শিরোনাম
◈ রূপপুর পারমান‌বিক কেন্দ্র নি‌য়ে জনমনে ভীতি, ঘর বা‌ড়ি বানা‌নো‌তে ভয়, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কীভাবে? ◈ প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে পাঁচ ‘আটহাজারি’ শিখর স্পর্শ করলেন ডা. বাবর আলী, মাউন্ট মাকালু জয়ে ইতিহাস ◈ বিশ্বকাপে ইরানের খেলা নিয়ে সুর নরম করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ◈ যে কারণে ইতালিতে বড় ভাইয়ের হাতে ছোট ভাই খুন, বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য! ◈ ‌নিউজিল‌্যা‌ন্ডের বিরু‌দ্ধে আজ জিতলেই ‌টি-‌টো‌য়ে‌ন্টি সি‌রিজ বাংলা‌দে‌শের ◈ এক বি‌শেষ বলকে যমের মতো ভয় পায় বৈভব: ইয়ান বিশপ  ◈ সাত দিনের সফরে জাপান গেলেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান ◈ সিলেটে পৌঁছালেন প্রধানমন্ত্রী ◈ ইরান, ইরাক ও লেবানন ভ্রমণে নাগরিকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করল আমিরাত ◈ এক দেশ বাদে আফ্রিকায় চীনের ‘শূন্য শুল্ক’: কার লাভ, কার ক্ষতি?

প্রকাশিত : ০২ মে, ২০২৬, ০৯:৩৮ সকাল
আপডেট : ০২ মে, ২০২৬, ১১:১৪ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

কে এই ‘তানভীর’? রাঙ্গামাটির সেনাসদস্যকে ঘিরে নতুন বিতর্ক

গত বুধবার (২৯ এপ্রিল) ‘বীর যোদ্ধা’ নামক একটি ফেসবুক আইডি থেকে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। ১৩ সেকেন্ডের ভিডিও ক্লিপটিতে দেখা যাচ্ছে, পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির দুই তরুণী রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা সেনাবাহিনীর একটি টহল গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে লুকিং গ্লাস থেকে সেই দৃশ্য তাদের অজান্তে মোবাইলে ধারণ করছেন সেনাসদস্য। পেছন থেকে হেঁটে আসা দুই তরুণী লুকিং গ্লাস অতিক্রম করে গাড়ির সামনের অগ্রসর হওয়া পর্যন্ত ক্লিপটিতে ধারণ করা হয়েছে।

এই ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে যুক্ত করা হয়েছে নারীদের প্রতি আপত্তিকরভাবে ইঙ্গিতপূর্ণ কয়েকটি বাক্য; আর সেগুলো হলো: “ব্যাটারি গলিতে এই আগুন কই থেকে মামা। এই জিনিস তো জীবনেও দেহি নাই, পুরাই ডিস্টিং ডিস্টিং।”

ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর সমালোচনা শুরু হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের গাড়ি থেকে এভাবে সাধারণ নাগরিকের অজান্তের তাদের ভিডিও ধারণ করে ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়ার বিষয়টি নিয়ে অনেকেই সোচ্চার হোন।

নিপুন চন্দ্র নামে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে লিখেছেন, “এ ধরনের ঘটনা যেন সমাজের নৈতিকতাকে আরও ক্ষয় না করে, সেজন্য সকলের সজাগ দৃষ্টি ও প্রতিরোধ অপরিহার্য।”

রিংক চাকমা লিখেছেন, “দোষটা বাহিনীর না, দোষটা কিছু অমানুষের বাচ্চার। এই ক্যারেক্টরলেস গুলোকে সরকার কিভাবে চাকরি দেয়? সেনাবাহিনীর তো কঠোর নিয়ম, এইভাবে হেনস্তা করা বা পরকিয়া ইত্যাদি কর্মকাণ্ড সেনাবাহিনী নীতির মধ্যে তো পড়েনা। তাহলে এদের এই অবস্থা কেনো? দ্রুত এদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে চাকরি থেকে বহিষ্কার আর শাস্তির দাবী জানাচ্ছি।”

সমালোচনার পর আজ শুক্রবার দুপুরের পর থেকে ওই আইডিতে ভিডিওটি পাওয়া যাচ্ছে না। পোস্টটি ডিলিটের আগ পর্যন্ত এক হাজার দু'শ জন রিয়েক্ট দিয়েছেন। এরমধ্যে এংরি রিয়েক্ট দিয়েছেন ৩৬০ জন। কমেন্ট করেছেন ৬২৯ জন। এ পর্যন্ত পোস্টটি শেয়ার হয়েছে ২৬৪ বার। 

দ্য ডিসেন্ট ‘বীর যোদ্ধা’ আইডিটির কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে দেখেছে এটিতে প্রায়ই নারীর প্রতি অবমাননামূলক কন্টেন্ট আপলোড করা হয়ে থাকে। বেশ কিছু ভিডিও এমন পাওয়া গেছে যেগুলোতে নারীদের অজান্তের তাদের ব্যক্তিগত মূহূর্তের দৃশ্য ধারণ করে পোস্ট করা হয়েছে।

বিশ্লেষণের পাশাপাশি দ্য ডিসেন্ট অনুসন্ধান করে ভাইরাল ভিডিওটি কোথায় ধারণ করা তা বের করার চেষ্টা করেছে। এছাড়াও চেষ্টা করা হয়েছে আইডিটির পেছনে থাকা ব্যক্তিটি কে তা চিহ্নিত করার।

ভাইরাল ভিডিওটি রাঙ্গামাটি শহরে তোলা

ভাইরাল ভিডিওতে দৃশ্যমান বিভিন্ন সূত্র ধরে দ্য ডিসেন্ট ঘটনাস্থলটিকে রাঙ্গামাটি শহরের কল্যাণপুর এলাকায় জিওলোকেট করেছে। ক্লিপটি ধারণ হয়েছে, কল্যাণপুর মূল সড়কের কাজলং রেস্টুরেন্ট এন্ড ফাস্টফুডের সামনের।

ভিডিওটি কি সম্প্রতি তোলা নাকি অনেক আগে কখনও তোলা– তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে একই ঘটনাস্থলে প্রায় একইরকমভাবে তোলা আরেকটি ভিডিও পাওয়া যায়, যেটি ‘Bangladesh Army’ নামে একটি টিকটক একাউন্ট থেকে গত সপ্তাহে পোস্ট করা হয়েছিল।

টিকটকে পোস্ট করা ভিডিওটিতেও দুইজন পাহাড়ি নারীকে হেঁটে যেতে দেখা যাচ্ছে এবং লুকিং গ্লাসে তাদের চলার দৃশ্য রেকর্ড করা হয়েছে সেনাবাহিনীর গাড়ি থেকে। ভিডিওটির স্ক্রিনে লিখে দেয়া হয়েছে, “ইউনিফর্মটা পড়েছি ঠিকই, কিন্তু হারিয়ে ফেলেছি জীবনের সব স্বাধীনতা”।

এই ভিডিওতে হেঁটে যাওয়া দুই তরুণীর পরিচয়ও পাওয়া গেছে। তারা হলেন লীলা চাকমা ও মেমাচিং মারমা। তারা উভয়ে রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজের ইংরেজি ডিপার্টমেন্টে অনার্স ৪র্থ বর্ষের ছাত্রী বলে দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছেন লীলা চাকমা।

লীলা তার ফেসবুক আইডিতে ভাইরাল ভিডিওটির স্ক্রিনশট শেয়ার দিয়ে লিখেছেন, “...ভিডিওতে আমাকে এবং আমার এক বান্ধবীকে দেখানো হয়েছে।”

লীলা দ্য ডিসেন্টকে বলেছেন, “২০ এপ্রিল আমি এবং আমার বান্ধবী মেমাচিং মারমা ক্লাস শেষে ফেরার সময়, আনুমানিক দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে, সেনাবাহিনীর একটি গাড়ি থেকে ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছে।

তবে কেউ তাদের হাঁটার ভিডিও ধারণ করছে কিনা সে বিষয়ে তাদের ধারণা ছিল না।

তিনি আরও বলেন, “ঘটনাটি সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। পরবর্তীতে গত বুধবার (২৯ তারিখ) আমার এক বান্ধবী টিকটক থেকে ভিডিওটি ডাউনলোড করে আমাকে পাঠালে বিষয়টি আমার নজরে আসে।”

“ভিডিওটির সঙ্গে একটি অশোভন ও অপ্রাসঙ্গিক মিউজিক ব্যবহার করে আমাকে এবং আমার বান্ধবী মেমাচিং মারমাকে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত অসম্মানজনক ও বিব্রতকর”, বলেছেন লীলা।

তিনি বলেন, “এই ধরনের আচরণ কোনোভাবেই একজন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয়। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট সেনা সদস্যের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।”

ফেসবুকে ‘বীর যোদ্ধা’, টিকটকে ‘বাংলাদেশ আর্মি’

ফেসবুকে ‘বীর যোদ্ধা’ নামে চালানো আইডিটি ২০২৪ সালের মার্চ মাসে খোলা হয়েছে। এরপর থেকে গতকাল পর্যন্ত ৩৫০টির বেশি রিলস ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। এসব ভিডিওর বেশিরভাগই সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের দৃশ্য এবং সেনা পোশাক পরা একজন ব্যক্তির বিভিন্ন ধরনের ছবি-ভিডিও। এসব ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে নারী বিষয়ক নানান ধরনের কথাবার্তা এবং অনেক ক্ষেত্রে গান থাকে; যেগুলো আপত্তিকর নয়।

তবে কয়েকটি ভিডিও পাওয়া গেছে যেখানে নারীদের নিয়ে আপত্তিকর কন্টেন্ট রয়েছে। গত ২৮ এপ্রিল কল্যাণপুর এলাকায় আরও একটি ভিডিও আপলোড করা হয়েছে যেখানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির আরেকজন নারীর শরীরের ওপর ফোকাস করে তোলা। এই ভিডিওটিও টহলরত সেনাবাহিনীর গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে তোলা হয়েছে। ১০ সেকেন্ডের এই ভিডিওতেও ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক যুক্ত করে প্রচার করা হয়েছে।

একই আইডিতে ১ এপ্রিল আরেকটি ভিডিও পাওয়া যায়, সেনাবাহিনীর টহলরত গাড়ির সামনের সিট থেকে জুম করে একটি মেয়ের হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য ধারণা করা হয়েছে। মেয়েটির চুল বেশ লম্বা। গান যুক্ত করে ভিডিওটি আপলোড করে ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, ‘আর যাই বলেন চুল গুলো ভালো লাগার মতো।’

এর আগে ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর আপলোডকৃত আরেকটি রিলসে দেখা যায়, দু’জন নারী সেনাসদস্য জুতা পরার আগে মোজা পরছেন। দূর থেকে একজন পুরুষ অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করছেন। ১৪ সেকন্ডের এই ক্লিপটিতে একটি গান যুক্ত করে ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, ‘বিপদে বন্ধুর পরিচয় বলেন তো বিপদটা কি হতে পারে’।

‘বীর যোদ্ধা’ নামক ফেসবুক আইডিতে একজন ব্যক্তির ছবি বারবার পোস্ট করা হলেও কখনই চেহারা পুরোপুরি দৃশ্যমান করা হয়নি। কয়েকটি ভিডিওতে মুখের একটি অংশ দেখানো হয়েছে।

তবে দ্য ডিসেন্ট একই ব্যক্তির পরিচালনা করা দুটি টিকটক একাউন্টের সন্ধান পেয়েছে। উভয় একাউন্টের নাম ‘Bangladesh Army’; এর মধ্যে একটি একাউন্ট ২৯ এপ্রিল ফেসবুকের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর প্রাইভেট করা হয়েছে। ফলে এটির কন্টেন্ট দ্য ডিসেন্ট বিশ্লেষণ করতে পারেনি। এই একাউন্টে নিজের ও বান্ধবীর ভিডিও পেয়ে সেটির স্ক্রিন রেকর্ড করে রেখেছিলেন লীলা চাকমা; যা তিনি দ্য ডিসেন্টকে দেখিয়েছেন।

তবে একই ‘Bangladesh Army’ নামের আরেকটি একাউন্টের সন্ধান পেয়েছে যেটির ইউজারনেইম ‘tanviry1’; এই একাউন্টের অনেকগুলো ভিডিওতে এক ব্যক্তির চেহারার বেশিরভাগ অংশ দৃশ্যমান পাওয়া গেছে। ‘বীর যোদ্ধা’তে যেই ব্যক্তির মুখের একাংশ দেখা যায়, সেই ব্যক্তির চেহারার সাথে ‘tanviry1’ ইউজারনেইমন ওয়ালা একাউন্টটির ব্যক্তির চেহারা হুবহু মিলে যায়। উভয়ের চুলে কাটিং, চোখের একপাশে তিল, ভ্রুর ও কানের ডিজাইন পুরোপুরি একই রকম। উভয়ের শরীরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পোশাক রয়েছে।

কে এই সেনাসদস্য?

‘বীর যোদ্ধা’ বা ‘Bangladesh Army’ নামের এবং ‘tanviry1’ ইউজারনেইম এর একাউন্ট দুটি পরিচালনাকারী ব্যক্তির নাম পরিচয় কী তা জানার চেষ্টা করেও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ইউজারনেইম ‘তারভীর’ হলেও আদৌ এটি এই সেনাসদস্যের নাম কিনা তা নিশ্চিত নয়।

তবে ‘বীর যোদ্ধা’ আইডিতে দেয়া তথ্য মতে, তার বাড়ি সিলেটের গোয়াইনঘাটে। জন্ম ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৪। পড়াশোনা এমসি কলেজে। সেনাবাহিনীতে কর্মরত ২০২০ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে। এসব তথ্য নিজস্ব পদ্ধতিতে যাচাই করতে পারেনি দ্য ডিসেন্ট। তবে কয়েকটি ভিডিওতে ব্যাকগ্রাউন্ডে পুরুষ কণ্ঠে সিলেটি ভাষায় কথা বলতে শোনা গেছে। এতে তার বাড়ি সিলেটে হতে পারে বলে অনুমান করা যায়।

পাশাপাশি এটিও নিশ্চিত যে, আলোচ্য ব্যক্তিটি গত ২০ এপ্রিল পর্যন্ত রাঙ্গামাটি শহর এলাকায় দায়িত্বরত ছিলেন।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য রাঙ্গামাটি শহরের সেনাক্যাম্পের যোগাযোগ নম্বর সংগ্রহের জন্য একাধিক পন্থায় চেষ্টা করেও সফল হওয়া যায়নি। পরবর্তীতে আইএসপিআরের পরিচালককে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।

সূত্র : দ্য ডিসেন্ট 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়