প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ষাটোর্ধ্ব মানুষকে টিকা দিতে তিন দিনের বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হোক

ডা. লেলিন চৌধুরী: কোনো জনপদে বা দেশে যখন সংক্রমণের হার ৫ শতাংশের নিচে একনাগাড়ে ৩ সপ্তাহ বা তারও বেশি থাকে, তখন তাকে নিয়ন্ত্রিত অবস্থা বলি। দেশে এখন করোনা সংক্রমণের হার ১.৫ শতাংশের আশেপাশে। আমরা যদি ঠিকমতো উদ্যোগ, সতর্ক ও সচেতন হই তাহলে এ হার আরও কমানো যায়। তবে মনে রাখতে হবেÑ টিকা ব্যতীত করোনা বিরুদ্ধে সত্যিকারের সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়। এজন্য অতি দ্রæত দেশের মানুষকে টিকার দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এখন পর্যন্ত দেশে ২৪ শতাংশের কিছু বেশি মানুষ করোনার এক ডোজ টিকা পেয়েছেন। দুই ডোজ টিকা পেয়েছেন ১২ শতাংশের বেশি কিছু মানুষ। টিকা প্রদানের সংখ্যাটা এখনো অপ্রতুল।
যেসব মানুষের মৃত্যুঝুঁকি বেশি, ষাট বছর বা তারও বেশি বয়সের মানুষকে সবচেয়ে বেশি টিকা দেওয়া দরকার। আমাদের জাতীয় টিকাদান গাইডলাইন এখানে বয়স্কদের টিকা দানে অগ্রাধিকার ব্যাপারটা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত ষাটোর্ধ্ব বয়সী নাগরিকেরা পর্যাপ্ত টিকা পাননি। সুরক্ষা অ্যাপে নিবন্ধন করে টিকা নেওয়ার একটি নেতিবাচক দিক হচ্ছে যারা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন না, যাদের অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইস নেই এবং নিবন্ধন করার জন্য অন্য কারও দ্বারস্থ হতে হয়, সেই মানুষ টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। অর্থাৎ সুরক্ষা অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন করে টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে যারা ডিজিটালি শিক্ষিত মানুষ, প্রযুক্তি ব্যবহার করতে সক্ষম, যাদের অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইস রয়েছে তারা অগ্রাধিকার পাচ্ছেন। এটি টিকার ক্ষেত্রে একটি বৈষম্য তৈরি করেছে। ফলে এই বৈষম্য দূর করা দরকার।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বিশে^র কোথাও কোথাও করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাচ্ছে। যুক্তরাজ্যে করোনা সংক্রমণ বাড়ছে। সেখানে নতুন করে লকডাউন করা যায় কিনা সে ব্যাপারে আলোচনা হচ্ছে। রাশিয়ায় সংক্রমণ বাড়ছে। জার্মান, ইউক্রেন, পোল্যান্ডেও সংক্রমণ ঊর্ধ্বগতিতে রয়েছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে সংক্রমণ হার যথেষ্ট কম, কিন্তু পূজার পর করোনার মৃদু ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করছি। এর অর্থ এই যে, এখনো করোনা পৃথিবীতে রয়ে গেছে। আমাদের দেশেও আছে। যেকোনো সময় থেকে যাওয়া করোনা থেকে আবার সংক্রমণ বেড়ে যেতে পারে। তৃতীয় ঢেউ আসতে পারে। ফলে আমরা এখন স্বস্তিতে আছি তা বড় করে না দেখে, আমাদের সতর্কতার দিকটা দেখতে হবে। একইসঙ্গে দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে করোনার টিকার আওতায় আনতে হবে।
টিকার সর্বোত্তম ব্যবহার হচ্ছে না। এ কারণে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে না পারা মানুষেরা টিকা পাচ্ছে না। আমার একটি প্রস্তাব, দুই থেকে তিন দিন বিশেষ একটি টিকা দান কর্মসূচি গ্রহণ করা হোক। যার লক্ষ্য থাকবেÑ প্রতিদিন ৩০ লাখ ষাটোর্ধ্ব মানুষকে টিকার আওতায় আনা। তিনদিনের বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে ৯০ লাখ ষাটোর্ধ্ব বয়সী মানুষকে টিকার আওতায় আনা। তাহলে যা হবেÑবয়সী মানুষদের মৃত্যুঝুঁকি কমবে।

শিশুদের আমরা বিশেষ ব্যবস্থায় টিকা দিতে যাচ্ছি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, টিকা দেওয়ার পরও একজন বয়স্ক মানুষ বা শিশু করোনার বাহক হতে পারে। ফলে বিদ্যালয় থেকে যে শিশুটি ঘরে ফিরবে সে কিন্তু ভাইরাস বহন করে বাড়িতে নিয়ে যেতে পারে। যদি তার বাড়িতে সিনিয়র সিটিজেন থাকেন, টিকা দেওয়া না হয়, সেখানে করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার আবারও বেড়ে যেতে পারে।

পৃথিবীতে এখনো করোনা আছে। সতর্কতার রশিতে ঢিলাঢালা দেওয়ার কোনো জায়গা নেই। একইসঙ্গে যতো দ্রæত সম্ভব করোনার টিকা মানুষকে দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত। এর আগে করোনার টিকা নিয়ে মানুষের মধ্যে দুটি আশাবাদ তৈরি হয়েছিলো। প্রথমটি হচ্ছে বঙ্গভ্যাক্স টিকার মাধ্যমে। এটি দেশের একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে যাচ্ছিলো। সেটির কী অবস্থা দেশের মানুষ জানে না। অথচ মানুষের জানার আগ্রহ আছে। এটি সম্পর্কে দেশের মানুষকে জানানো দরকার। অপরদিকে ইনসেপ্টা কোম্পানির সঙ্গে চীনের সিনো ফার্মার একটি চুক্তি হয়েছে। বাংলাদেশে টিকা উৎপাদন শুরু করা হবে। সেই টিকা উৎপাদন কতোদূর এগোলো, কী অবস্থাÑএটাও দেশের মানুষকে জানানো দরকার। আমরা আরম্ভের সঙ্গে আরম্ভ করি, কিন্তু সেটা কীভাবে শেষ করি, এ বিষয়টি মানুষকে আমরা বেশিরভাগ সময়ই জানাই না।

করোনার মহামারি সময়ে আমরা দেখেছি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নানা ধরনের দুর্নীতি সংগঠিত হয়েছে এবং হচ্ছে। দেশের মানুষ চায় দুর্নীতি বন্ধ হোক। ভবিষ্যতে দুর্নীতি না হোকÑএমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। একইসঙ্গে আমাদের স্বাস্থ্য বিভাগের সামর্থ্য বাড়ানো, যাতে তারা দেশে সতেরো কোটি মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে। কোভিডকালীন অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সামর্থ্য বাড়ানো ও অধিকতর কার্যকর করার জন্য স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ বিন্যাস দরকার। সে বিষয়টিও আমাদের মাথায় রেখে কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়া দরকার।

করোনা একটি সংক্রমণ রোগ। বৈশি^ক মহামারি। পৃথিবীতে যদি একটি করোনা রোগীও থেকে যায়, সেই রোগী থেকে বিশে^ করোনা ছড়িয়ে যেতে পারে। ফলে পৃথিবীকে একত্রে একযোগে কাজ করতে হবে। আমরা দেখতে পাচ্ছি উন্নত বিশে^ টিকা দেওয়ার হার বেশি, প্রচুর মানুষকে টিকা দেওয়া হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে দেখছি তারা এতো বেশি টিকা মজুদ করেছিলো যে ডেট শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে ফেলে দিতে হচ্ছে। অপরদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলো টিকা পাচ্ছে না। এ কারণে টিকা নিয়ে একটি বৈশি^ক ব্যবস্থাপনা দরকার বলে মনে করি।
পরিচিতি : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত