প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কামরুল হাসান মামুন: পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন যথেষ্ট না শিখিয়ে ডিজিটাল ও তথ্য প্রযুক্তিতে গুরুত্ব দেওয়ার মানে ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়া

কামরুল হাসান মামুন: নতুন শিক্ষা কাররিকুলামে প্রথম শ্রেণী থেকে দ্বাদশশ্রেণী পর্যন্ত প্রতিটি শ্রেণীতে বিষয় হিসাবে ডিজিটাল ও তথ্য প্রযুক্তি রাখা হচ্ছে। মৌলিক বিজ্ঞান যেমন গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন যথেষ্ট না শিখিয়ে ডিজিটাল ও তথ্য প্রযুক্তি অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার মানে হলো ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়া।

নতুন প্রস্তাবিত কাররিকুলাম নিয়ে অধ্যাপক জাফর ইকবালের একটা লেখার কিছু অংশ এখানে দিচ্ছি। এতে সকলে অতি সহজেই বুঝতে পারবে কি ক্ষতিটাই না আমরা করতে যাচ্ছি।

অধ্যাপক জাফর ইকবাল: আমি অতীতে মাধ্যমিক পর্যায়ের একমুখী শিক্ষার উদ্যোগটি তীব্রভাবে বিরোধিতা করেছিলাম। দেশের শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের নিয়ে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিলাম এবং তৎকালীন সরকার শেষ পর্যন্ত এটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। সেই আন্দোলনের পেছনে প্রধান যুক্তি ছিল কোন রকম পরিকল্পনা ছাড়া মাধ্যমিক পর্যায়ের বিজ্ঞান শাখা তুলে দেওয়া হলে তা অতি অবশ্যই উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পুরো বিজ্ঞান শিক্ষার কার্রিকালুমকে ছেলেমানুষি পর্যায়ের নিচে নামিয়ে আনতে হবে এবং আমাদের দেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষায় ধস নেমে আসবে।
আমি: এই পর্যায়ে আমি একটু থামতে চাই। গত কয়েকদিন ধরে আমি যেই উৎকণ্ঠা প্রকাশ করছিলাম তার সাথে উনার উৎকণ্ঠা একদম মিলে যাচ্ছে। কিন্তু উনার এই লেখাটি আমি পেয়েছি আমার উৎকথাগুলো প্রকাশের পরে। ঐযে আমি বলে আসছি যে প্রস্তাবিত কাররিকুলামে বিজ্ঞানের তিনটি শাখার আগের এক তৃতীয়াংশ করে নিয়ে একটি মাত্র পূর্ণ মানের বিষয় বানানো হবে। আর একই সাথে উচ্চতর গণিত উঠিয়ে দেওয়া হবে। এইভাবে আগের চেয়ে দুই তৃতীয়াংশ পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান ও রসায়ন কম পড়ে কিভাবে বর্তমান উচ্চ মাধ্যমিকের কাররিকুলাম বুঝতে পারবে? তার উপর উচ্চতর গণিত একদমই পড়বে না। এর অর্থ হলো উচ্চ মাধ্যমিকের সিলেবাস অবশ্যই নিচে নামাতে হবে। তার অর্থ কম বিজ্ঞান ও কম গণিত পড়ে আসা শিক্ষার্থীরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবে তখন কি হবে?

অধ্যাপক জাফর ইকবাল: মাধ্যমিক পর্যায়ের বিজ্ঞান, কলা ও বাণিজ্য শাখা তুলে দিলে সেটা যথেষ্ট চিন্তা ভাবনা করে করতে হবে। বর্তমান অষ্টম শ্রেণীর কাররিকুলামকে ভবিষ্যৎ নবম শ্রেণীর কাররিকুলামে পরিণত করা হবে যথেষ্ট আত্মঘাতী। আমি যথেষ্ট দুর্ভাবনা নিয়ে লক্ষ করছি বর্তমান শিক্ষাক্রম রূপরেখাটিতে বিজ্ঞান বিষয়টি জীবন ও জীবিকা কিংবা ভালো থাকা অথবা ধর্ম বা সমাজবিজ্ঞানের সমান গুরুত্বের একটি বিষয়। শুধু তাই নয় বিজ্ঞান শিখনের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি, পরিবেশ এবং জলবায়ুও রয়েছে। প্রযুক্তি মোটেও বিজ্ঞান নয় – বিজ্ঞানের কাররিকুলাম যদি প্রযুক্তি, পরিবেশ ও জলবায়ু ভাগ বসায় তাহলে বিজ্ঞানের অংশটুকু আরো কমে আসবে। এত কম বিজ্ঞান পড়ে উচ্চ মাধ্যমিকে এসে কিভাবে বিজ্ঞান শাখায় পড়বে? আমরা কি উচ্চ মাধ্যমিক শেষে আরো কম বিজ্ঞানে সন্তুষ্ট থাকার পরিকল্পনা করছি? একজন শিক্ষার্থী উচ্চ মাধ্যমিক শেষে যতটুকু বিজ্ঞান জানে নতুন প্রস্তাবিত কাররিকুলামে সেটা নিশ্চিত করা না হলে এই দেশে বিজ্ঞান কিংবা প্রযুক্তি শিক্ষায় ধস নামবে।

আমি: উপরের ওই কথাগুলোইতো আমি কদিন ধরে বলছি। তাহলে দুইদিন আগে অধ্যাপক মনজুর আহমেদ, অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, অধ্যাপক জাফর ইকবাল, অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সাইদ, মুনির হাসান ১০ জনের লেখা ডেইলি ষ্টার পত্রিকায় প্রকাশিত আর্টিকেলে যা বলা হয়েছে তা অধ্যাপক জাফর ইকবালের নিজস্ব চিন্তার সাথে সরাসরি কন্ট্রাডিক্ট করে। আমার ধারণা এটি অন্য কেউ লিখেছেন এবং ফোন করে উনার সম্মতি নিয়ে লেখাটি ছাপিয়ে দিয়েছে। অথবা সকলের চিন্তাকে সমস্বয় করতে গিয়ে নিজের চিন্তার সাথে compromise করেছেন। শেষেরটা যদি সত্যি হয়ে সেটা হবে জাতির জন্য বড় দুর্ভাগ্যের। কারণ এইটা compromise করার বিষয় না। এইটা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কোন পথে যাবে সেই পথ নির্ধাণের ব্যাপার। এখানে আমার মত আর অন্য দশ জনের মতকে সমন্বয় করা মানে শিক্ষার মানকে গুরুত্ব না দিয়ে সকলের মতামতকে ধারণ করে একটি গড় মত চাপিয়ে দেওয়া যা খুবই অনাকাঙ্খিত।

লেখক : শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

 

সর্বাধিক পঠিত