প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. সেলিম জাহান: দেশের নামটি ‘বাংলাদেশ’

ড. সেলিম জাহান: আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলেছে ন’মাস ধরেÑ স্বাধিকারের জন্য, স্বাধীনতার জন্য, সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রের জন্য। সে যুদ্ধ সহায়তা পেয়েছে, সাহায্য পেয়েছে নানাজনের কাছ থেকে, কিন্তু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষায় বিশ্বের অন্য রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পেতে আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৯৭১ এর ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এখনো মনে আছে, সময়টা সম্ভবত ছিলো সকাল ১০টা বা সোয়া দশটা। বাবা তাঁর লেখার টেবিলে বসে কাজ করছিলেন। পাশে খুব হাল্কা করে রেডিও চলছিলো। মা পেছনের বারান্দায় বসে কুটনো কুটছেন। আমি সামনের বারান্দায় বসে কী একটা বই পড়ছিলাম। অন্য বোন-ভাইয়েরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে। হঠাৎ বাবার ঘর থেকে এক চিৎকার। আমরা যে যেখানে ছিলাম দৌড়ে তাঁর কাছে চলে গেলাম। ভাবলাম, তাঁর নিশ্চয়ই খারাপ কিছু একটা হয়েছে। কাছে যেতেই দেখি, ভদ্রলোক আনন্দ-উত্তেজনায় টইটুম্বর। মুখে শুধু এক কথা- ভুটান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ভুটানের রাজা জিগম্ েদরজি ওয়াংচুকের কাছ থেকে এ স্বীকৃতি বার্তা এসেছে। এই মাত্র তিনি শুনেছেন আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের খবরে। আমরা আহ্লাদে আটখানা। মা রেগে আগুন- না, ভুটানের ওপরে নয়, বাবার ওপরে। ‘এতো জোরে কেউ চেঁচায়? আমি তো ভাবলাম, শরীর খুব খারাপ হয়ে গেলো কিনা’? আমরা সংবাদটির গুরুত্ব বুঝিয়ে তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করি, কিন্তু বাবার ওপরে তাঁর রাগ আর পড়ে না।

‘এই প্রথম বিশ্বে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেলো’, বলতে বলতে বাবার গলা ধরে এলো। চোখের কোণে তাঁর জল। সারাঘরে কেমন এক নীরব প্রশান্তি নেমে এলো। মা আর কিছু না বলে তাঁর কাজের দিকে পা বাড়ালেন। বোন-ভাইয়েরা চলে গেলো নিজ নিজ জায়গায়। আমি শুধু দাঁড়িয়ে থাকলাম বাবার টেবিলের পাশে। ‘ভুটান যখন স্বীকৃতি দিয়েছে, তখন ভারতের স্বীকৃতিও এসে গেলো বলে’- প্রজ্ঞাবান মানুষটি যেন দৈববাণী করলেন। ‘বড় দেশ স্বীকৃতি দেওয়ার আগে তারা ছোট দেশকে দিয়ে স্বীকৃতি দেওয়ায়’- বাবার মাঝের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কথা কয়ে ওঠে। আমি কোনো কিছু না বলে রেডিওটি তুলে আমার ঘরে চলে গেলাম। বোধহয় ঘণ্টাখানেক পরই বাবার ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেলো। ভারতের স্বীকৃতি এলো সম্ভবত ১১.৩০ এর দিকে- একেবারে ঠিক মনে নেই। ভারতীয় লোকসভায় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেন।

ভারতের স্বীকৃতি আসা মাত্র যেন বাঁধ ভেঙে গেলো। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তখনো বরিশালে আছে। কিন্তু সে সবকিছু বিস্মৃত হয়ে সারা পাড়া যেন ফেটে পড়লো। নানান বাড়ী থেকে আনন্দ ধ্বনি, ঘটি-বাটির আওয়াজ, ‘জয়বাংলা’ চিৎকার সারা পাড়াকে নাড়িয়ে দিলো। ঘরবাড়ি থেকে বেরিয়ে লোকজন রাস্তায় নেমে এলো। মানুষ পরস্পরকে আলিঙ্গন করছে, চোখ সবার অশ্রুসজল, একে অন্যকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছে। মনে হলো সব শৃঙ্খল ভেঙে আমরা সবাই একটি খাঁচা থেকে বেরিয়ে এসেছি- অবরোধের খাঁচা, আতঙ্কের খাঁচা, অনিশ্চয়তার খাঁচা। কতোক্ষণ বাদে পাশের বাড়ির লতু’দি হুড়মুড় করে আমাদের বাড়িতে ঢুকলো। হাতে তার ঝকঝকে এক কাঁসার থালা। তাতে গোল করে সাজানো এক সারি নারিকেলের সন্দেশ। সোজা সে চলে গেলো বাবার ঘরে। তার চেঁচামেচি আর ডাকাডাকিতে আমরা সবাই জড়ো হলাম সেখানে। লতু’দি সজল চোখে সন্দেশ ভেঙে ভেঙে আমাদের সবাইকে খাওয়ালো। আমরাও তার মুখে সন্দেশের টুকরো পুরে দিলাম। আমাদের কারও চোখই শুকনো ছিলো না।

সব কিছুর শেষে লতুদি গলবস্ত্র হয়ে প্রণাম করলো মা’কে আর বাবাকে। মা লতু’দিকে জড়িয়ে ধরলেন পরম মমতায়। বাবা লতু’দির কপালে বড় নরম করে চুমু দিলেন। আমরা কাঁসার থালার সন্দেশ কাড়াকাড়ি করতে করতে হৈ হৈ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলাম। বেরিয়ে যেতে যেতে লক্ষ্য করলাম, মা বড় মায়াময়ভাবে বাবাক জড়িয়ে ধরেছেন। সে কি বাবাকে আগে বকার জন্য নাকি অন্য কোনো কারণে, কে জানে? কিন্তু এটা জানি যে, আমাদের জীবনে আমাদের মা-বাবাকে আর অমন অন্তরঙ্গভাবে আর কখনো দেখিনি। আজ বহুকাল পরে ভাবী, সেদিনের সে আলিঙ্গন, সেও তো এক স্বীকৃতি বটে- একটি ভালোবাসার সম্পর্কের স্বীকৃতি।

চিত্রকথা: ১৯৭১ সালে ৬ ডিসেম্বর ভারতীয় লোকসভায় প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী কর্তৃক বাংলাদেশকে সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার পরে দিল্লিতে বাংলাদেশ মিশনের প্রধান হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীকে মাল্যভূষিত করা হয়। লেখক : অর্থনীতিবিদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত