প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

হেলাল মহিউদ্দিন: ক্ষমতা-সম্পর্কের কোন কোণায় শিক্ষকের ঠাঁই?

হেলাল মহিউদ্দিন: ২০০৫-২০০৬ সালের দিকের কথা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান পড়াতে গিয়ে ছাত্রদের একটি উদাহরণ দিলাম. বললাম-দ্যাখেন তো একটি উদাহরণ হতে ক্ষমতা-সম্পর্কের কিছু বুঝতে পারা যায় কিনা? কী সেই উদাহরণ বলার আগে প্রসঙ্গ বলে নিই। আজ ফেসবুক খুলে মেসেঞ্জার (ইনবক্স) আইকনের ওপর অস্বাভাবিক রক্তিম সংখ্যা দেখে ভড়কে গিয়েছিলাম। ভয়ে ভয়ে ক্লিক না করলে জানতামও না আজ শিক্ষক দিবস। প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্রদের শুভেচ্ছা জড়ো হচ্ছে ইনবক্সে। সকলকে ধন্যবাদ। উদাহরণটির সারমর্ম ও কার্যকারিতা কিন্তু দেড় যুগ পরে এখনো সমান। ২০০৫-২০০৬ সালের সেই ক্লাসে আমার হাতের সদ্য কেনা ডায়েরি-নোটবইটি দেখিয়ে বলেছিলাম, ‘গতকাল ফুটপাত হতে কিনেছি। কিনে আত্মীয়ের বাসায় গেলাম। দেখলাম তার টেবিলে স্তূপিকৃত হয়ে আছে এক গাদা নতুন বছরের ডায়েরি। সুদৃশ্য মোড়কে ঢাকা। তিনি এতো এতো ডায়েরির যন্ত্রণায় বিরক্ত।

ক্ষমতাশালী মানুষ। তার কাছে ব্যবসায়ী, বণিকমহলের স্টেক আছে। ডায়েরি পেয়েছেন, পাচ্ছেন, আরো পেতে থাকবেন। এই যে বড় বড় কোম্পানি, ব্যাংক, ব্যবসাজগত তাদের কর্ণধাররাও শিক্ষকদের তৈরি। কিন্তু শিক্ষকদের তারা কোনো ডায়েরি উপহার পাঠান না। আমি অন্তত (ততোদিনে) এগারো-বারো বছরের শিক্ষকতা জীবনে কোনো ছাত্রের কাছ হতে একটিও ডায়েরি উপহার পাইনি। শিক্ষকদের কথা মনেও আসে না তাদের। তবে হ্যাঁ, শিক্ষক যদি ক্ষমতাধর হন, ভিসি, প্রো-ডীন, ইউজিসির ইত্যাদি ইত্যাদি তাদের টেবিলেও ডায়েরির স্তূপ জমবে, তারা বিরক্ত হবেন। এবার ক্ষমতা-সম্পর্কের আলোচনায় আপনারাই মাথা ঘামান। বলেন কেন কী ইত্যাদি। এ বছরও আমি শিক্ষক। বলা বাহুল্য, শিক্ষক ছাড়া আর কিছুই নই। এ বছরও কোনো সদাশয় কোম্পানির মালিক বা উঁচুপদে আসীন কোনো প্রাক্তন ছাত্র মাস্টার সাবকে মনে রেখে একটি ডায়েরি পাঠাননি। ভুল বুঝবেন না। আমি ডায়েরির জন্য মোটেই লালায়িতও নই।

কোনো শিক্ষকই তেমন নন। পেতেও চান না কেউ। খোঁটাও দিচ্ছি না। এখনও আমি ক্লাসনোট কেনা ডায়েরিতে টুকি। বিশ্ববিদ্যালয় হতে পাই, তবুও! শিক্ষক দিবসে শুধু প্রাক্তন-বর্তমান সকল ছাত্রকে মনে করিয়ে দিচ্ছি ক্ষমতা-সম্পর্কে শিক্ষক একবারেই পেছনের কোণায় ফেলে রাখা একটি বর্গ। আপনারাই ফেলে রেখেছেন সেখানে। ছাত্রের পাঠানো একটি ডায়েরি পেলে একজন শিক্ষক আনন্দাপ্লুত আবেগাপ্লুত হবেন নিশ্চিত। পরদিনই হয়তো ক্লাসে ডায়েরিটি উঁচিয়ে ছাত্রদের দেখিয়ে বলতেন ‘আমার ওমুক ছাত্র পাঠিয়েছে। জানো সে এখন। তার আরো কতো কতো কৃতিত্বের বয়ানের খই ফোটাতেন।
সেই উদাহরণের ক্লাসের পরদিন আমার এক ছাত্র খুব সলজ্জ ও অপরাধী ভঙ্গিতে আমার জন্য একটি ডায়েরি উপহার এনেছিলেন। তাকে সসম্মানে ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলাম, আমার সামর্থ্য আছে। তোমার প্রাইমারি স্কুলের বা হাই স্কুলের বা কলেজের খানিকটা অসচ্ছল একজন শিক্ষককে ডায়েরিটি পাঠাও। দেখবে তিনি বুকে আঁকড়ে রাখবেন বছরের পর বছর। গর্ব করে বলে বেড়াবেন…। আমার বাবা-দাদাও শিক্ষক ছিলেন। ছাত্রদের দেওয়া সামান্য সম্মানের খড়কুটোও তারা জাদুঘরের যত্নে সংরক্ষণ করতেন। একে ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে সেগুলো পাবার ইতিহাস জানাতেন। আমরা তখন হাসাহাসি করতাম। এখন জানি … শিক্ষকজগতে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে গর্বিত হওয়ার চাইতে আনন্দের অন্য কোনো কিছুই শিক্ষকদের জন্য রাখা নেই! ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত