শিরোনাম
◈ ঢাকার চীনা দূতাবাসে ইমেইলে হামলার হুমকি, শুরু হয়েছে তদন্ত ◈ ‘বিয়ের ফাঁদে’ চীনে পাচার : ৫ বছরে গেছেন ৪২২৬ বাংলাদেশি নারী, অনেকের স্বপ্ন পরিণত হয়েছে ‘অভিশপ্ত নরকে’ ◈ খাটের নিচে ছেলে, ছাদে স্ত্রী-মেয়ে; অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের বাড়িতে ৪ লাশ ◈ এআইয়ের কাছে কখনোই চাইবেন না এই ৫ পরামর্শ ◈ সকালের মধ্যে দেশের ৭ জেলায় ঝরতে পারে বৃষ্টি ◈ সৌদি-তুর্কি-পাকিস্তানের জোটে যোগ দেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ‘ইতিবাচক’: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ◈ ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা, বৃটেনে পুলিশ কর্মকর্তাসহ সাতজন নিহত ◈ বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা: বাণিজ্যমন্ত্রী ◈ কলকাতার ৭ বাংলাদেশি নিহত: সেই হোটেল মালিক গ্রেপ্তার ◈ পর্তুগালে একের পর এক বাংলাদেশি প্রবাসীর মৃত্যু, ১৫ দিনে প্রাণ গেল ৪ জনের

প্রকাশিত : ২৩ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:৩৪ সকাল
আপডেট : ২৩ আগস্ট, ২০২৬, ০৮:২৫ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বড়লোকের কবরের মেয়াদ বাড়ে, গরিবের কবর হারিয়ে যায়

মৃত্যুর পর আপনার কবর কোথায় হবে, তা কেবল আপনার বা পরিবারের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না; আপনি যদি ঢাকাবাসী হয়ে থাকেন, বিদায়কালে আপনি কত অর্থবিত্ত রেখে যেতে পারলেন, সেটাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকার দুই সিটিতে সরকারি কবরস্থানগুলোতে কবর হয় দুই ধরনের–সাধারণ ও সংরক্ষিত। এর মধ্যে সাধারণ কবর ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত সময় পরপর নতুন করে ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ একই কবরে নতুন লাশ দাফন করা হয়।

অন্যদিকে সংরক্ষিত কবর নির্দিষ্ট মেয়াদে সংরক্ষণের সুযোগ আছে। লাখ থেকে কোটি টাকা খরচ করে বছরের পর বছর প্রিয়জনের কবরের মেয়াদ বাড়িয়ে নিতে পারেন বিত্তবানেরা।

কেউ তার প্রিয়জনের কবর ২৫ বছরের জন্য সংরক্ষণ করতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২০ লাখ টাকা দিতে হয়। আর উত্তর সিটি করপোরেশনের বনানী কবরস্থানে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত লাগে!

কবরের জমির দাম কেন এত বেশি? সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, সবাই তার প্রিয়জনের জন্য স্থায়ী কবর চাইলে সেই স্থান সংকুলান করা সম্ভব না। মানুষ যাতে ঢাকায় দাফনের চিন্তা বাদ দিয়ে প্রিয়জনকে গ্রামের বাড়িতে কবর দিতে উৎসাহিত হন, সে কারণেই এ ব্যবস্থা।

এ নিয়মের ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে ঢাকায় প্রিয়জনের কবর সংরক্ষণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ালেও সমাজের বিত্তবানরা মোটা টাকা খরচ করে কবরের স্থায়ী ঠিকানা নিশ্চিত করতে পারছেন।

অর্থাৎ, প্রিয়জনের শেষ স্মৃতিচিহ্নটুকু ধরে রাখাও এখন নির্ভর করছে আর্থিক সক্ষমতার ওপর।

কোথায় কেমন খরচ

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ছয়টি কবরস্থানে নির্ধারিত মেয়াদে কবর সংরক্ষণের জন্য গুনতে হয় কয়েক লাখ থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত।

‘ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কবরস্থানগুলোর নীতিমালা-২০২২’ অনুযায়ী, ১৫ ও ২৫ বছর মেয়াদে কবর সংরক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফি বনানী কবরস্থানে।

সেখানে ১৫ বছরের জন্য ১ কোটি টাকা এবং ২৫ বছরের জন্য দেড় কোটি টাকা দিতে হয়।

উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টর কবরস্থানে ১৫ বছরের জন্য ৭৫ লাখ এবং ২৫ বছরের জন্য ১ কোটি টাকা লাগে।

উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টর কবরস্থানে যথাক্রমে ৫০ লাখ ও ৭৫ লাখ টাকা; উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টর কবরস্থানে ৩০ লাখ ও ৫০ লাখ টাকা; মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে ২০ লাখ ও ৩০ লাখ টাকা এবং রায়েরবাজার স্মৃতিসৌধসংলগ্ন কবরস্থানে ১০ লাখ ও ১৫ লাখ টাকা দিতে হয়।

অর্থাৎ ডিএনসিসির কবরস্থানগুলোর মধ্যে ১৫ বছরের সংরক্ষণ ফি ১০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা এবং ২৫ বছরের ফি ১৫ লাখ থেকে দেড় কোটি টাকার মধ্যে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতাধীন আজিমপুর, জুরাইন ও খিলগাঁও কবরস্থানেও মেয়াদ বাড়াতে বিপুল অর্থ খরচ করতে হয়।

এই তিনটি কবরস্থানেই ১০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত কবর সংরক্ষণের অভিন্ন নিয়ম রয়েছে।

যে কোনো কবরস্থানে ১০ বছর মেয়াদে সংরক্ষণের ফি পাঁচ লাখ টাকা, ১৫ বছর মেয়াদে সংরক্ষণের ফি ১০ লাখ টাকা, ২০ বছর মেয়াদে সংরক্ষণের ফি ১৫ লাখ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২৫ বছর মেয়াদে সংরক্ষণের ফি ২০ লাখ টাকা।

বিশেষ নিয়ম ও পুনঃকবর

ডিএনসিসির কবরস্থান ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুযায়ী, সাধারণ এলাকায় দাফন করা কবর সংরক্ষিত কবর হিসেবে রাখা হয় না; নির্ধারিত সময় পর ওই স্থান পুনরায় দাফনের জন্য ব্যবহার করা হয়।

তবে বিশেষ ব্যক্তিদের কবর সংরক্ষণের জন্য ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। নীতিমালায় বলা হয়েছে, সরকারের নির্দেশ বা মেয়রের অভিপ্রায় অনুযায়ী ‘জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বরেণ্য ব্যক্তির’ কবর সাধারণ এলাকায় হলেও সংরক্ষণ করা যাবে।

এ ক্ষেত্রে সংরক্ষিত এলাকার জন্য নির্ধারিত ফির তিন গুণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

ফলে সাধারণ এলাকার কবর যেখানে নির্দিষ্ট সময় পর পুনরায় দাফনের জন্য ব্যবহৃত হওয়ার কথা, সেখানে নীতিমালার বিশেষ বিধানের আওতায় ‘বরেণ্য’ ব্যক্তির কবর অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা সম্ভব।

এছাড়া, সংরক্ষিত কবরে পরিবারের অন্য সদস্যের মৃতদেহ পুনরায় দাফন বা পুনঃকবরের ক্ষেত্রেও মোটা অঙ্কের ফি দিতে হয়।

ডিএনসিসিতে বনানী কবরস্থানের ক্ষেত্রে পুনঃকবর রেজিস্ট্রেশন ফি ৫০ হাজার ৫০০ টাকা এবং অন্যান্য কবরস্থানের জন্য ৩০ হাজার ৫০০ টাকা।

ডিএসসিসির কবরস্থান ব্যবস্থাপনা নীতিমালা ২০২০ অনুসারে, প্রতিটি সংরক্ষিত কবরে পুনঃকবরের ফি ৫০ হাজার টাকা।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নীতিমালা অনুসারে, মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত বিশেষ এলাকায় খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের কবর সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।

তবে মুক্তিযোদ্ধার পরিবার তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের যে কোনো কবরস্থানে কবর সংরক্ষণ করতে পারবে।

মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের বর্ধিত অংশের ১.৫ একর জায়গা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্ধারিত সাধারণ কবরে দাফনের ক্ষেত্রে প্রমাণক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত তালিকায় নাম থাকতে হবে এবং যথাযথ সনদ দাখিল তরে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে।

মিরপুরে আবেদনের ভিত্তিতে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রথম ১০ বছর ফি ছাড়া কবর সংরক্ষণের পর পরবর্তী সময়ের জন্য নির্ধারিত হারে ফি প্রযোজ্য হবে।

তবে রায়েরবাজার স্মৃতিসৌধ সংলগ্ন কবরস্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের কবর আজীবন সংরক্ষিত থাকবে।

ঢাকার কবরস্থানগুলোতে সাধারণ কবরে কতদিন পরপর নতুন করে ব্যবহার করা হয়?

