ডেস্ক রিপোর্ট: ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা মো. আহসানুল কবির। ছয় বছর বয়সী একমাত্র সন্তানকে ভর্তি করিয়েছেন নিকটবর্তী একটি মাদরাসায়। বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের এ চাকরিজীবী বলেন, কাছাকাছি কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। আশপাশে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগই কিন্ডারগার্টেন বা মাদরাসা। এছাড়া একটি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ও আছে। তবে সেখানে খরচ অনেক বেশি। কিন্ডারগার্টেনে পড়াতে মাসে প্রায় ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা খরচ হয়। সে তুলনায় মাদরাসায় ব্যয় কম। দূরত্ব ও খরচের বিষয়টি বিবেচনা করেই সন্তানকে মাদরাসায় ভর্তি করিয়েছি। -- বণিকবার্তা
মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ওই এলাকায় শতাধিক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে মাত্র একটি। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বড় অংশই আবার মাদরাসা। এর মধ্যে রয়েছে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন জামিআ রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদরাসা, মোহাম্মদপুর হাউজিংয়ে কাদেরিয়া তৈয়বিয়া আলিয়া মাদরাসা, চাঁদ উদ্যানের জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলূম হাফিজিয়া মাদরাসা ও এতিমখানা, ফয়জুল উলূম মহিলা মাদরাসা, ঢাকা উদ্যানের দারুল হিকমাহ্ নূরানী মাদরাসা, সৌতূলহেরা মাদরাসাহ, আল-কারীম দারুল উলূম মাদরাসা কমপ্লেক্স, তাহফিজুল কোরআন কারিমিয়া মাদরাসা। সরজমিনে দেখা গেছে, মাদরাসাগুলোর বেশির ভাগই আবাসিক ভবনে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মোহাম্মদপুরের মতো একই চিত্র দেখা গেছে ঢাকার যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, মিরপুর-১১ এলাকায়।
শেওড়াপাড়া এলাকায় একটি আবাসিক ভবন ভাড়া নিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে মোহাম্মাদিয়া জামে মসজিদ নেসার মাদরাসা। এ প্রতিষ্ঠান থেকে এক কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে রয়েছে আরো দুটি মাদরাসা।শেওড়াপাড়া-কাজীপাড়া এলাকায়ও অর্ধশতাধিক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার বড় অংশ মাদরাসা। এ এলাকায় নিকটবর্তী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মনিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
শেওড়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা পেশায় সবজি বিক্রেতা সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘কিন্ডারগার্টেনে পড়ানোর সামর্থ্য নেই, সরকারি বিদ্যালয়ও বেশ দূরে। মাদরাসায় কম খরচে ধর্মীয় শিক্ষা, সাধারণ শিক্ষা দুটোই মিলছে। এ কারণেই দুই সন্তানকেই কাছাকাছি মাদরাসায় পড়াচ্ছি।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকায় বিপুল জনসংখ্যার বিপরীতে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অপ্রতুল। পাশাপাশি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির ঘাটতি রয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করেই বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. আলী জিন্নাহ বলেন, ‘ঢাকাসহ সারা দেশেই মাদরাসার সংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি আমরা শিক্ষাসংশ্লিষ্টরাও লক্ষ্য করেছি। ঢাকার ক্ষেত্রে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্বল্পতা, বেসরকারি বিদ্যালয়ের উচ্চ ব্যয় ও ধর্মীয় শিক্ষা নিশ্চিত করা—সব মিলিয়েই এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। এছাড়া প্রাথমিক স্তরে মাদরাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা তুলনামূলক সহজ এবং বিত্তবানদের অনেকেই এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে অনুদানে আগ্রহী হওয়ায় তারা খুব অল্প ব্যয়েও শিক্ষাদান করতে পারে। বর্তমানে মাদরাসা শিক্ষায় নিম্নবিত্তদের সামর্থ্যের মধ্যে যেমন প্রতিষ্ঠান আছে আবার বিত্তবানদের জন্যও তাদের চাহিদা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান আছে।
