শিরোনাম
◈ জোরপূর্বক শ্রম ইস্যু: বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের পণ্যে ১০-১২.৫% শুল্ক চায় যুক্তরাষ্ট্র ◈ এক দল ব‌্যক্তি‌কে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠা‌নোর চেষ্টা, বেনাপোল সীমান্তে কী হচ্ছে ◈ আমি কিছু করিনি স্যার, আমি নির্দোষ: আদালতকে স্বপ্না ◈ বিশ্বকাপ প্রস্তু‌তি,  ক্রো‌য়ে‌শিয়া‌কে ২-০ গো‌লে হারা‌লো বেলজিয়াম, অপর ম‌্যা‌চে মর‌ক্কোর সহজ জয়  ◈ মাদক প্রতিরোধে কক্সবাজারে ডগ স্কোয়াড নামানোর পরিকল্পনা পুলিশের ◈ ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডকে আইপিএল নিয়ন্ত্রণে বেশি ক্ষমতা দিয়ে ফেলেছিলাম: ললিত মোদি ◈ বিশ্বকা‌পে ইরানের ম্যাচে বাড়তি নিরাপত্তা দি‌বে যুক্তরাস্ট্র ◈ কোন সংকটের আভাস দিলেন প্রধানমন্ত্রী? ◈ দীর্ঘমেয়াদি ভিসাধারীদের জন্য যে নতুন নিয়ম জারি করল ভারত সরকার ◈ এখন থেকে ৫০ ভাগ মামলা গাড়ির মালিককে না দিয়ে চালকের বিরুদ্ধে করা হবে: অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার(ট্রাফিক)

প্রকাশিত : ০৩ জুন, ২০২৬, ০৯:১৫ সকাল
আপডেট : ০৩ জুন, ২০২৬, ১২:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

কে এই জামাই ইয়াসিন, যার ভয়ে কাঁপে জঙ্গল সলিমপুর?

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর আতঙ্ক আর ভীতির এক জনপদ। এখানের স্বঘোষিত রাজা মো. ইয়াসিন। এলাকার প্রবেশপথে থাকে সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র পাহারা। পাহাড়ঘেরা এই এলাকায় ঢুকতে গেলে দেখাতে হয় ‘বিশেষ পরিচয়পত্র’। এমনকি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও ভেতরে যেতে পারেন না। সবশেষ আলীনগর এলাকায় যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে ২৪ মে গভীর রাতে সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলায় অংশ নেয় অন্তত ৩০০ জনের সশস্ত্র বাহিনী। হামলায় সবচেয়ে মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র একে-৪৭ ব্যবহার করেছে তারা। পরিকল্পিতভাবে সন্ত্রাসী মো. ইয়াসিন বাহিনী এ হামলা চালায়।

কে এই ইয়াসিন

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় লোকজন বলছেন, মো. ইয়াসিন স্থানীয়ভাবে ‘জামাই ইয়াসিন’ নামে পরিচিত। মূলত সীতাকুণ্ড উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুরের এক শীর্ষ সন্ত্রাসী, ভূমিদস্যু এবং কুখ্যাত সশস্ত্র ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তিনি জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর এলাকার অবৈধ দখলদার এবং ‘একচ্ছত্র স্বঘোষিত রাজা’ হিসেবে পরিচিত। তিনি মূলত সীতাকুণ্ডের জঙ্গল আলীনগর এলাকার বাসিন্দা হলেও জঙ্গল সলিমপুরে বিয়ে করার কারণে এলাকাটিতে ‘জামাই ইয়াসিন’ নামে পরিচিতি পান। 

২০০৩ সালে নোয়াখালী থেকে চট্টগ্রামে আসেন ইয়াসিন। শুরুতে একটি জুট মিলে চাকরি করলেও পরে আলীনগর এলাকায় বসবাস শুরু করেন। এরপর ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েন অপরাধ জগতে।

স্থানীয় সূত্র বলছে, পুলিশের ভয় আছে—এমন অপরাধীদের আশ্রয় দেওয়া থেকে শুরু করে পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্য—সব কিছুর মধ্য দিয়ে গড়ে তোলেন নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী। পরে পুরো এলাকাকে পরিণত করেন সন্ত্রাসীদের শক্ত ঘাঁটিতে।

গ্রেফতার ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জামিনে মুক্ত

২০২২ সালের ১৮ জুলাই সলিমপুরের ‘স্বঘোষিত রাজা’ সন্ত্রাসী ইয়াসিনকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। সরকারি অফিসারদের গাড়ি বহর থেকে নামিয়ে সলিমপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার আরিফকে মারধরের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তাকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছিল পুলিশ।

ওই দিন স্থানীয় সরকার বিভাগের চট্টগ্রাম বিভাগীয় উপপরিচালক বদিউল আলমসহ সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জঙ্গল সলিমপুর এলাকা পরিদর্শনে যান। পরিদর্শন শেষে ফেরার সময় তাদের গাড়িবহরের পেছনে থাকা ইউপি চেয়ারম্যানের গাড়ির গতিরোধ করেন এবং ইউপি সদস্য আরিফকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে গাড়ি থেকে নামিয়ে প্রকাশ্য মারধর করেন ইয়াসিন ও তার বাহিনীর সন্ত্রাসীরা। ভাঙচুর করেন ইউপি চেয়ারম্যানের ব্যবহৃত প্রাইভেটকারও। এ ঘটনার পরদিন আরিফের ভাই আবদুল হালিম বাদী হয়ে সীতাকুণ্ড থানায় মামলা করেন। মামলা পরদিন বিকালে অভিযান চালিয়ে চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালি এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। ইয়াসিনের বিরুদ্ধে অস্ত্র, গুম ও নাশকতাসহ সীতাকুণ্ড থানায় ১৫টিরও অধিক মামলা রয়েছে। এরপরও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জামিনে মুক্তি পেয়ে আবার অপরাধে জড়ান। 

সাম্রাজ্য বিস্তার ও যেভাবে চালাচ্ছেন বাহিনী

জঙ্গল সলিমপুরের সরকারি পাহাড় কেটে অবৈধ প্লট তৈরি, ভূমি দখল ও ঘরবাড়ি উচ্ছেদ বা স্থাপনা বাণিজ্যের মাধ্যমে সেখানে বিশাল অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। এলাকাটি ছিন্নমূল বা বস্তি এলাকা হওয়ায় সেখানকার অবৈধ বিদ্যুৎ, পানির মিটার ও যাবতীয় ইউটিলিটি খাতের অবৈধ অর্থনৈতিক খাতগুলো ইয়াসিন ও তার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আছে।

রাজনৈতিক আশ্রয়

মূলত সুযোগসন্ধানী অপরাধী। দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভোল পাল্টে ফেলেন। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রছায়ায় থেকে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আধিপত্য টিকিয়ে রেখেছেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে পালিয়ে আসা শীর্ষ অপরাধীদের আশ্রয়দাতাও তিনি।

সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানা

চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটি। এর বিপরীতে লিংক রোডের উত্তর পাশে ৩ হাজার ১০০ একর জায়গায় জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান। সীতাকুণ্ডে এর অবস্থান নগরের কাছে। এলাকাটির পূর্ব দিকে রয়েছে হাটহাজারী উপজেলা এবং দক্ষিণে বায়েজিদ থানা।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এটি হয়ে উঠেছে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানা। চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। এখনও পাহাড় কেটে চলছে প্লট-বাণিজ্য। আর এই বাণিজ্য ও দখল টিকিয়ে রাখতে এলাকাটিতে গড়ে তোলা হয়েছে সন্ত্রাসী বাহিনী। এলাকাটি সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারায় থাকে এসব সন্ত্রাসী। জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর, মূলত দুটি অংশে বিভক্ত এলাকাটি। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, এখানে ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে বিভিন্ন ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। এর মধ্যে এক শীর্ষ সন্ত্রাসী ৩০০ জনের একটি বাহিনী গড়ে তুলেছে।

রাজনৈতিক পরিচয় কী

পুলিশ ও জঙ্গল সলিমপুরের স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দুটি সন্ত্রাসী পক্ষ রয়েছে। একটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন মো. ইয়াসিন ও অপর পক্ষে রোকন উদ্দিন। ইয়াসিনের রয়েছে ৩০০ জনের একটি বাহিনী। রোকন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক (বহিষ্কৃত) এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য। তারও শতাধিক সদস্যের ‘রোকন বাহিনী’ আছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ইয়াসিন সীতাকুণ্ডের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা এস এম আল মামুনের আশ্রয়ে ছিলেন। এখন তিনি নিজেকে বিএনপির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেন। রোকন উদ্দিনও আসলাম চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তবে এ ব্যাপারে গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে আসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে আমার কোনও অনুসারী নেই। ঘটনার সঙ্গে বিএনপির কেউ জড়িতও নন।’ তবে বাস্তবে দুই বাহিনী আসলাম চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেয়।

নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মূল বিরোধ তাদের

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বহিষ্কৃত যুবদল নেতা রোকন উদ্দিন ও পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ইয়াসিনের বিরোধ চলছিল। এর মধ্যে ইয়াসিনের লোকজন ওই এলাকায় বিএনপির একটি কার্যালয় উদ্বোধনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সেখানে ইয়াসিনসহ কয়েকজন সন্ত্রাসী আসতে পারে—এই তথ্যের ভিত্তিতে র‍্যাবের ৪০ জনের একটি দল জঙ্গল সলিমপুরে গেলে হামলার শিকার হন। এ সময় অন্য সদস্যরা সরে আসতে পারলেও র‍্যাবের চার সদস্য ও তাদের তথ্যদাতাকে (সোর্স) আটকে ফেলে ইয়াসিনের লোকজন। পরে তাদের অটোরিকশায় করে তিন কিলোমিটার দুর্গম পাহাড়ের ভেতর নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নিয়ে তাদের মারধর করা হয়। এতে র‍্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। বাকিদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।

এরপর ৯ মার্চের যৌথ অভিযানে ২২ জনকে গ্রেফতার করা হলেও ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াসিন, রোকন বাহিনীর প্রধান রোকন উদ্দিন; মশিউর রহমান, নুরুল হক ভান্ডারি, গাজী সাদেক, গোলাম গফুরসহ তাদের কোনও সহযোগীকে গ্রেফতার করা যায়নি। এলাকাবাসী জানান, জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল এলাকা রোকনের দখলে আর আলীনগর এলাকা ইয়াসিনের দখলে আছে। এখনও সেখানে তাদের নিয়ন্ত্রণ আছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ভয়াবহ হামলা ও র‌্যাব হত্যাকাণ্ড

২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে র‌্যাব-৭-এর একটি দল সন্ত্রাসী গ্রেফতার অভিযানে গেলে ইয়াসিন বাহিনীর সশস্ত্র হামলার শিকার হন। এই হামলায় গুরুতর আহত হয়ে র‌্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন, যার প্রধান আসামি মো. ইয়াসিন। 

যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে বুলডোজার হামলা

সর্বশেষ ২৪ মে রাত ১টার দিকে সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলায় অংশ নেয় অন্তত ৩০০ জনের সশস্ত্র বাহিনী। হামলায় সবচেয়ে মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র একে-৪৭ ব্যবহার করেছে তারা। পরিকল্পিতভাবে সন্ত্রাসী ইয়াসিন বাহিনীর সদস্যরা এ হামলা চালায়। পাশের বাড়ির টিনের দেয়াল ও চালে ছোট ছোট ছিদ্র করে পরিকল্পিতভাবে ফায়ারিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আকস্মিক হামলার পর পাল্টা অবস্থান নেয় যৌথ বাহিনী। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে থেমে থেমে গোলাগুলির ঘটনায় পুরো এলাকা আতঙ্কে কেঁপে ওঠে। গোলাগুলির মধ্যেই সন্ত্রাসীদের আরেকটি দল পাশের নির্মাণাধীন যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা চালায়। এ সময় বুলডোজার দিয়ে নির্মাণাধীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যাতায়াত ঠেকাতে সড়কের বেশ কয়েকটি অংশ কেটে দেওয়া হয়।

কী পদক্ষেপ নিলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি বহরে হামলা, ইউপি মেম্বারকে মারধর, ভূমিদস্যুতা এবং সর্বশেষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর সশস্ত্র হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ইয়াসিন এবং তার বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে সীতাকুণ্ড থানাসহ বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা করা হয়েছে। বর্তমানে সেনাবাহিনী, র‌্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী জঙ্গল সলিমপুরে ইয়াসিন ও তার সহযোগীদের দমনে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে।

স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, ইয়াসিন ও তার প্রতিদ্বন্দ্বী রোকন বাহিনী—উভয় পক্ষই নিজেদের আড়াল করতে সীতাকুণ্ড ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেছেন।

জঙ্গল সলিমপুরের অপরাধীদের অতীত ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ইয়াসিনসহ সেখানকার অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসীই শুরুতে (২০০৮ সালের আগে) বিএনপির অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে তারা আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং বর্তমানে আবার বিএনপিতে ভিড়েছেন।

প্রশাসনের বর্তমান অবস্থান

ইয়াসিন বাহিনী রাজনৈতিক দলগুলোর নাম ব্যবহার করে পার পাওয়ার চেষ্টা করলেও গত জানুয়ারিতে র‍্যাব কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ড এবং মে মাসে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে পুনরায় হামলার পর সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও যৌথ বাহিনী তার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বর্তমানে কোনও রাজনৈতিক পরিচয়ই তাকে আইনি পদক্ষেপ থেকে রক্ষা করতে পারছে না এবং তাকে গ্রেফতারে সাঁড়াশি অভিযান চলছে।

সলিমপুরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

গত রবিবার জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পরিদর্শন শেষে তিনি বলেন, ‘দেশে কার্যকরভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার মতো দুঃসাহস যারা দেখিয়েছে, তাদের সম্পূর্ণ নির্মূল করা হবে। জঙ্গল সলিমপুর, আলীনগর ও আশপাশের এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই সরকারের লক্ষ্য। এর পেছনে থাকা ভূমিদস্যু ও ইন্ধনদাতাদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি ও বোয়ালখালীসহ বিভিন্ন এলাকার সন্ত্রাসীদের তালিকা ও আস্তানা চিহ্নিত করে সমন্বিত পরিকল্পনায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলাকারীদের কোনও ছাড় দেওয়া হবে না।’

কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না

র‍্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, ‘গত রবিবার রাত ১টার দিকে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে সন্ত্রাসী ইয়াসিন বাহিনীর ২৫০-৩০০ জন সশস্ত্র সদস্য সংঘবদ্ধ হয়ে এই হামলা চালায়। তাদের হাতে রামদা, দেশীয় অস্ত্র এবং একে-৪৭ রাইফেলের মতো অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ছিল।’

তিনি বলেন, ‘হামলাকারীরা বুলডোজার দিয়ে আলীনগর স্কুলে থাকা যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পের পেছনের দেয়াল ভেঙে দেয়। ওই স্কুলের শেষ প্রান্তে যৌথ বাহিনীর নতুন একটি অস্থায়ী ক্যাম্প তৈরি করা হচ্ছিল। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছিল। বুলডোজার দিয়ে সেটির প্রায় পুরোটাই গুঁড়িয়ে দিয়েছে তারা। সন্ত্রাসীরা গুলি করে আমাদের লোকজনকে ব্যস্ত রাখে এবং সেই সুযোগে ভাঙচুর চালায়। পাহাড়ে থাকা নতুন কয়েকটি টিনের ঘরের ভেতর থেকে টিন ফুটো করে বন্দুকের নল বের করে গুলি ছুড়েছে তারা।’

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে যেই সন্ত্রাসী গ্রুপ জড়িত থাকুক না কেন, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ইয়াসিন ও রোকন বাহিনীসহ সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর কেন বারবার হামলা চালানো হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এলাকাটিতে পাহাড় কেটে কোটি কোটি টাকার প্লট-বাণিজ্য জড়িত। সেই বাণিজ্য ও আধিপত্য ধরে রাখতেই সন্ত্রাসীরা হামলা চালাচ্ছে। দ্রুত সড়ক নির্মাণ ও যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে আসবে। তখন হামলাকারীরা চাইলেও এমন দুঃসাহস দেখাতে পারবে না।’

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়