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা বললেন, সাধারণ কবরগুলো দুই বছর সংরক্ষণ করার নিয়ম। তবে অনেক সময় ব্যতিক্রম হয়।

“দুই বছর পর কবরগুলোকে আমরা 'চালা' করে ফেলি। কিন্তু অনেকক্ষেত্রে দেখা যায়, কিছু কবর হওয়ার পর, আত্মীয়স্বজন আর খোঁজ নেন না কিংবা অনেক্ষেত্রে খোঁজ নেওয়ার মত আত্মীয়স্বজন থাকেও না।

“সে কবরগুলো অনেকসময় ভুলবশত আগেই চালা করে ফেলা হয়। হয়ত এক বছর পর হল, কিংবা কিছু ক্ষেত্রে অনেকসময় ৬ মাস পরেও হয়।”

স্মৃতি ধরে রাখার আক্ষেপ বনাম আর্থিক সামর্থ্য

ঢাকা শহরে জায়গার তীব্র সংকট সাধারণ মানুষও বোঝেন। তবে তাদের আক্ষেপ মূলত সামর্থ্য নিয়ে।

মালিবাগের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জায়গা সীমিত, এটা আমরা বুঝি। ঢাকায় সবাই যদি কবর চিরস্থায়ী করতে চান, তাহলে নতুন মানুষকে দাফন করার জায়গা থাকবে না।

“কিন্তু সিটি করপোরেশনের উচিত ছিল এমন একটি ব্যবস্থা করা, যাতে সাধারণ মানুষও অন্তত আরও কিছুটা সময় প্রিয়জনের কবরের স্মৃতি ধরে রাখতে পারেন।”

একই সুর পাওয়া গেল শাহাদুল্লাহ জিলানীর কথায়। কবরের জন্য লাখ টাকার ফিকে 'বৈষম্যমূলক' হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, “কবর সংরক্ষণের এত টাকা যাদের আছে, তারা হয়ত এটাকে সমস্যা মনে করবেন না। কিন্তু নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য পাঁচ লাখ টাকাও অনেক বড় অঙ্ক। এ ধরনের আবেগ কি আর্থিক সামর্থ্য়ের হিসাব বোঝে?”

আত্মীয় পরিজন মারা গেলে ঢাকার অধিকাংশ মানুষ ছেটেন গ্রামের বাড়িতে। বারিধারার বাসিন্দা ফারহান সিয়াম তেমনই একজন।

তিনি বলেন, "দাদি মারা গেলে লাশ দাফন করতে আমরা বগুড়ায় গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাই। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন হয়েছে। সেই কবর কখনো মুছে যাবে না। অথচ ঢাকায় কোটি টাকা খরচ করলেও ১০ থেকে ২০ বছরের বেশি সংরক্ষণ করা সম্ভব হত না।"

ইসলাম কী বলে?

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গবেষণা বিভাগের মুহাদ্দিস ড. ওয়ালীয়ুর রহমান খান বলেন, ইসলামে শুধু মাটির নিচে কবর দেওয়ার কথা বলেছে। এরপর একটি যৌক্তিক সময় পর সেই কবরের ওপর আবার কবর দেওয়ার অনুমোদন রয়েছে।

“কারণ পৃথিবীতে কবর দেওয়ার জন্য অসীম জায়গা নেই। আরবের মত যেসব অঞ্চলে পাথুরে বা বালুময় মাটি, সেখানেও একাধিক ব্যক্তিকে একই স্থানে ধারাবাহিকভাবে কবর দেওয়ার প্রচলন রয়েছে।”

তিনি বলেন, যুদ্ধের সময় শহীদদের ক্ষেত্রেও কখনো কখনো একটি কবরে ১০-২০ জনকে পর্যন্ত দাফন করতে হয়। সেটাও নীতিগতভাবে ঠিক আছে।

ওয়ালীয়ুর রহমান বলেন, জনসংখ্যা ও জমি সঙ্কট বিবেচনায় সিটি করপোরেশন বা কোনো সংস্থা কবরস্থান পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা ব্যয়, জমির মূল্যসহ সংশ্লিষ্ট খরচ বিবেচনায় যে অর্থ নেয়, তা চাঁদা হিসেবে নেওয়া ‘বৈধ’।

“কেউ কবর সংরক্ষণ করলে তাতেও ধর্মীয়ভাবে সমস্যা নেই। তবে এতে কোনো প্রতারণা বা অন্য কোনো অনাচার থাকলে সেটি আলাদা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এটা কবরের সঙ্গে সম্পৃক্ত না।”

দরিদ্র মানুষের জন্য সরকার বা সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে অথবা কম খরচে কবরের ব্যবস্থা করা উচিত বলে মনে করেন এই হাদিস বিশারদ।

