হাবিবুর রহমান, পূর্বধলা (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি: নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার ঐতিহাসিক রাজধলা বিল এখন সৌন্দর্যের আড়ালে চরম সংকটের মুখে পড়েছে। পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঈদের দিন থেকে এই নান্দনিক বিলে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় থাকলেও বর্তমান জরাজীর্ণ দশা, যাতায়াত বিড়ম্বনা আর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে স্থানীয় ও পর্যটকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
প্রায় ১৩০ একর আয়তনের এই বিলটি এক সময় স্বচ্ছ জলরাশি আর সুস্বাদু দেশীয় মাছের জন্য বিখ্যাত ছিল। বিশেষ করে এখানকার ‘চাপিলা’ মাছের স্বাদ ও ঘ্রাণ ছিল অতুলনীয়। তবে বর্তমানে বিলের বড় একটি অংশ কচুরিপানা ও আবর্জনার স্তূপে ঢাকা পড়ায় এই ঐতিহ্যবাহী মাছ এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। শুধু চাপিলা নয়, আগে এখানে বিভিন্ন প্রজাতির বড় বড় মাছের দেখা মিললেও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে এখন তা আর চোখে পড়ে না। এমনকি শীতকালে অতিথি পাখির কলকাকলিতে যে বিল মুখরিত থাকত, দূষণ ও সংস্কারের অভাবে এখন তাদের আনাগোনাও আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
বিলের একমাত্র বিনোদন কেন্দ্রটিতেও লেগেছে চরম অবহেলার ছাপ। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নির্মিত মিনি পার্কের রাইডগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অল্প দিনের মধ্যেই ভেঙে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এর ফলে শিশুদের আনন্দ এখন ঝুঁকিতে। এছাড়াও পর্যটন কেন্দ্রে পর্যাপ্ত টয়লেট ও বিশুদ্ধ পানির সুব্যবস্থা না থাকায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। রাজধানী ঢাকা থেকে আসা দর্শনার্থী সজিব আহমেদ জানান, লোকমুখে বিলের সৌন্দর্যের কথা শুনে দেখতে এলেও বাস্তবে কচুরিপানা আর আবর্জনার স্তূপ দেখে তিনি হতাশ হয়েছেন।
যাতায়াতের ক্ষেত্রেও দর্শনার্থীদের পোহাতে হচ্ছে চরম ভোগান্তি। আগে পূর্বধলা সরকারি কলেজের ভিতর দিয়ে পর্যটকরা যাতায়াত করলেও সম্প্রতি সেখানে গেট নির্মাণ করে রাস্তাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে বিলে প্রবেশের জন্য পর্যটকদের প্রায় আড়াই কিলোমিটার পথ ঘুরে আসতে হচ্ছে, যা ভ্রমণপিপাসুদের জন্য বড় ধরনের বিড়ম্বনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পূর্বধলা সরকারি কলেজের পাশেই অবস্থিত এই বিলের সাথে জড়িয়ে আছে প্রাচীন সুসং জমিদারদের ইতিহাস। জেলা পরিষদের অর্থায়নে প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে অবকাঠামো উন্নয়নের কিছু কাজ হলেও তার সুফল দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। বিলটি লিজ দেওয়া হলেও ইজারাদার কিংবা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কচুরিপানা পরিষ্কার বা মাছের বংশবৃদ্ধি রক্ষায় কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। সংস্কারের অভাবে রাস্তার মাটি সরে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সাবেক উপজেলা পরিষদ ভাইস চেয়ারম্যান শেখ রাজু আহমেদ রাজ্জাক সরকারের মতে, বিলের চারপাশের সড়কটি স্থায়ীভাবে পাকা করা এবং লিজ দেওয়া জমিগুলো পরিকল্পিতভাবে সংস্কার করা হলে এখান থেকে সরকারের বড় অংকের রাজস্ব আয় সম্ভব।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) তাসনীম জাহান বলেন, তিনি নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন সমস্যার বিষয়ে তিনি তেমন কিছু জানেন না। তবে পর্যটকগণ যাতে নির্বিঘ্নে সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে সেজন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, যাতায়াতের পথ সুগম করা, দ্রুত কচুরিপানা পরিষ্কার ও পর্যটনবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা না হলে প্রকৃতির এই অনন্য দান রাজধলা বিল অচিরেই তার জৌলুস হারিয়ে ফেলবে।