শাহাজাদা এমরান, স্টাফ রিপোর্টার, কুমিল্লা : কুমিল্লা নগরের রাজগঞ্জ পানপট্টি এলাকায় আটতলা ভবনের একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী (৩৫) ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। রোববার সকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বুলেটের মা নীলিমা বৈরাগীর কোলে তাঁর শিশুপুত্র অব্যয় বৈরাগী। পাশে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফেলছেন স্ত্রী উর্মি হীরা। আশপাশের ফ্ল্যাটের লোকজন ও স্বজনেরা জিনিসপত্র গোছাচ্ছেন। ভবনের নিচে অপেক্ষা করছে একটি গাড়ি। কিছুক্ষণের মধ্যেই মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়।
এ সময় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে বুলেট বৈরাগীর মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষ হয়। বাসায় ফিরে ছেলের জন্য বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন মা নীলিমা বৈরাগী। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “বুলেট আমার সোনার ছেলে। আমার সোনার ছেলেটার দেহ কীভাবে আগুনে দাহ হবে।” পাশে দাঁড়িয়ে স্ত্রী উর্মি হীরা বলেন, “অন্য কিছু জানতে চাই না। আমার একটাই জানতে চাওয়া—আমার স্বামীর সঙ্গে কী ঘটেছিল? সেটা একটিবার জানতে চাই।”
চট্টগ্রাম থেকে গত শুক্রবার রাতে কুমিল্লার বাসায় ফিরছিলেন বুলেট বৈরাগী। বাসা থেকে অল্প দূরে এসে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে কথা বলেন তিনি। কিন্তু তাঁর আর বাসায় ফেরা হয়নি। শনিবার সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকার একটি হোটেলের পাশ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহের মুখমণ্ডলে রক্তাক্ত চিহ্ন ছিল।
পরিবারের সদস্যদের ধারণা, তিনি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এ ঘটনায় শনিবার রাতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় হত্যা মামলা করেছেন তাঁর মা নীলিমা বৈরাগী। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। তবে রোববার দুপুর পর্যন্ত হত্যার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।
বুলেট বৈরাগী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা সুশীল বৈরাগীর ছেলে। তিনি ৪১তম বিসিএস নন-ক্যাডার পদে কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট বিভাগে যোগ দেন। পরে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকেই ১ এপ্রিল চট্টগ্রামে ৪৪তম বনিয়াদি প্রশিক্ষণে অংশ নিতে যান। চাকরির কারণে তিনি কুমিল্লা নগরের ওই ভাড়া বাসায় থাকতেন। তিনি ছিলেন মা–বাবার একমাত্র সন্তান।
নীলিমা বৈরাগী বলেন, “আমার নাম নীলিমা হলেও ছেলের কাগজপত্রে লিলিমা হয়েছে। আমার স্বামী কৃষক ছিলেন। অনেক কষ্টে ছেলেকে বড় করেছি। শুক্রবার দিবাগত রাত ২টা ১০ মিনিটে ওর সঙ্গে কথা হয়। তখন বলল, বাসে আছে, একটু পরেই বাসায় ফিরবে। পরে আবার ফোন দিলে আর ধরেনি। আমরা অস্থির হয়ে পড়ি। ভোরের দিকে একবার ফোন রিসিভ হয়, কিন্তু কণ্ঠটা আমার ছেলের মতো লাগেনি। তখনই বুঝেছিলাম, কিছু একটা হয়েছে। পরে শুনলাম, আমার ছেলের লাশ পাওয়া গেছে।”
স্ত্রী উর্মি হীরা জানান, তাঁর স্বামীর চট্টগ্রামে প্রশিক্ষণ চলছিল। প্রতি সপ্তাহে বৃহস্পতিবার রাতে কুমিল্লায় ফিরতেন তিনি। শুক্রবার রাঙামাটির কাপ্তাই ঘুরে রাত ১১টার দিকে চট্টগ্রামের অলঙ্কার মোড় থেকে বাসে ওঠেন। তবে লাশ উদ্ধারের সময় তাঁর মুঠোফোনটি পাওয়া যায়নি।
সন্তানের জন্মদিন পালন করা হলো না
২০২২ সালের ২২ এপ্রিল উর্মি হীরা ও বুলেট বৈরাগীর বিয়ে হয়। গত বুধবার ছিল তাঁদের বিবাহবার্ষিকী। কিন্তু প্রশিক্ষণের কারণে বুলেট কুমিল্লায় আসতে পারেননি। তাঁদের ছেলে অব্যয় বৈরাগীর বয়স ২৭ এপ্রিল এক বছর পূর্ণ হওয়ার কথা। এই জন্মদিন উদ্যাপন করার জন্যই শুক্রবার রাতে চট্টগ্রাম থেকে রওনা দেন বুলেট। পরিকল্পনা ছিল জন্মদিন শেষে আবার ভোরেই চট্টগ্রামে ফিরে যাবেন। কিন্তু সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়ন হলো না।
সহকর্মীদের শেষশ্রদ্ধা
ময়নাতদন্ত শেষে রোববার বেলা ১১টার দিকে বুলেট বৈরাগীর মরদেহ কুমিল্লা নগর উদ্যানের পাশে অবস্থিত কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে সহকর্মীরা ফুল দিয়ে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। এ সময় কমিশনার আবদুল মান্নান সরদার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন।
পরে মরদেহবাহী গাড়ির সামনে স্ত্রী, মা ও স্বজনেরা বিলাপ করতে থাকেন। সেখান থেকে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়।
এ বিষয়ে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিরাজুল মোস্তফা বলেন, “এ ঘটনায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। তদন্তে ঘটনাটির রহস্য উদ্ঘাটন করা হবে।”