তিনি বলেন, পারিবারিক ও মসজিদভিত্তিক কবরস্থানও বৈধ।

একটি কবরের ওপর কতদিন পর নতুন কবর দেওয়া যায় জানতে চাইলে ওয়ালীয়ুর বলেন, বিষয়টি নির্দিষ্ট দিনের হিসাবের চেয়ে মাটির অবস্থা ও আগের কবরের মরদেহের অবশিষ্টাংশের ওপর নির্ভরশীল।

ঢাকার কবরস্থানগুলোতে অর্থের বিনিময়ে দীর্ঘ সময় কবর সংরক্ষণের প্রবণতা এবং বিশেষ স্থানে কবরকে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে দেখার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, “কবর সংরক্ষণ যদি শুধু আভিজাত্য প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে করা হয়, তাহলে সেটি গুনাহের কারণ হতে পারে।

“আর যদি সংরক্ষণ এই জন্য হয় যে পরবর্তী প্রজন্ম দেখবে, তারা দাদা-দাদীর জন্য দোয়া করবে, স্মরণ করবে, ভালো নিয়তে যদি হয়, সওয়াবের কাজের উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে অন্যভাবে গণ্য হবে।”

ইসলামে কবর সংরক্ষণ বা সুরক্ষার ক্ষেত্রে পরিমিতিবোধ ও সাদাসিধেপন্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কবরের অবমাননা রোধ বা তা চিনে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু ব্যবস্থা বৈধ হলেও, অতিরিক্ত শৌখিনতা বা পাকা করার ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

ড. ওয়ালীয়ুর বলেন, কবরের চারপাশে পিলার দেওয়া বা লোহা দিয়ে ঘের দেওয়া যেতে পারে। তবে ইট-পাথর দিয়ে চারপাশ বাঁধানো যাবে না।

“মূল বিষয় হলো কবরের চারপাশ পাথর বা ইট দিয়ে বাঁধানো যাবে না। এটি বিদাত।”

কবর চিহ্নিত করার জন্য মাথার দিকে নাম লেখা পাথর দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এর বৈধতা রয়েছে। কারণ কবর চিহ্নিত করে রাখার প্রয়োজন রয়েছে।

নগর পরিকল্পনার ঘাটতি ও বাণিজ্যিকীকরণ

ঢাকায় কবরের এই তীব্র সংকট ও বাণিজ্যিকীকরণের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, মূল সমস্যা হল ঢাকার মতো শহরে জমির দাম অনেক বেশি।

“শহর যে অনুপাতে বেড়েছে, সে অনুপাতে আমরা কবরস্থানের জন্য জায়গা নির্দিষ্ট রাখিনি। সরকারের যে অল্প কয়েকটা কবরস্থান আছে, তাতে মৃত্যুর তুলনায় জায়গা খুবই কম।”

পরিকল্পনার অভাবে কবরস্থানের ক্ষেত্রেও এখন অর্থনীতির 'চাহিদা ও যোগানের নিয়ম’ প্রযোজ্য হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন আদিল।

তিনি বলেন, “বনানীতে কোটি টাকা দিয়ে কবরের জায়গা নেওয়ার মানুষ আছে। ফলে স্পিরিচুয়াল আবেদনের জায়গাটি এখন ডিমান্ড-সাপ্লাইয়ের জায়গায় চলে গেছে। তাতে বৈষম্য হচ্ছে এবং হবে।”

এই নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, ২০০৪ সালের বেসরকারি আবাসিক প্রকল্পের ভূমি উন্নয়ন বিধিমালায় পার্ক বা খেলার মাঠের কথা থাকলেও কবরস্থানের উল্লেখ ছিল না। ফলে বেসরকারি আবাসনগুলোতেও কবরস্থানের জায়গা রাখা হয়নি।

তাতে সংকট আরও বেড়েছে মন্তব্য করে এলাকাভিত্তিক বা ওয়ার্ডভিত্তিক কবরস্থান গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।

জমির সংকট ও কর্তৃপক্ষের ‘কৌশল’

কবরের জন্য বিপুল পরিমাণ ফি নির্ধারণের বিষয়ে প্রশ্ন করলে ডিএনসিসির প্রধান সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামুন-উল-হাসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের ঢাকা শহরের কবরের আয়তন আর বাড়ানো যাচ্ছে না, কিন্তু মানুষ প্রতিনিয়তই বাড়ছে। তাই সংরক্ষণের ফি বাড়ানোর অন্যতম উদ্দেশ্য হল মানুষকে এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ থেকে নিরুৎসাহিত করা।”

ডিএনসিসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভিন্ন এক সংকটের কথা বললেন।

তিনি বলেন, ২০০৭ সালের আগে কবরস্থানের জমি মালিকানার ভিত্তিতে দেওয়ার নিয়ম ছিল। সিটি করপোরেশনের জায়গা সীমিত হওয়ায় পুরোনো এসব কবরের জমি ভবিষ্যতে পুনরায় অধিগ্রহণ করা যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

“কিন্তু এসব কবরের মালিকানা সমাজের ক্ষমতাশালী মানুষদের হাতে থাকায় বাস্তবে কতটা অগ্রগতি সম্ভব হবে, তা এখনও নিশ্চিত নয়।”

অন্যদিকে ডিএসসিসির প্রধান সমাজকল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, উত্তরে ১৯২ একর জায়গা থাকলেও দক্ষিণে মোট কবরস্থান রয়েছে মাত্র ৫৯ একরের। অথচ জনসংখ্যার চাপ দক্ষিণে বেশি।

তিনি বলেন, “আমাদের এই ৫৯ একরের অর্ধেকের বেশি অংশ ইতোমধ্যে বিভিন্ন মেয়াদে সংরক্ষিত অবস্থায় আছে। বাকিটুকু পরিচালনা করা, বিশেষ করে আজিমপুরের ক্ষেত্রে খুবই চ্যালেঞ্জিং হয়ে যায়।”

সচ্ছল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সামঞ্জস্য আনতে এবং কবর সংরক্ষণে নিরুৎসাহিত করতে দক্ষিণেও একটি নতুন প্রবিধানমালার খসড়া তৈরি করে স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠানো হয়েছে বলে জানান মোবাশ্বের।

নীতি কেন সবার জন্য সমান নয়?

নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলছেন, এখনো ঢাকার দুই তৃতীয়াংশ লাশ বাইরে চলে যায় বলে চাপ কিছুটা কম আছে।

তিনি বলেন, “যাদের সুযোগ আছে এবং গ্রামের বাড়িতে পারমানেন্টলি কবর দেওয়ার জায়গা আছে, তারা তো গ্রামে নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু নগরবাসীর জন্য এখন ঢাকার মধ্যে আসলে কবরস্থানটা পারমানেন্টলি রাখা যাচ্ছে না।”

নগরবাসীর উদ্দেশে আদিল বলেন, “ইসলামের যে শিক্ষা, সেটা হচ্ছে, মাটির নিচে যখন আপনি সমাহিত করলেন, সমাহিত করার পরে সেখানে আরেকটা কবর হওয়াটা ইসলামের দৃষ্টিতে সেই অর্থে খারাপ কিছু না। সৌদি আরবে কবরস্থানে কোনো চিহ্ন রাখা হয় না। কবর দিয়ে সমান করে ফেলা হয়। এই কবরস্থানে বাবা-মা শুয়ে আছেন, এটাই যথেষ্ট।

“এর ওপর আরেকটা নতুন কবর হলেও সেটাকে আধ্যাত্মিকভাবে মেনে নেওয়া যায়। এটা নিয়ে আমাদের মনোকষ্ট না নিয়ে বরং ভাবতে পারি যে এই কবরস্থানে বাবা শুয়ে আছেন, আমাদের দোয়াটা উনার কাছে পৌঁছাচ্ছে। আমার বাবা-মা, দাদা-দাদী, যে-ই থাকুক, উনার সঙ্গে পুরো কবরবাসীর জন্য দোয়া করছি, সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে।”

তিনি বলেন, “আসুন, ইসলামের যে বৃহৎ স্পিরিট, আমরা সেটা ধারণ করি এবং এই বাস্তবতাটা মেনে নিই। আমাদের দোয়া নিশ্চয় উনাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে, কবরস্থানে তারা আছেন, এটাই বিষয়।”

তবে কবর নিয়ে ‘আভিজাত্যের প্রদর্শনী’ বন্ধে সিটি করপোরেশনকে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন এই নগর পরিকল্পনাবিদ।

তিনি বলেন, “টাকাই যেন একমাত্র নিয়ম না হয়। নিয়ম যদি হয় যে কবরস্থানে কেউ কবর স্থায়ী করতে পারবে না, তবে তা সবার জন্যই প্রযোজ্য হোক।

“ঢাকায় কবর দিলে নিম্নবিত্ত ও উচ্চবিত্তের জন্য আলাদা কিছু হওয়ার দরকার নেই। বৈষম্য সেভাবেই কমানো যায়, যেন কারো জন্যই জায়গা স্থায়ী না করা হয়।”

সূত্র : বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়