিনায়কত্ব হারাচ্ছেন মিরাজ, দা‌য়িত্ব পে‌তে পা‌রেন লিটন দাস! ◈ ভলিবল চ্যাম্পিয়নশিপে উজবেকিস্তানকে হা‌রি‌য়ে ফাইনালে বাংলাদেশ ◈ বিশ্ব ফুটবল পরিচালনার জন্য অযোগ্য ইনফান্তিনো: প‌রিচালক, মান‌বা‌ধিকার সংস্খ ◈ ‘রাত ১২টায় পুকুরপাড়ে দেখা করলে মিলবে ফ্যামিলি কার্ড’ ◈ রাষ্ট্রপতি হওয়ার খবর গুজব, বললেন মির্জা ফখরুল

প্রকাশিত : ২৮ জুলাই, ২০২৬, ০৮:১২ রাত
আপডেট : ২৮ জুলাই, ২০২৬, ১০:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

কক্সবাজারে বন্যায় পান চাষের ব্যাপক ক্ষতি : মহেশখালীতে ভেঙেছে শত শত বরজ, দিশেহারা হাজারো চাষি

সরওয়ার আজম মানিক, কক্সবাজার : চলতি মাসের শুরুতে টানা ছয় দিনের অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক বন্যায় কক্সবাজার জেলাজুড়ে কৃষিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে কক্সবাজার জেলার অন্যতম রপ্তানিযোগ্য কৃষিপণ্য পান। বন্যার পানিতে দিনের পর দিন তলিয়ে থাকা এবং প্রবল ঝড়-বাতাসে বরজ ভেঙে পড়ায় জেলার শত শত পানের বরজ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। বিশেষ করে মহেশখালী উপজেলার পান চাষিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেক চাষি ঋণ নিয়ে কিংবা স্ত্রীর স্বর্ণ বন্ধক রেখে বরজ তৈরি করেছিলেন। বন্যার ধাক্কায় সেই স্বপ্ন এখন ধুলিসাৎ। ফলে তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবারের বন্যায় কক্সবাজার জেলায় ১৬৬ হেক্টর জমির পানের বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় আড়াই হাজার পান চাষি সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তবে মাঠ পর্যায়ের চাষিদের দাবি, সরকারি হিসাবের চেয়েও প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানান, পান অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি ফসল। গাছের গোড়ায় এক দিনের বেশি পানি জমে থাকলেই শিকড় পচে যায় এবং পুরো বরজ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এবার বন্যার সময় পাহাড়ি ঢলের পানি অনেক বরজের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। কোথাও কোথাও কয়েক দিন ধরে পানি জমে ছিল। এর সঙ্গে ঝড়ো হাওয়ায় অসংখ্য বরজের বাঁশের কাঠামো ভেঙে পড়ে। ফলে পানগাছ মরে গেছে এবং উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

কক্সবাজারে সবচেয়ে বেশি পান চাষ হয় মহেশখালী উপজেলায়। এখানকার মিষ্টি পান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যসহ কয়েকটি বিদেশি বাজারেও রপ্তানি হয়। এই শিল্পকে ঘিরে হাজারো পরিবারের জীবিকা নির্ভরশীল।

মহেশখালী পান চাষি কল্যাণ সমিতির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, "মহেশখালীর মিষ্টি পানের চাহিদা শুধু দেশে নয়, বিদেশেও রয়েছে। কিন্তু এবারের বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে এই পান চাষে। অনেক কৃষক ব্যাংক ঋণ নিয়েছেন, কেউ আবার স্বর্ণ বন্ধক রেখে বরজ করেছেন। এখন সব শেষ হয়ে গেছে। এত বড় ক্ষতির পরও অনেক এলাকায় কৃষি বিভাগের কেউ এসে খোঁজ নেয়নি।"

মহেশখালী উপজেলার কালারমারছড়া ইউনিয়নের চিকনি পাড়া গ্রামের পান চাষি শাহাদত কবির বলেন, "ঋণ নিয়ে এবারের পান চাষ শুরু করেছিলাম। বন্যায় পুরো বরজ ভেঙে গেছে। এখন নতুন করে চাষ করার মতো সামর্থ্য নেই। সংসার কীভাবে চলবে বুঝতে পারছি না।"

একই এলাকার পান চাষি নুরুজ্জামান, ফেরদৌস ও আব্দুল গফুর বলেন, পান চাষে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু বন্যায় সব হারিয়েও এখন পর্যন্ত তারা কোনো সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা পাননি। এমনকি ক্ষয়ক্ষতি দেখতে বা তালিকা করতে কেউ তাদের কাছে আসেননি বলেও অভিযোগ করেন তারা।

মহেশখালী উপজেলার শাপলাপুর ইউনিয়নের মুখবেকি গ্রামের পান চাষি আব্দুস সালাম বলেন, "স্ত্রীর স্বর্ণ বন্ধক রেখে বরজ করেছিলাম। বন্যায় সব শেষ হয়ে গেছে। এখন নতুন করে শুরু করার কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছি না।"

মহেশখালী উপজেলার  হোয়ানক ইউনিয়নের রাজুয়ারঘোনা গ্রামের পান চাষি ফরিদুল আলম বলেন, "এই ক্ষতি কীভাবে পুষিয়ে উঠব জানি না। অথচ আমাদের উৎপাদিত পান দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশেও রপ্তানি হয়।"

মহেশখালী পান চাষি কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বলেন, "এবারের বন্যায় মহেশখালীর অধিকাংশ বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক বরজ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে এবং পানগাছ মরে গেছে। দ্রুত সহায়তা না পেলে অনেক কৃষক স্থায়ীভাবে পান চাষ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন।"

কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামাণিক বলেন, "এবারের বন্যায় ১৬৬ হেক্টর পানের বরজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় আড়াই হাজার চাষি। পানি নেমে যাওয়ার পর অনেক কৃষক ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। সরকার সব ধরনের কৃষকের পাশে রয়েছে। পান চাষে বড় ধরনের বিনিয়োগের বিষয়টি আমরা জানি। ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সরকারি সহায়তা এলে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তা পৌঁছে দেওয়া হবে।"

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান বলেন, "পান চাষিদের ক্ষতির বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। পান বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিযোগ্য কৃষিপণ্য। ক্ষয়ক্ষতির তথ্য নোট আকারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পান চাষিদের সহায়তার জন্য জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।"

চাষিদের দাবি, শুধু এককালীন অনুদান নয়, বরং পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, বিনামূল্যে পানের চারা, বরজ পুনর্নির্মাণে আর্থিক সহায়তা এবং সুদমুক্ত ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি। অন্যথায় মহেশখালীর ঐতিহ্যবাহী পান শিল্প মারাত্মক সংকটে পড়বে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, কক্সবাজারের বিশেষ করে মহেশখালীর উৎপাদিত মিষ্টি পান দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ভূমিকা রাখছে। তাই এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের দ্রুত পুনর্বাসন এবং সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়