সরওয়ার আজম মানিক, কক্সবাজার : সাম্প্রতিক বন্যার প্রভাবে কক্সবাজারের কাঁচাবাজারে সবজির দামে অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে। জেলার প্রধান কৃষি উৎপাদন এলাকা চকরিয়াসহ পেকুয়া, ঈদগাঁও ও আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সবজিখেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় উৎপাদন ও সরবরাহ কমে গেছে। এর ফলে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের সবজির দাম কেজিপ্রতি ৩০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ।
জেলার প্রায় ২২ লাখ স্থানীয় বাসিন্দার পাশাপাশি আশ্রিত প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গার খাদ্যচাহিদার অতিরিক্ত চাপও বাজার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এ অবস্থায় বাজারে প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি ও মনিটরিং জোরদারের দাবি উঠেছে।
সরেজমিনে কক্সবাজার সদর, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী ও রামুর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, বাজারভেদে সবজির দামে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও প্রায় সব ধরনের সবজির দামই উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অনেক ক্রেতা এক কেজির পরিবর্তে আধা কেজি কিংবা ২৫০ গ্রাম করে সবজি কিনে বাজার থেকে ফিরছেন।
বাজারে বর্তমানে শসা প্রতি কেজি ১২০ টাকা, যা বন্যার আগে ছিল ৪০ টাকা। বরবটি ৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৩০ টাকা, বেগুন ৪০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা, পটল ২৫ টাকা থেকে ৯০ টাকা, করলা ৭০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা, চিচিঙ্গা ৪০ টাকা থেকে ৯০ টাকা, ঢেঁড়স ৪০ টাকা থেকে মানভেদে ৮০-১২০ টাকা এবং কাঁকরোল ৮০ টাকা থেকে বেড়ে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২৪০-২৪৫ টাকায়। অন্যদিকে কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষিত থাকায় টমেটো, আলু ও গাজরের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে।
চকরিয়ার কাকারা এলাকার বাসিন্দা জাহেদ চৌধুরী বলেন, “চকরিয়া শস্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত। অথচ এখন নিজের এলাকায় উৎপাদিত ঢেঁড়সই ১৩০ টাকা কেজি কিনতে হচ্ছে। এত দ্রুত দাম বাড়বে ভাবিনি।”
কক্সবাজার শহরের বাহারছড়ার গৃহিণী হাসিনা বেগম বলেন, “আগে পাঁচ-ছয় রকম সবজি কিনতাম। এখন দুই-তিন রকম কিনেই বাজার শেষ করতে হচ্ছে। সবজির দাম এখন মাছ-মাংসের মতো হয়ে গেছে।”
রামুর ফাতেহারকুল এলাকার বাসিন্দা মাওলানা রিদওয়ান বলেন, “এক সপ্তাহ আগে ৫০ টাকার লাউ এখন ৯০ থেকে ১০০ টাকা। কৃষকের ক্ষতি হয়েছে, সেটা বুঝি। কিন্তু সাধারণ মানুষেরও সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।”
মহেশখালীর বাসিন্দা হাফেজ ছগির আহমদ বলেন, “এখন ১০০ টাকার নিচে ভালো কোনো সবজি পাওয়া যায় না। কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় একই বাজার করতে ৪০০-৫০০ টাকা বেশি লাগছে।”
পেকুয়ার ক্রেতা দেলোয়ার হোসেন বলেন, “গত সপ্তাহে ৫০ টাকায় বেগুন আর ৪০ টাকায় ঢেঁড়স কিনেছি। এখন যথাক্রমে ১৪০ ও ১২০ টাকা দিতে হচ্ছে। তাই আগের মতো এক কেজি নয়, আধা কেজি করেই কিনছি।”
মহেশখালীর মাতারবাড়ি এলাকার আবু সাবের বলেন, “বরবটি ৪০ টাকা থেকে ১৩০ টাকা এবং কাঁচামরিচ ৪৫ টাকা থেকে ২৪৫ টাকায় উঠেছে। সংসারের বাজেট ঠিক রাখতে বাধ্য হয়ে কম পরিমাণে কিনছি।”
কক্সবাজার শহরের ‘মায়ের দোয়া সবজি বিতান’-এর স্বত্বাধিকারী আব্দুল কাদের বলেন, “আমাদের বেশিরভাগ সবজি আসে চকরিয়া থেকে। বন্যায় অনেক ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ায় সরবরাহ কমেছে। আড়তে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, তাই খুচরা বাজারেও দাম বেড়েছে।”
চকরিয়ার এক সবজি ব্যবসায়ী বলেন, “আগে পুরো জেলায় চকরিয়া থেকে সবজি সরবরাহ হতো। এখন অন্য জেলা থেকে সবজি আনতে হচ্ছে। ফলে বেশি দামে বিক্রি করা ছাড়া উপায় নেই।”
চকরিয়ার শাক বিক্রেতা মাওলানা রফিক জানান, বন্যার পর থেকে নিয়মিত সব ধরনের শাক বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক শাক এখন বাইরের জেলা থেকে আনতে হচ্ছে।
কক্সবাজার শহরের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী বলেন, “চকরিয়া, পেকুয়া ও আশপাশের কৃষি এলাকায় বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে না আসা পর্যন্ত দ্রুত দাম কমার সম্ভাবনা কম।”
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, “কক্সবাজারের ২২ লাখ মানুষের পাশাপাশি প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গার খাদ্যচাহিদার চাপও এখানকার বাজারের ওপর পড়ছে। বন্যায় উৎপাদন কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।”
কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ.ন.ম. হেলাল উদ্দিন বলেন, “বন্যাকে অজুহাত করে কেউ অতিরিক্ত মুনাফা করছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে প্রশাসনের নিয়মিত বাজার মনিটরিং জরুরি।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কক্সবাজারের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামাণিক বলেন, “বর্ষাকালে স্বাভাবিকভাবেই সবজির উৎপাদন কিছুটা কম থাকে। তার ওপর চলমান বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে জেলার ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রায় ৪ হাজার ২১১ হেক্টর কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে ধান, শাকসবজি ও অন্যান্য মৌসুমি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বীজ, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহের মাধ্যমে দ্রুত তাদের পুনরায় আবাদে ফিরিয়ে আনতে কৃষি বিভাগ কাজ করছে।”
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, “বন্যার পর বাজারে কার্যকর মনিটরিং না থাকায় সবজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।”
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান বলেন, “বন্যায় কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অনেকের সবজিখেত নষ্ট হয়েছে। আমরা বাজার মনিটরিং আরও জোরদার করব, যাতে কোনোভাবেই অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিতে না পারে এবং সাধারণ ক্রেতারা হয়রানির শিকার না হন।”
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমিতে পুনরায় উৎপাদন শুরু এবং সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবজির বাজারে স্বস্তি ফিরতে সময় লাগতে পারে। তবে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি থাকলে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।