প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রেজা ঘটক: ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ দেখার পর প্রতিক্রিয়া

রেজা ঘটক : নির্মাতা আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ চলচ্চিত্রে যে এক্সপেরিমেন্ট করেছেন, এটি চলচ্চিত্রের চিত্রভাষে মোটেও নতুন কিছু নয়। বরং যে সকল বৈশিষ্ট্যের কারণে ছবিটি এতো আলোচিত, ঠিক সেই সকল স্থানেই ছবিটি খুবই দুর্বল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার চল্লিশ বছরপূর্তির সময় অর্থাৎ ২০১১ সাল বা এর কাছাকাছি সময়কে এটি ধারণ করেছে। রেহানা একটি সাইকো চরিত্র। মেডিকেল কলেজের একজন শিক্ষক হিসেবে রেহানা তার সহকর্মীর সঙ্গে বা ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে যে ভাষায় কথা বলেন, তা অনেকটা যেন আমাদের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির নি¤œশিক্ষিত কর্মচারীদের ভাষা। বাংলাদেশে মেডিকেল কলেজের কোনো শিক্ষক এভাবে কথা বলেন কিনা তা নিয়ে বরং বিদেশিদের কাছে এই ছবি ভুল বার্তা দেয়। একজন ছাত্রীর নকল ধরার জন্য রেহানা যে আচরণ করেন, তা যেন সাদের শিখিয়ে দেওয়া একটা কৌশল। কারণ আদতেই ওই ছাত্রী নকল করেছে কিনা তা প্রমাণের জন্য রেহানা কোনো উদ্যোগ নেন না। একজন শিক্ষকের রুমে একজন ছাত্রীর সঙ্গে কী ঘটেছে, তা নিজের চোখে না দেখেই নিজের মনগড়া একটা দর্শনের ওপর রেহানা লড়াই করেন। অথচ ওই ছাত্রীও ওই ঘটনার বিচার চায় না। নিজের ৬ বছর বয়সী শিশুর সঙ্গে রেহানা যে আচরণ করে তাও অমানবিক।

রেহানার চরিত্রে এরকম নেগেটিভ মোটিভ থাকার কোনো প্রেক্ষিত ছবিতে দেখানো হয় না। খেয়াল করুনÑ মেডিকেল কলেজের একজন শিক্ষক যিনি নামাজ পড়েন, ভাইকে বাজারের টাকা কড়ায়গÐায় হিসেব করে দেন, কলেজের সবকিছুতে প্রতিবাদী, তিনিই আবার নিজের শিশু সন্তানকে হিটলারের মতো স্বৈরশাসনে অভ্যস্ত। রেহানা পুরোপুরি একটা সাইকো চরিত্র। এই চরিত্র নারীবাদকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে, ভুল হাইপোথিথিস নিয়ে প্রতিবাদী হয়, শেষে নিজের কলেজের ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদের মুখে নিগৃহীত হয়।

ছবিতে সাদ এমনকি মেডিকেল কলেজ পুরোপুরি স্টাবলিস্ট করতে ব্যর্থ হয়েছেন। মনে হয়েছে এটা কোনো একটা বিল্ডিং যেখানে কিছু সাইনবোর্ড বা পোস্টার টানিয়ে মেডিকেল কলেজ দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ক্যামেরা সারাক্ষণ রেহানাকে অনুসরণ করে। অথচ রেহানার পরিবার বা তার অন্দরমহল ছবিতে দেখানো হয় না। আবার রেহানা তার স্বামীর দেওয়া আংটি সারাক্ষণ যতেœর সঙ্গে আঁকড়ে থাকে। এই ছবিতে কোনো আকাশ নেই, কোনো প্রকৃতি নেই, কেবল রুমের ভেতর রেহানাকে অনুসরণ করে। এই ছবিতে দিন বা রাত ঠাওর করা যায় না। সাদ যে ভঙ্গিতে ছবি বয়ান করেন সেখানে ক্যামেরা সবসময় রেহানার চরিত্রের মতো অস্থির। ক্যামেরার ওই অস্থিরতা দর্শকের চোখের জন্য একটা পীড়ন। অর্থাৎ সাদ দর্শককে ইচ্ছা করেই পীড়ন দিতে চেয়েছেন। রেহানা হাসপাতালে যতোটুকু নীতিবান, নিজের সংসার ও সন্তানের জন্য ঠিক তার উল্টো, যেন ততোটাই স্বৈরশাসক। ছাত্রী কড়া পারফিউম ব্যবহার করেছে, যা তার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়, সেটাও রেহানার দৃষ্টিতে খারাপ। পুরো ছবিতে রেহানার কোনো হাসি মুখ নেই। অর্থাৎ সাদের শিখিয়ে দেওয়া নাকফুলানো রাগিরাগি একটা ভাব রেহানা সারাক্ষণ ধরে রাখে। যা মোটেও স্বাভাবিক দৃশ্য নয়।

সাদ ছবিতে ক্লোজ আর মিডশট ব্যবহার করেছেন। কোনো মাস্টার শট নেই। অন্য কোনো শটতো একদমই নেই। মানে ছবিতে সাদ ইচ্ছা করেই অনেক কিছু এড়াতে চেয়েছেন। রেহানার আশপাশের পরিবেশ, প্রতিবেশ, সমাজ-সংসার দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় দর্শক। দর্শক কেবল রেহানার মানসিক দুর্দশা দেখতে পায়। ব্যাকগ্রাউন্ডে সাদ মিউজিক ব্যবহার না করে কিছু সাউন্ড ব্যবহার করেছেন। সেসকল সাউন্ডের বক্তব্য খুব একটা স্পষ্ট নয় বরং মনোটোনাস একঘেয়েমি ও বিরক্তি তৈরি করে। রেহানা চরিত্রে আজমেরী হক বাঁধন সাদের শিখিয়ে দেওয়া ফরমেটে দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। আমার কাছে অবশ্য ভালো লেগেছে ছোট্ট শিশু ইমু চরিত্রে আফিয়া জাহিন জাইমার অভিনয়। বরং ইমু চরিত্রটি এই ছবিতে একমাত্র সাবলীল। অধ্যাপক আরেফিন চরিত্রটিকে সাদ রেহানার কলিগের পরিবর্তে পুরানা প্রেমিকের ছাপ দিয়েছেন। বাস্তবে একজন প্রফেসর তার কলিগের সঙ্গে এভাবে কথা বলেন না। অধ্যক্ষ চরিত্রটিকে মনে হয়েছে রেহানার মায়ের চরিত্র। তাকে আবার শাঁখা-সিঁদুর পরানো হয়েছে। আর মিমকে আদিবাসী বানানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

সাদ রেহানা চরিত্রের মধ্যে এতো বেশি মনোযোগী ছিলেন যে অন্য চরিত্রগুলো খুব একটা স্টাবিলিস্ট হয়নি। অ্যানিকে কখনো কখনো মনে হয়েছে রেহানার ছোট বোন, ছাত্রীর রুমে রেহানা যায় কিন্তু নিজের বাড়িতে যায় না, কেমন অদ্ভুত ব্যাপার। আদতে সাদ একটি সাইকো চরিত্র ডিল করতে চেয়েছেন, যেখানে রেহানা ছাড়া অন্য চরিত্রগুলো পুরোপুরি ডিল করতে সাদ ব্যর্থ হয়েছেন। ঘটনা, স্থান, কাল তিনটি বিষয়ই ছবিতে অস্পষ্ট। আর এই অস্পষ্টতার কারণেই অনেকে এটাকে নন্দনতত্তে¡র ছাপ দিচ্ছেন। আদতে সাদের বয়ানকৃত মন্তাজগুলো প্রায় প্রত্যেক ক্ষেত্রেই মিজোঁসেন বারবার ব্যর্থ হয়েছে। দর্শকদের মধ্যে অনেকেই ছবিটি কান ঘুরে আসায় বিশেষ মর্যাদা দিচ্ছেন। সমালোচনা করলে কী জানি কী হয় এমন একটা দ্বিচারিতায় দর্শক। কিন্তু বিদেশিরা যে কারণে যে ছবিটি পছন্দ করেছে, সেখানে লবিস্ট নিয়োগ একটা বড় ফ্যাক্টর। সাদ ভালো লবিস্ট নিয়োগ করে ভালো ফলাফল পেয়েছেন। কিন্তু ছবিটি দেখার সময় একজন সাধারণ দর্শকের জন্য যে বিরক্তি উদ্রেক করতে পারে, তা হয়তো সাদ জেনেশুনেই এই ভঙ্গিটি বেছে নিয়েছেন। খেয়াল করুন- ব্যাকগ্রাউন্ডে একবার ইসলামী গজল বা কোরআন তেলোয়াত শোনা যায়। মেডিকেল কলেজের ভেতরে যা একটি উদ্দেশ্যপূর্ণ ব্যবহার।

ছবিটি যেসব কারণে এতো আলোচনা হচ্ছে, তা আদতে কালের হাওয়ার ধরন। এক চামচ মৌলবাদ, এক চামচ নারীবাদ, এক চামচ নির্যাতন আর এক চামচ ইমোশোন ভালো করে ঝাঁকিয়ে মিশিয়ে দিলেই হয়ে যায় আধুনিক বাংলা সিনেমা। বাহ! আর তা নিয়ে সবাই উঠেপড়ে লেগে যায়। সাদের এই আলোচিত ছবিটি ব্যক্তিগতভাবে আমার ভালো লাগেনি। আমার প্রত্যাশাপূরণে সাদ ব্যর্থ হয়েছেন। বরং সাদের প্রথম ছবি ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’ আমার কাছে এটার চেয়ে বেশি ভালো লেগেছে। তবে একটি ছবি সকলের ভালো নাও লাগতে পারে। বাংলা সিনেমার যখন মরার কাল চলছে তখন সাদ যে নতুন এক্সপেরিমেন্ট করলেন সেজন্য সাধুবাদ জানাই। বরং এই নতুনত্বের মধ্যেই আমরা বাংলা সিনেমার নতুন ভবিষ্যৎ দেখার অপেক্ষা করছি। নতুন নতুন বাহাস করার প্রেরণা পাচ্ছি। সাদ ও ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ টিমের জন্য শুভ কামনা। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত