এনামুল হক এনা, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, (বাউফল) পটুয়াখালী : পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায় সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পের নির্মাণমান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন ইউনিয়নে নির্মিত সেতু, ঘাটলা ও কালভার্টে কাজ শেষ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই ফাটল দেখা দেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, প্রকল্পের যথাযথ তদারকির অভাব এবং অনিয়মের কারণেই হস্তান্তরের আগেই এসব অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে গ্রামীণ সড়কে সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ কর্মসূচির আওতায় উপজেলার বগা ইউনিয়নের উত্তর রাজনগর গ্রামে প্রায় ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি সেতু নির্মাণ করা হয়। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার প্রায় এক মাসের মধ্যেই সেতুর ডেক, রেলিং ও সংযোগস্থলের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দেয়। এতে সেতুটির স্থায়িত্ব ও নির্মাণমান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী।
একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে সূর্যমণি ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিশ্বাসবাড়ি সংলগ্ন খালের ওপর নির্মাণাধীন আরেকটি সেতুকে ঘিরে। দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি মূল অবকাঠামোর নির্মাণকাজ শেষ করা হয়। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার পরপরই সেতুর বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দেয়। স্থানীয়দের দাবি, নির্মাণের শুরু থেকেই কাজের গতি ছিল ধীর, আর শেষ পর্যায়ে তড়িঘড়ি করে কাজ শেষ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অধিকাংশ সময় নির্মাণকাজে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কোনো কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন না। অনেক ক্ষেত্রে রাতের আঁধারে ঢালাইয়ের কাজ করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, সিডিউলে উল্লেখিত মানসম্পন্ন উপকরণের পরিবর্তে স্থানীয় বালু ব্যবহার করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় পরিমাণ সিমেন্টও দেওয়া হয়নি। ফলে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই কিংবা অল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে।
শুধু সেতুই নয়, উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নেও রাজস্ব তহবিলের অর্থে বাস্তবায়িত প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মারকাযুল উলুম মাদ্রাসা সংলগ্ন খালের পাশে প্রায় দুই লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি ঘাটলায় নির্মাণের মাত্র ১৫ দিনের মাথায় ফাটল দেখা দেয়। একই স্থানে আরও প্রায় দুই লাখ টাকা ব্যয়ে একটি কালভার্ট নির্মাণ করা হলেও সেটি পরিকল্পনা ও প্রয়োজন বিবেচনায় নির্মাণ না করায় স্থানীয়দের প্রত্যাশিত কোনো উপকারে আসছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর ভাষ্য, প্রকল্পের মান নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কার্যকর নজরদারি না থাকায় ঠিকাদাররা নিজেদের ইচ্ছামতো কাজ করছেন। এতে সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হচ্ছে না। তারা বলেন, জনগণের করের টাকায় নির্মিত অবকাঠামো যদি ব্যবহার শুরুর আগেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।
এদিকে স্থানীয়ভাবে আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে কমিশন দেওয়ার একটি অলিখিত সংস্কৃতি চালু রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় সেতু নির্মাণ প্রকল্পে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তাকে ১০ শতাংশ কমিশন দিতে হয়। এছাড়া রাজস্ব তহবিল ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের এক অফিস সহকারীকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতে হয় বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি। তাদের দাবি, এই অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সামাল দিতে গিয়ে অনেক ঠিকাদার নির্মাণসামগ্রীর মান কমিয়ে দেন এবং কাজেও অনিয়ম করেন। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো লিখিত প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন,"আমি সম্প্রতি এই উপজেলায় যোগদান করেছি। অভিযোগ পাওয়া প্রকল্পগুলো দ্রুত সরেজমিনে পরিদর্শন করা হবে। কোথাও অনিয়ম বা নির্মাণ ত্রুটি পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
পটুয়াখালী জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ১০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, **"এ ধরনের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কোনো প্রকল্পে কমিশন নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।"
বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালেহ আহমেদ বলেন,"আমার কার্যালয়ের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর কমিশন নেওয়ার সুযোগ নেই। উন্নয়ন প্রকল্পে কোনো ধরনের অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কাজের মান নিশ্চিত করতে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।"
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত প্রকল্পগুলো কারিগরি বিশেষজ্ঞ দিয়ে পরিদর্শনের পাশাপাশি অনিয়মের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে কঠোর তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।