স্বল্পব্যয়ে সন্তানকে শিক্ষাদানে ঢাকার ভাসমান বা শ্রমজীবী দরিদ্র যেসব পরিবার আছে তারা যেমন মাদরাসা বেছে নিচ্ছেন, তেমনি উচ্চবিত্তরা বেছে নিচ্ছেন ব্যয়বহুল ইংরেজি মাধ্যম বা কিন্ডারগার্টেন মাদরাসা। বিশেষত বিগত কয়েক বছরে দেশে কারিকুলামে বারবার পরিবর্তনও অভিভাবকদের একাংশকে সাধারণ শিক্ষা থেকে বিমুখ করে তুলেছেন। বর্তমানে অভিভাবকদের অনেকেই এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চাচ্ছেন, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষা এবং আধুনিক শিক্ষা দুটোই মিলবে। মাদরাসাগুলো অভিভাবকদের এ চাহিদার কথা বিবেচনা করে তাদের পাঠ্যক্রম সাজাচ্ছে।’ তার মতে, মাদরাসা, কিন্ডারগার্টেন ও অন্যান্য বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও অনেক প্রতিষ্ঠানেই পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে না।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা জেলায় মোট প্রাথমিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৩ লাখ ২৫ হাজার ২৭১, যা দেশের সব জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ। এসব শিক্ষার্থীর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে মাত্র ২ লাখ ২৬ হাজার ৯৭৫ জন। বাকি ১০ লাখ ৯৮ হাজার ২৯৬ শিক্ষার্থীকে নির্ভর করতে হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর। অর্থাৎ ঢাকায় প্রাথমিক স্তরের ৮২ দশমিক ৮৭ শতাংশ শিক্ষার্থীই পড়ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে।
শিক্ষার্থী সংখ্যায় শীর্ষে থাকলেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যায় তুলনামূলক পিছিয়ে ঢাকা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা জেলায় মোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫ হাজার ২৫০টি। এর মধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৪ হাজার ২৯৯, অর্থাৎ মোট প্রতিষ্ঠানের ৮১ দশমিক ৮৯ শতাংশই বেসরকারি। বিপরীতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা মাত্র ৯৫১টি।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে গঠিত পরামর্শক কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ। তিনি বলেন, ‘অবৈতনিক সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু এ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনে যে ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন তাতে ঘাটতি রয়েছে। ঢাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা কম এটি যেমন একটি সমস্যা, তেমনি বিদ্যমান অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধারও ঘাটতি রয়েছে। ফলে অনেক অভিভাবক সন্তানদের সেখানে পড়াতে আগ্রহী হন না। কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়াই কিন্ডারগার্টেন-মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ রয়েছে। ঢাকায়ও সেটিই ঘটছে।
কিন্ডারগার্টেনগুলো তুলনামূলক ব্যয়বহুল। অন্যদিকে মাদরাসাগুলোর মধ্যে নিম্নব্যয় থেকে উচ্চব্যয় সব ধরনের প্রতিষ্ঠানই রয়েছে। তবে এমন অনেক প্রতিষ্ঠানের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সরকারের উচিত সর্বজনীন ও মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতে এলাকাভিত্তিক জনসংখ্যা ও পরিস্থিতি বিবেচনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও বাজেট বৃদ্ধি করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া।’
ঢাকার বিদ্যমান বিদ্যালয়গুলোর সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিতে সরকারের প্রকল্প চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক মিরাজুল ইসলাম উকিল। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকাসহ সারা দেশেই প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে সরকার আন্তরিক।
বর্তমানে ঢাকার অভিভাবকদের মধ্যে সন্তানকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়ানোর প্রবণতা বেশি। অভিভাবকরা যাতে সরকারি বিদ্যালয়মুখী হয় সেটি আমরাও চাই, এ কারণেই বিদ্যালয়গুলোর সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। যদি এমনটি হয় যে কোনো এলাকায় সরকারি বিদ্যালয়ের সংখ্যার অপ্রতুলতা দেখা যাচ্ছে, তবে সে বিষয়েও সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে।