এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, বাগেরহাট: বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের গুলিশাখালী ফাজিল (স্নাতক) মাদ্রাসায় শিক্ষককে প্রকাশ্যে মারধর ও লাঞ্ছিত করার অভিযোগকে কেন্দ্র করে চরম অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্ত সাবেক অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, শিক্ষক হয়রানি এবং অবসরের পরও প্রভাব খাটিয়ে পুনরায় চুক্তিভিত্তিক অধ্যক্ষ হিসেবে বহাল থাকার চেষ্টার অভিযোগ তুলে রবিবার অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা বর্জন করে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী। তাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
রবিবার সকাল ১১টায় মাদ্রাসার প্রধান ফটকের সামনে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা ঘোষণা দেন, শিক্ষককে মারধরের ঘটনার সুষ্ঠু বিচার এবং অভিযুক্ত সাবেক অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না হওয়া পর্যন্ত তারা পরীক্ষায় অংশ নেবেন না। আন্দোলন আরও কঠোর করারও হুঁশিয়ারি দেন তারা।
প্রতিবাদ সমাবেশে শিক্ষকরা অভিযোগ করেন, গুলিশাখালী ফাজিল (স্নাতক) মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল বারির চাকরির মেয়াদ গত ২৯ জুন শেষ হলেও তিনি অবসর গ্রহণ না করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে আরও দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ লক্ষ্যে ম্যানেজিং কমিটির সুপারিশ নিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে।
শিক্ষকদের দাবি, দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিয়মিতভাবে শিক্ষকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করতেন, অকারণে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতেন, বিভিন্নভাবে আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতেন এবং প্রশাসনিক নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে গত বুধবার শিক্ষক পরিষদ এক প্রতিবাদ সভা করে তার পুনর্নিয়োগের বিরোধিতা জানায়।
অভিযোগ রয়েছে, ওই প্রতিবাদ সভার জের ধরেই শনিবার সকালে গুলিশাখালী বাজারে মাদ্রাসার ইসলামী ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক শেখ আব্দুল্লাহ মাসুদের ওপর হামলা চালানো হয়। শিক্ষক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল বারি তাকে মারধর ও লাঞ্ছিত করেন। এ ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানের অন্য শিক্ষকও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে অভিযোগ ওঠে।
রবিবারের কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বলেন, "যে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিরাপদ নন, সেখানে শিক্ষার পরিবেশ থাকতে পারে না। আমরা আমাদের শিক্ষকের অপমানের বিচার চাই। বিচার না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা নয়।"
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন উপাধ্যক্ষ মাওলানা গাজী শহিদুল ইসলাম, প্রভাষক মাওলানা মজিবুর রহমান, সহকারী অধ্যাপক মো. শাহ আলম, সহকারী শিক্ষক আল মামুন, শিক্ষক মাওলানা আব্দুল গফ্ফার, কৃষি শিক্ষক মমতাজ বেগম, এবতেদায়ি শিক্ষক নাজমিন আক্তার, শিক্ষার্থী নবীন, রোমেনা আক্তার, আব্দুল্লাহ, শাহিদা আক্তার, মোরশেদা, অভিভাবক আব্দুল আউয়াল তালুকদার, দেলোয়ার গাজী, হাফিজা বেগমসহ স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
বক্তারা বলেন, "একজন শিক্ষকের ওপর হামলা কোনো ব্যক্তির ওপর হামলা নয়, এটি পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর আঘাত। শিক্ষককে মারধরের বিচার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং অবসরের পর পুনর্নিয়োগের বিতর্কিত উদ্যোগ বাতিল করতে হবে।"
এ বিষয়ে মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাবিবুল্লাহ বলেন, শিক্ষক ও সাবেক অধ্যক্ষের মধ্যকার বিরোধের বিষয়টি প্রশাসনের নজরদারিতে রয়েছে। সহকারী অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা বর্জন না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষককে মারধরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে যাতে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি না ঘটে, সে বিষয়ে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছে।
তবে শিক্ষককে মারধর, অনিয়মের অভিযোগ এবং পুনর্নিয়োগের চেষ্টার বিষয়ে জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল বারির বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
ঘটনাটি নিয়ে এলাকাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রত্যাশা, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক পরিবেশ দ্রুত ফিরে আসে।*