শিরোনাম

প্রকাশিত : ১৪ ডিসেম্বর, ২০২১, ০৩:২০ রাত
আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর, ২০২১, ০৩:২০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন: বুদ্ধিজীবীদের আলোয় আলোকিত ছিলো বাঙালি

অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন: পাকিস্তানিরা অনেক চতুর ছিলো। যদিও সাধারণ বুদ্ধিমত্তায় তাদের অনেক ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে। তবুও তারা বুঝেছিলো, বাঙালিদের নিঃশেষ করতে হলে তাদের বুদ্ধিজীবীদের নিঃশেষ করতে হবে। এই কাজটি পাকিস্তানিরা ২৫ মার্চ ১৯৭১ সাল থেকেই শুরু করেছিলো। যখন পরাজয় আসন্ন তখনই চূড়ান্তভাবে আমাদের বুদ্ধিজীবীদের হত্যার কাজটি করার চেষ্টা করছিলো। বুদ্ধিজীবী হত্যার কারণ ছিলো, তারা বুদ্ধিভিত্তিক চর্চার মধ্য দিয়ে বাঙালিকে আলো দিয়েছিলেন। সেই আলোয় আলোকিত হয়েই বাঙালি জাতীয়তাবোধ সম্পর্কে সচেতন হয়েছিলো। এই সচেতনতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। সেজন্যই বুদ্ধিজীবীদের তালিকা করে হত্যা করা হয়েছিলো। দুর্ভাগ্যÑ আমার সামনে থেকে প্রিয় শিক্ষক গিয়াস উদ্দিন আহমদকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলো রাজাকাররা, একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর মহসীন হল থেকে।

বাঙালিরা বাংলাদেশ চেয়েছিলাম। বাংলাদেশ পেয়ে কতোটুকু দায়িত্ব পালন করেছি সে নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। বাংলাদেশ এখন ৫০ বছরের, বিজয়ের পঞ্চাশ। এই বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবীদের সঠিকভাবে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। এই বুদ্ধিজীবীদের অনেকের সান্নিধ্যে অনেক ঘনিষ্ঠ সময় কেটেছে। তারা যে বাংলাদেশ চেয়েছিলেন, সেই বাংলাদেশ নয় এটা। এই বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় দায়িত্বটি ছিলো মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস সম্পূর্ণ রূপে নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া। যে উদ্যোগটি আমি বাংলা একাডেমিতে ১৯৯৭-২০০১ সালের মধ্যে নিয়েছিলাম। কিন্তু সরকারি অসহযোগিতায় উদ্যোগ নেওয়া প্রকল্প সম্পন্ন করতে পারিনি। আমার ধারণা ছিলো আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে হয়তো এই প্রকল্প তারা চালু করবে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে। চৌষট্টি জেলায় চৌষট্টি খণ্ডের বই বের হওয়ার কথা ছিলো। প্রত্যেক খণ্ডে পরিশেষে লেখা থাকতোÑ শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা। রাজাকারদের তালিকা। বীরাঙ্গনাদের তালিকা। একচল্লিশটি খণ্ড পেয়েছিলাম, সাতটি খণ্ড প্রেসে যাওয়ার উপযোগী করে এসেছিলাম। যদি এই প্রকল্প সম্পন্ন হতো, তাহলে নতুন করে মুক্তিযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবী বা রাজাকারদের তালিকা করা লাগতো না। যে কাজটি মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের করার কথা, তারা কিছুই করেনি।

আজও আমরা শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যা নির্ধারণ করতে পারলাম না। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বিভিন্ন রকম তথ্য আছে, সেগুলো গ্রহণযোগ্য হলেও চূড়ান্তভাবে নয়। আমাদের আশু কর্তব্য হচ্ছে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা তৈরি করা এবং প্রত্যেক বুদ্ধিজীবীর জীবন চরিত প্রকাশ করা। যাতে করে নতুন প্রজন্ম বুদ্ধিজীবীদের ত্যাগ এবং সেই ত্যাগের কারণ সম্পর্কে জানতে পারে। দেশের কোনো সরকারই তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন নয়।

গত ৫০ বছরে অনেক অর্জন আছে, কিন্তু আমাদের যে বিয়োজন আছে, সেগুলো ভুলে যাই কেন? বুদ্ধিজীবীদের তালিকা আজও করতে পারলাম না। তাদের যথাযথ সম্মান করতে পারলাম না। অথচ তাদের স্বপ্নের ফসল হচ্ছে এই বাংলাদেশ। আমরা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যখন উচ্চকণ্ঠ হই বাংলাদেশের দ্রষ্টা ও স্রষ্টা হিসেবে, তার সঙ্গীসাথী যে বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন, যাদের বঙ্গবন্ধু অনেক শ্রদ্ধা করতেন, তাদেরও আমাদের সম্মান ও শ্রদ্ধা দেখাতে হবেÑ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে, আনুষ্ঠানিকভাবে অথবা অন্য যেকোনোভাবেই হোক না কেন।

১৪ ডিসেম্বর কেবল বুদ্ধিজীবীদের দিবসের আলোচনা, অনুষ্ঠান বা আনুষ্ঠানিকতাই নয়, আমরা তাদের প্রতি কতোটুকু দায়িত্ব পালন করেছি সেটিই বিবেচ্য বিষয়। পরিচিতি : ইতিহাসবিদ

  • সর্বশেষ