গত ২১ এপ্রিল চট্টগ্রামের সোনাইছড়িতে এসএন করপোরেশনের গ্রিন-সার্টিফায়েড ইয়ার্ডে ভেড়ানো হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই সেমি-সাবমার্সিবল বার্জ। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের জাহাজ পুনর্ব্যবহার (শিপ রিসাইক্লিং) খাতে এটি অন্যতম আলোচিত সংযোজন। বিশাল এই কাঠামোটি প্রায় ২ কোটি ডলার ব্যয়ে আমদানিকৃত।
জলে ডুবে কাজ করার অদ্ভূত কারিগরি
২০১৯ সালে সিঙ্গাপুরে 'আমেরিকান ব্যুরো অব শিপিং'-এর তত্ত্বাবধানে নির্মিত হয় বার্জটি। অফশোর ড্রিলিং রিগ পরিবহনের জন্য এটি বিশেষভাবে নকশা করা হয়েছিল। এর সবচেয়ে চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য হলো—এটি পানির নিচে প্রায় ৩৩ মিটার পর্যন্ত ডুবে যেতে পারে। এই অর্ধ-নিমজ্জিত অবস্থায় এটি ৬৫ হাজার টন ওজনের রিগ বা জাহাজ নিজের ওপর তুলে নিয়ে অনায়াসেই ভেসে উঠতে পারে।
এই জটিল প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য এতে রয়েছে ১২টি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ব্যালাস্ট পাম্প, যা প্রতি ঘণ্টায় হাজার হাজার ঘনমিটার পানি স্থানান্তর করতে সক্ষম। সামনের ও পেছনের আলাদা পাম্প রুম থেকে পুরো বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বার্জটির ডেকে ছয়টি বিশেষ অংশ রয়েছে, যেখানে আধুনিক ড্রিলশিপের থ্রাস্টার বসানোর সুবিধা রাখা হয়েছে, যা এর বিশেষায়িত ব্যবহারকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
আয়তনে এক ভাসমান বিস্ময়
সংখ্যা দিয়ে এই বার্জের বিশালতা বোঝানো কঠিন। ২২০.৮ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ৭৯ মিটার প্রস্থের এই বার্জটি পাশাপাশি রাখা দুটি ফুটবল মাঠের চেয়েও বড়। এর 'লাইট ডিসপ্লেসমেন্ট' প্রায় ৪৯ হাজার ৪৫৫ মেট্রিক টন, যা বাংলাদেশের ইয়ার্ডে আসা এ যাবতকালের অন্যতম ভারী কাঠামো।
বাইরে থেকে এটিকে একটি সমতল ডেক ও বাক্স আকৃতির হুলের মতো মনে হলেও এর প্রকৃত শক্তি চার কোণে দাঁড়িয়ে থাকা চারটি বিশাল টাওয়ার। প্রায় ১৮ তলা ভবনের সমান উঁচু (৬০ মিটার) এই টাওয়ারগুলো পানির নিচে নিমজ্জিত হওয়ার সময় বার্জটির স্থিতিশীলতা বজায় রাখে। টাওয়ারগুলোর ভেতরেই রয়েছে ক্রুদের থাকা-খাওয়া, কর্মক্ষেত্র এবং নিরাপত্তা এলাকা।
এক আস্ত ভাসমান বিদ্যুৎকেন্দ্র
সাধারণ বার্জের সঙ্গে এর বড় পার্থক্য হলো এর নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা। এতে থাকা দুটি প্রধান জেনারেটরের প্রতিটি প্রায় ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম। এর সঙ্গে যুক্ত আছে উচ্চক্ষমতার অল্টারনেটর এবং ব্যাকআপ হিসেবে একটি ক্যাটারপিলার হারবার জেনারেটর।
সমুদ্রের পানির পাম্প, আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ও ট্রান্সফরমার মিলিয়ে এটি যেন একটি পূর্ণাঙ্গ কারখানার ভাসমান সংস্করণ। এসএন করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বরকত উল্লাহ জানান, জাহাজটিতে থাকা ভারী যন্ত্রপাতি, পাম্প ও জেনারেটরসহ অনেক উপাদানই পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী। বিশেষ করে এর ২৫ মিমি থেকে ১০৮ মিমি পুরুত্বের স্টিল প্লেটগুলো অত্যন্ত মূল্যবান। তিনি বলেন, 'এত পুরু প্লেট দেশে সচরাচর পাওয়া যায় না। এগুলো স্থানীয় শিল্পে ব্যবহারের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানি করাও সম্ভব।'
বিচিং থেকে কাটিং: দীর্ঘ প্রক্রিয়া
বর্তমানে বার্জটি ইয়ার্ড থেকে প্রায় ২ হাজার ফুট দূরে অবস্থান করছে। সেটিকে মূল ইয়ার্ডে টেনে আনার কাজ চলছে। প্রয়োজনীয় সব সরকারি ছাড়পত্র ও অনুমতি পাওয়ার পরই শুরু হবে কাটিং বা স্ক্র্যাপ করার প্রক্রিয়া।
বিচিং অপারেশন পরিচালনা করা অভিজ্ঞ পাইলট ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, 'এটি অত্যন্ত বিশেষায়িত একটি জলযান। মূলত অফশোর রিগিংয়ের জন্য ভারী সরঞ্জাম পরিবহনে এটি ব্যবহৃত হতো। তবে বাণিজ্যিকভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ায় এটি সেকেন্ড হ্যান্ড বাজার হয়ে বাংলাদেশে এসেছে।'
বৈশ্বিক পরিবর্তন ও স্থানীয় সম্ভাবনা
'ফেলস ক্যান ডু টু'-এর আগমন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি বৈশ্বিক অফশোর শিল্পের পরিবর্তনের এক প্রতিচ্ছবি। গত দশকে জ্বালানি খাতে বড় বিনিয়োগের সময় নির্মিত অনেক বিশালাকার কাঠামো এখন অবসরে যাচ্ছে। প্রযুক্তি ও অর্থনীতির পরিবর্তনের ফলে এগুলোর বাণিজ্যিক গুরুত্ব কমেছে।
বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ। দেশের জাহাজ পুনর্ব্যবহার খাত প্রতি বছর গড়ে ১৫০ থেকে ২০০টি জাহাজ ভেঙে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন করে। যদিও বিশ্ব অর্থনীতির ধীরগতি এবং পরিবেশবান্ধব মানদণ্ড (হংকং কনভেনশন) অনুসরণের চাপের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই খাত কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। তবে আশার কথা হলো, ২০২৪ সালে গ্রিন ইয়ার্ডের সংখ্যা মাত্র ৪টি থাকলেও বর্তমানে তা ২০টিতে উন্নীত হয়েছে।
একটি সংকেত ও সম্ভাবনা
এই প্রেক্ষাপটে 'ফেলস ক্যান ডু টু'-এর মতো জটিল ও উচ্চমূল্যের জাহাজের আগমন একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বৈশ্বিক বাজারের কঠিন প্রতিযোগিতা ও কঠোর পরিবেশগত মানদণ্ডের মাঝেও বাংলাদেশ যে বড় ও জটিল সামুদ্রিক সম্পদ রিসাইক্লিংয়ের সক্ষমতা রাখে, এটি তারই প্রমাণ।
সীতাকুণ্ড উপকূলে এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা। কিছুদিন পর বিশাল এই দানবীয় কাঠামোটিকে টেনে তীরে আনা হবে এবং ধাপে ধাপে খণ্ড-বিখণ্ড করা হবে। যে কাঠামোটি এক সময় সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে বিশাল রিগ বহন করে বেড়াত, চট্টগ্রামের এই সরু উপকূলেই তার সমাপ্তি ঘটবে এবং তা মিশে যাবে দেশের নতুন কোনো শিল্পচক্রে।
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড