প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আরিফুজ্জামান তুহিন: ননসেন্স বামপন্থী দল ও পুঁজিবাদের গ্যাঁড়াকল

আরিফুজ্জামান তুহিন
[১] ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ছিলো ব্যারেল প্রতি ৯৫ ডলার, তখন দেশের বাজারে ডিজেলের দাম ছিলো লিটার ৬৮ টাকা। এর আগে ২০১১ সালে ৪ দফায় দাম বাড়ানো হয় ডিজেল ও কেরোসিনের দাম। এই চার দফায় তখন বাড়ানো হয়েছিলো ১৯ টাকা ১২ পয়সা। তখন ৪৬ টাকা লিটারপ্রতি ডিজেল থেকে বেড়ে ৬১ টাকা করা হয়েছিলো। আর ৬১ টাকা থেকে বেড়ে ২০১৩ সালে করা হয়েছিলো ৬৮ টাকা। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি কতো ছিলো? ২০১১ সালের মার্চ মাসে প্রতিব্যারেল তেলের দাম ছিলো ১৩১.০৪ ডলার। দেশের বাজারে তখন বেড়ে সর্বোচ্চ দাঁড়িয়েছিলো ৬১ টাকা লিটার। ২০১৩ সালে ৩ জানুয়ারি ডিজেল-কেরোসিন ৬৮ টাকা করা হয়, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ছিলো ৯৫ ডলার। ৬ নভেম্বর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ছিলো ৮১.২৭ ডলার। দেশের বাজারে ডিজেলের লিটারপ্রতি দাম ৮০ টাকা। প্রশ্ন হলো, বিপিসি এর আগে যদি লাখ লাখ কোটি টাকা লোকসান করতো তাহলেতো দেশ দেউলিয়া হয়ে যেতো। বিপিসিরতো অডিট হয় না। ফলে লাভ-লোকসানের হিসাব কেমনে করবে সে? গত সাড়ে ছয় বছরে বিপিসি লাভ করেছে ৪০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্য থেকে বিপিসি থেকে সরকার নিয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। বিপিসি ৩৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এখন প্রশ্ন যেসব উন্নয়ন প্রকল্প বিপিসি করছে, সেটাতো জনগণের টাকায়। এখন ওইসব প্রতিষ্ঠান যখন লাভ করবে তখন কি বিপিসি সেই লাভের টাকা দিয়ে তেলের দাম কমাবে? নাকি সরকারকে ফের লাভ থেকে টাকা দেবে? তাহলে প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি মুনাফাখোর ব্যবসায়ী? আর জনগণের পকেট কি নবাবের দানছত্র?

[২] সরকার বলছে দেশে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। অর্থাৎ আগে যেখানে ১০০ টাকা দিয়ে যে পণ্য কিনতেন এখন সেই পণ্য ১০৫ টাকা ৫৯ পয়সা দিয়ে কিনছেন। অথচ বাজার পর্যবেক্ষণ করে পাচ্ছি ভিন্ন তথ্য। বাজার বলছে, গত বছরের মার্চ থেকে চলতি নভেম্বর মাসে কোনো কোনো পণ্যের দাম ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ বেড়েছে। গড়ে এই হার কোনোভাবেই ৩৫ শতাংশের নিচে নয়। এর অর্থ হলো, আপনি আগে যে সংসার চালাতেন ৪০ হাজার টাকায়, সেই সংসার চালাতে আপনা খরচ হবে ৫২ হাজার টাকায়। সরকার বলছে না, এই খরচ আপনার বাড়বে তবে তা হবে ২২০০ টাকার মতো। এই যে আমার পোস্ট আপনারা যারা পড়ছেন তার বড় অংশ বাজারে যান না, আয় ইনকাম করেন না। বাবা-মায়ের অতি কষ্টের টাকায় জীবনযাপন করেন। আপনার সমস্যা ব্যান্ডউইথের দাম বাড়লে। আপনি কী জানেন, গত এক বছরে গায়ে মাখার সুগন্ধি সাবানের দাম প্রতি পিস ৩৫ টাকা ৪০ টাকা হয়েছে। কাপড় কাচার সাবানের দাম ২০ থেকে ২২ টাকা হয়েছে, টিস্যুর দাম ১৭ থেকে ২০ টাকা, টুথপস্টে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা, নারিকেল তেল ২৭০ থেকে ৩০৫ টাকা, এলপিজি ৮৯১ টাকা থেকে ১৩১৩ টাকা হয়েছে। সয়াবিন তেলের লিটার ৮৭ টাকা থেকে ১৫০ টাকা হয়েছে এটা জানেন? আটা ২৩ টাকা কেজি থেকে ৩৩ টাকা ৫০ পয়সা। বয়লার মুরগি ১১৫ টাকা কেজি থেকে ২০০ টাকা।

যেসব পণ্যের দাম উল্লেখ করলাম তার একটিও বড়লোকি খাবার নয়। সাধারণ মানুষের খাদ্যপণ্য। এখন এসব পণ্যের গড় করুন, মাসের বাজার খরচ কতো বেড়েছে মা ও বাবার কাছে জানতে চান তারপর সরকারের বলা মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ নাকি ৩৫ শতাংশের বেশি সেটা আপনিই হিসাব করতে পারবেন।

[৩] গত এক বছরে দেশের ব্যাংকগুলোতে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৪ হাজার ২৭২টি। দেশে যখন কোটিপতি বাড়ছে প্রায় ১ লাখ ঠিক তখন পিপিআরসি বলছে করোনার কারণে দেশে নতুন দরিদ্র হয়েছে ৩ কোটি ২৪ লাখ মানুষ। কী বুঝলেন? না বুঝলে ভেঙে বলি, করোনার সময় যখন আপনি আরও গরিব হয়েছেন তখন দেশে ১ লাখ মানুষ কোটপতি হয়েছে বা ১ লাখ ব্যাংক হিসাবে কোটি টাকার ওপরে জমা পড়েছে। তো যখন সবাই সর্বস্বান্ত হয় তখন ব্যবসায়ীর সেই সর্বস্বান্ত অবস্থায় ব্যবসা আগের পরিবেশের চেয়ে ভালো হয়। করোনার কারণে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হয়নি, আরও মুনাফা বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা সংকটে পড়ে মূলত পুঁজিবাদ সংকটে পড়লে, প্রাকৃতিক কারণে ক্ষতি হলে ব্যবসায়ীদের মুনাফা কমে না বরং বাড়ে। [৪] আপনি নি¤œমধ্যবিত্ত। আয়-ব্যয় সমান। কোনো সঞ্চয় নেই। ধরুন আপনি ৩০ হাজার টাকায় কোনোমতে টেনেটুনে সংসার চালাতেন। তার মধ্যে বাসাভাড়া ১২ হাজার টাকা দেন, বিদ্যুৎ খরচ ৪০০ টাকা, পাইপ লাইনের গ্যাস হলে ৯৬০ টাকা। তারপর ডিশ বিল ৩০০ টাকা। দুটি সন্তানের পড়ালেখা বাবদ কতো টাকা বরাদ্দ রাখবেন? তারপর কতো টাকা খাবারের জন্য? কতো টাকা পোশাক কেনা বাবদ? কোনো একটা অসুখে পড়লে ডাক্তার ও ওষুধ কেনার টাকা তখন কে দেবে? গ্রামে যদি বাবা-মা থাকে তাদের জন্য কিছুতো অন্তত বছরে একবার হলেও বরাদ্দ রাখেন। তো এসব টাকা কে দেবে? কোন নবাবের টাকশাল থেকে আসবে? এসব কথা কেন আমাদের দেশের পলিটিক্যাল পার্টিগুলো বলে না। বিএনপি বলবে না তারাও ব্যবসায়ীদের দল। কিন্তু গরিব মানুষের দল কমিউনিস্ট পার্টিগুলো এসব নিয়ে লড়াই না করে কেন আছে ৭২ সংবিধান নিয়ে? তারা কেন আফসোস করছে দেশের মানুষ আর আগের মতো প্রগতিশীল নেই? যদি দেশের মানুষের মধ্যে কমিউনিস্টরা মাঝিরিমানের শক্তি রাখতে পারতো তাহলে দেশের মানুষ কি কমিউনাল দিকে যেতো? যেতো না। তাহলে মূল কাজ বাদ দিয়ে বিদ্যমান ফাতরা কমিউনিস্টরা কেন ৭২ সংবিধানের দিকে দৌড়ায়? এর মূল বিষয় হলো, তারা জনগণকে পোছে না, তাদের পার্টিটাও ধনিকশ্রেণির শুধু নামটাই গরিবের পার্টি। ৩০ হাজার টাকা আয়ের একটি পরিবারের যদি ৩৫ শতাংশ খরচ বাড়ে তার মানে তাকে মাসে ১০ হাজার ৫০০ টাকা বাড়তি আয় করতে হবে? এই বাড়তি আয় তাকে কে দেবে? তখন সে ব্যয় কমানোর দিকে নজর দেবে। নানান ধরনের পণ্য কেনা কমিয়ে দেবে। এতে বিপাকে পড়বে পণ্য উৎপাদক বা কারখানার মালিক। তারা লোকসান কমাতে প্রথমে উৎপাদন কমাবে, তারপর কর্মী ছাঁটাই করবে। এতে করে বেকারত্ব বাড়বে। বেকারক্ত বাড়লে বাজারে পণ্য কেনার লোক আরও কমে যাবে। তখন বহু কারখানা লোকসানের কারণে বন্ধ হয়ে যাবে। এই পরিস্থিতিটাই হলো পুঁজিবাদের অনিবার্য পরিণতি। এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে দেখবেন আমেরিকা বেল আউট নামে একটা প্যাকেজ ঘোষণা করে, টাকা পয়সা দিয়ে ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখে। বাংলাদেশে পুঁজিবাদ এখন সেই প্যারাডক্সের লুপে পড়তে যাচ্ছে। আর আমাদের দেশে বিদ্যমান বাম ও কমিউনিস্ট পার্টিগুলো ভ্যারেন্ডা বাজাচ্ছে। এ রকম দুর্বল চিন্তা ও পদ্ধতির বাম দুনিয়াতে আর দ্বিতীয়টাতে নেই। ইথুপিয়াতে কমিউনিস্টরা দেশটির রাজধানীর দিকে লাল ফৌজ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও করছে। আর তারা প্রেসক্লাবের সামনে চিক্কুর পাড়ছে ৭২ সংবিধান নিয়ে। ননসেন্স। Arifuzzaman Tuhin’র ফেসবুক ওয়ালে লেখাটি পড়ন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত