প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী: নূর হোসেন, বুলেটপ্রিয় স্বৈরাচার ও আমাদের গণতন্ত্র

দীপক চৌধুরী: শহীদ নূর হোসেন দিবস আজ। এ উপলক্ষে অর্থাৎ এ দিন এলে অনেক কথা মনে পড়ে যা প্রাসঙ্গিক। কারণ, তখন আমিও টসবগে যুবক। জীবনের সামনে নতুন নতুন উজ্জ্বল স্বপ্ন দোল খাচ্ছিল। সেই স্বপ্ন ঘিরে তৈরি হওয়া উচ্ছাস ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। তখন স্বৈরাচার হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় ছিলেন। কুখ্যাত স্বৈরাচারকে বিদায় করাই ছিল আমাদের একমাত্র পণ। আমার একাধারে সাংবাদিকতা করা ও স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল । সেই অংশীদার হিসেবে গর্ববোধ করি। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর যুবলীগ নেতা নূর হোসেনের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল ঢাকার রাজপথ। নূর হোসেনের এই আত্মত্যাগ তৎকালীন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রকামী মানুষের আন্দোলনকে ভীষণভাবে বেগবান করেছিল।

সেই ১০ নভেম্বর সচিবালয়ের সামনে ১৫ দল, ৭ দল ও ৫ দলের অবস্থান ধর্মঘট কর্মসূচি ছিল। সেই কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছাত্র সংগঠনগুলোর সমর্থনে অবস্থান ধর্মঘট ঘেরাও কর্মসূচিতে রূপ লাভ করে। স্বৈরশাসকের সকল বাধাকে উপেক্ষা করে ১০ নভেম্বর সকাল থেকেই সচিবালয়ের চারদিকে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার মিছিল সমবেত হয়। তখন তোপখানা রোডের মুখে পুলিশ বক্স পেরিয়ে শুরু হয় নূর হোসেনদের সাহসী মিছিল, সাহসী যুবক উদোম নূর হোসেন গায়ে লিখেছিল ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক- স্বৈরাচার নিপাত যাক’। আসলে ইতিহাস আমরা দ্রুত ভুলে যাই বা বদলে ফেলতে চাই। জাতীয় পার্টির নেতা এরশাদের ভাই জিএম কাদেরের একটি কথা আমাকে সাংঘাতিক পীড়িত করেছে। হাস্যকর ও মিথ্যোক্তি।

‘ইউপি নির্বাচন এখন এক আতঙ্ক’ বলে মন্তব্য করেছেন জি এম কাদের। তিনি বর্তমানে জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান ও সংসদে বিরোধীদলীয় উপনেতা। আমাদের পবিত্র সংসদে তাকে দেখতে পাই। অবশ্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনিও এই সংসদে বসে দেশবাসীকে ‘জ্ঞান’ দিয়েছে। যা বলছিলাম, জিএম কাদেরের ভাষায়, ‘চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচন নিয়ে পাল্টাপাল্টি হামলা আর গোলাগুলি নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

জি এম কাদের কী ভুলে গেছেন কী রকম ভয়ংকর অবস্থা ছিল দেশে- যেখানে ধানক্ষেতে প্রতিপক্ষ প্রার্থীর লাশ পাওয়া যেতো? নদীর জল লাল হয়ে যেতো রক্তে। কী না হতো এরশাদের ইউপি নির্বাচনকালে? সম্ভবত ইচ্ছে থাকার পরও তিনি শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে চাইছেন। আরে তখন তো স্থানীয় ও জাতীয় সরকারের নির্বাচন হতো এরশাদের ইচ্ছায়। মনে পড়ছে হাজার কাহিনীর মধ্যে একটি কাহিনী। সেটা ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দ। তারিখ ১৩ ফেব্রুয়ারী। এদিনও বিরোধী জোটগুলোর ডাকে পূর্বঘোষিত সকাল-সন্ধ্যা কর্মসূচি অতিবাহিত হচ্ছিল। কিছুদিন আগে (অর্থাৎ ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮) ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হয়েছে। এর মূল্যায়ন ও বাংলাদেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ে কথা বলতে গিয়েছি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরীর বাসায়। তিনি থাকতেন হেয়াররোডে। হেঁটে হেঁটে গেলাম হেয়ার রোডে। সময় ছিল পূর্ব নির্ধারিত। রাজনীতির নানাকথা, নানাকৌশল, এরশাদেও গণতন্ত্র নিয়ে আলোচনাকালে প্রবীণ এ রাজনীতিবিদ বলেছিলেন, ‘একটি কথা চিরন্তন যে, ক্যান্টনমেন্ট থেকে এসে লাঠি ঘোরানো যায়, গুলি চালান যায় কিন্তু রাজনীতিবিদ হওয়া যায় না। তবে এটা অব দ্য রেকর্ড বললাম, লিখবা না।’ সেই সময় ইউপি নির্বাচনে কয়েকহাজার আহত-নিহতের ঘটনা ঘটে। নির্বাচনি সন্ত্রাসে প্রাণহানি ঘটেছিল দু’শ লোকের। ( সূত্রগ্রন্থ : স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের লড়াই, বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা : দীপক চৌধুরী)। দীর্ঘ নয় বছরের এই স্বৈরশাসনের যুপকাষ্ঠে কতো বীর সন্তান শহীদ হয়েছে এর হিসেব পাওয়া মুশকিল। লাশ লুকিয়ে ফেলার, লাশ গুম করার বহু ঘটনা ঘটেছে এরশাদ আমলে। ষড়যন্ত্র করা-ই ছিল বুলেটপ্রিয় স্বৈরাচার সরকারের যেনো স্বাভাবিক আচরণ।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত