প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ফাহমিদুল হক: হাসান স্যারকে নিয়ে দু’ছত্র

ফাহমিদুল হক: কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের সঙ্গে শেষ দেখা হয় ২০১৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশ লেখক ঐক্যের কাঁটাবনের অফিস ‘লেখক আড্ডা’র উদ্বোধক হিসেবে অনেক ভেবেচিন্তে তাকেই নির্বাচন করি আমরা। আমি তখন সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্বে। আগের দিন এয়ারপোর্ট থেকে তাকে রিসিভ করে, নিজে ড্রাইভ করে, যে বাসায় তিনি থাকবেন, মোহাম্মদপুরের সেই বাসায় পৌঁছে দিই তাকে। অনুষ্ঠানের আগে সেখান থেকে তাকে লেখক আড্ডায় আনতে গিয়ে অনেক দেরি করে ফেলি। সেদিন ঢাকায় ছিলো বীভৎস যানজট। এর আগে রাজশাহীতে গেলে হঠাৎ দেখা হয়েছে। তবে বেশি সাক্ষাৎ হতো ১৯৯৯-২০০২ সময়কালে, যখন আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতাম। তিনি তাই আমাদের কাছে ‘দহাসান স্যার’। তখন হাসান, শহিদুল, সনৎ, মতিন এ রকম এক সিনিয়র প্রজন্মের সঙ্গে নিউটন, কাবেরী, মারুফদের তরুণ প্রজন্মের খুব ওঠাবসা।

আমি-মামুন যোগ দিলাম সেই গ্যাংয়ের সঙ্গে, যারা ভিসি-প্রভোস্ট নন, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে প্রভাবক। তখন হাসান স্যারদের বাম আর লীগ মিলে একত্রে এক ‘প্রগতিশীল’ বলয় (লাল-নীল নয়, গ্রুপের নাম ছিলো ‘রবীন্দ্র গ্রুপ’), রাবিতে বিশেষত জামায়াতের (তার পিছে বিএনপি) আধিপত্য, সবে প্রায় স্থায়ীভাবে সরিয়ে ফেলেছে। সেই যে হাসান স্যারদের প্রজন্মের সঙ্গে লীগের লুজ ফেডারেশন গঠিত হলো সর্বত্র, ওই প্রজন্মের প্রায় সবাই আর সেই ফেডারেশন থেকে সরে আসেননি। তার ফল বিশেষ সুবিধার হয়নি। জাতি সেই ফলভোগ করছে এবং আরও বহুদিন করবে। আমরা ক্রমশ লীগের প্রগতিশীলতা বা গণতান্ত্রিকতার ভাণ বুঝে সরে এসেছি, আর তারা তার ফেডারেশনের লুজ মালা গলায় পরে কেদারায় বসে থেকেছেন। সেদিন এয়ারপোর্ট থেকে শহরের ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে জিজ্ঞেস করেছি, আপনারা যে একটা প্রগতিশীল রাজনীতি করে আসলেন, আপাত সেন্টার লেফট দল আওয়ামী লীগ যে এ রকম সেন্টার রাইট হয়ে গেলো, কেমন অগণতান্ত্রিক একটা দল হয়ে গেলো, শেষ জীবনে দেশ নিয়ে হতাশ লাগে না? তিনি এমন একটা উত্তর দিলেন, তাতে আমি খুব হতাশ হলাম। উত্তরটা এতো ক্লিশে ছিলো। ঠিক ধরেছেন, উত্তরটা ছিলো ‘বিকল্প কই’? সেটা ছিলো ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর। আপনাদের মনে পড়বে, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নৈশ নির্বাচনের পর হাসান স্যার তাকে জাস্টিফাই করেছিলেন।

স্যারের সঙ্গে কিছু সময় কাটানোয় এবং উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেখলাম, কানে একটু কম শোনেন, কথাবার্তা অতটা গুছিয়ে বলতে পারছেন না। বয়স হলে তো সেটা হতে পারে। সব মিলিয়ে শেষ অভিজ্ঞতাটা খুব ভালো নয়। কারণ হাসান স্যারকে কাছে থেকে যেমন দেখেছি, ওই দুই হাজার সালের দিকে, সেটা হলো এক জ্যোতির্ময়কে ঘনিষ্ঠভাবে দেখা। তারও আগে, পরিচিত হওয়ার বহু পূর্বে, হাসান আজিজুল হকের গল্প ছিলো আমার পাঠ্য। তাকে আমি পেয়েছিলাম ‘লেখকদের লেখক’ হিসেবে। আমি ১৯৯২-৯৩ থেকে প্রায় দুই দশক গল্প নিয়ে মেতেছিলাম। তখন তাকে ওইভাবে পড়েছি। আর রাবিতে শিক্ষকতার সুযোগে দেখেছি আড্ডারু এক হাসান স্যার। ভীষণ উইটি, খুব ভালো বক্তা, দারুণ প্রাণশক্তি। তার গল্পে ছড়িয়ে আছে গভীর জীবনবোধ, রাজনৈতিক চেতনা। দেশভাগের কারণে যে বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি গিয়েছেন, তাতে তার সাহিত্যের শক্তি আরও বেড়েছে। একবার রাবিতে জিজ্ঞেস করেছিলাম, যারা দেশভাগের শিকার তাদের ওপরে ঘটনাটির প্রভাব কতোদূর পড়েছে? টিচার্স ক্লাবে বসে, সেই আলাপে তিনি উত্তরে বলেছিলেন, সবাই একেকজন বিকারগ্রস্ত মানুষ। যে চিত্রকল্প মাথায় আঁকা, তার তুলনায় ২০১৮ সালের হাসান ছিলেন ম্রিয়মাণ, ডিফোকাসড। তবে সাহিত্যকর্ম হিসেবে তিনি যা উপহার দিয়ে গেছেন, তা তাঁকে অমর করে রাখবে। তাঁর গল্প থেকে চলচ্চিত্র হয়েছে, হচ্ছে, হতেই থাকবে। তার মৃত্যুতে মনটা খারাপই হয়েছে। Fahmidul Haq-র ফেসবুক ওয়ালে লেখাটি পড়ুন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত