প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রবীর বিকাশ সরকার: শেখ হাসিনা : কর্মঠ এক বাঙালি রাজনীতিবিদ

প্রবীর বিকাশ সরকার: আমাদের প্রজন্মের ‘আইকন’ হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্যা কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর জন্মদিনে জানাই মাঙ্গলিক অভিনন্দন এবং একইসঙ্গে প্রার্থনা করি নেত্রীর সুদীর্ঘজীবন। এমন কর্মঠ বাঙালি রাজনীতিবিদ আমার চোখে অবশ্যই বিরল বলে প্রতিভাত। ঘরে-বাইরে তিনি সদা ব্যস্ত একজন রাষ্ট্রনায়ক। বলা যায়, আওয়ামী লীগ দলটির তিনি একাই একশ। নানা কারণেই তিনি একাই একশ বললে আদৌ অত্যুক্তি করা হবে না।

তিনিই একমাত্র নেত্রী যিনি একাধারে দল ও সরকারকে নিয়ে প্রতিনিয়ত ভাবেন। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি বিক্রি হননি, যার স্বীকারোক্তিতেই এর প্রমাণ মেলে। তিনিই একমাত্র জীবিত রাজনীতিবিদ যাকে বহির্বিশ্বের রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রপ্রধান এবং বিশিষ্ট নাগরিকরা ভালো করে জানেন। তিনিই একমাত্র বাঙালি যিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ। তার কাজেকর্মেই আমরা প্রমাণ পেয়ে আসছি। তিনিই একমাত্র রাজনীতিবিদ যিনি সফল হয়েছেন জঘন্যতম দুটি হত্যাকাণ্ডের বিচারিক ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রে। আমাদের কলঙ্কের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। তিনিই একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান বাংলাদেশকে দ্রুততর উন্নতির সড়কে এনেছেন, যা দৃশ্যমান এবং বিশ্বকে আকৃষ্ট করেছে। তিনিই একমাত্র রাজনীতিবিদ পাশ্ববর্তী পরাশক্তি ভারতের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারদর্শী, তিনিই একমাত্র প্রধানমন্ত্রী যিনি জঙ্গি দমনে এখনও পর্যন্ত সফল, ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতিদ্বন্দ্বী আর একজনও কি আছেন? আমার তা মনে হয় না বা থাকলে তার আত্মপ্রকাশ ঘটেনি এখনো।

যেহেতু শেখ হাসিনা একজন মানুষ, সেহেতু তারও সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান। সফলতা যেমন তার আছে, তেমনি ব্যর্থতাও রয়েছে। সেই ব্যর্থতাগুলো বহু মানুষের কাছে সহজেই বোধগম্য বললে মিথ্যে বলা হয় না। যেমন, তিনি রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী সন্দেহের অবকাশ নেই, কিন্তু একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে জনগণকে, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মডেল হতে পারেননি। তার প্রধান কারণই হচ্ছে, শিশু প্রজন্মের যুগোপযোগী চাহিদা তিনি মেটাতে পারেননি আজ পর্যন্ত। ‘ক্রীড়া ও যুব মন্ত্রণালয়’ নামে একটি মন্ত্রণালয় আছে সরকারে, তার মাধ্যমে কতখানি যুব উন্নয়ন হয়েছে বিগত ৫০ বছরে, তার খতিয়ান বা চিত্র কখনো চোখে পড়েছে বলে জানা নেই।
শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ বলে একটি প্রবাদ আছে, যা বিশ্বের সব দেশেই মান্য। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই প্রবাদ সত্য হয়নি বিগত ৫০ বছরেও। যদি প্রশ্ন করা হয়, বাংলাদেশের শিশুদের প্রতিভা ও মেধা বিকাশের জন্য জাতীয়ভাবে কী কী পরিকল্পনা আছে? কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? কী কী প্রতিষ্ঠান আছে? এসবের উত্তর সচেতন ব্যক্তি মাত্রই জানেন, প্রধানমন্ত্রী নিজেও জানেন বলে আমার বিশ্বাস। দৃশ্যমান হয়, ‘বাংলাদেশ শিশু একাডেমী’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান, যার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে। এই প্রতিষ্ঠানটির কী রকম অগ্রগতি হয়েছে তা আমরা সকলেই জানি। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ও জানেন। প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আরও একটি প্রকল্প ছিল শিশুদের জন্য সাপ্তাহিক ‘কিশোর বাংলা’ নামে একটি সংবাদপত্রের। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, কাগজটি স্বল্পায়ু ছিল, জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর সেটা বন্ধ হয়ে যায় রহস্যময় কারণে।

কেউ কেউ বলবেন, শিশু একাডেমীর শাখা রয়েছে সারা দেশে। শাখা রয়েছে, কার্যক্রম আছে কি? শিশু প্রজন্মের কাজে লাগছে কি? একাডেমীর ‘শিশু’ ম্যাগাজিনটির প্রভাব কি আছে সারা দেশের শিশুদের মধ্যে? কেউ কেউ বলবেন, তথ্য ও প্রকাশনা মন্ত্রণালয় থেকে একটি শিশু ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয় ‘নবারুণ’ নামে। মিথ্যে নয়, কিন্তু ঢাকার বাইরে তার উদয় হয় না! মনে রাখতে হবে, শুধু পাঠ্যপুস্তকের শিক্ষাবিকাশমান বুদ্ধিবৃত্তিক প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারে না।

শিশু প্রজন্মকে অবজ্ঞা করে, অবহেলা করে কোনো আধুনিক রাষ্ট্র দাঁড়াতে পারেনি। দাঁড়ালেও তার হৃদপিণ্ড থাকে দুর্বল, মস্তিষ্ক থাকে অসম্পূর্ণ। রাষ্ট্রের অগ্রগতি তারা ধরে রাখতে পারে না। ফলে পশ্চাৎপদতা, ধর্মান্ধতা এবং অরাজকতা রাষ্ট্রকে উল্টো শাসন করে থাকে। এমন রাষ্ট্র নিশ্চয়ই আমাদের কাম্য নয়! কাজেই বুদ্ধিবৃত্তিক শিশু ও তরুণ প্রজন্ম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নেত্রীর ব্যর্থতা অস্বীকার করার উপায় নেই। যত দ্রুত তিনি বিশ্বের সঙ্গে তালমেলানো পদক্ষেপ নেবেন ততই তার যেমন ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে, তেমনি বর্তমান উন্নয়নের প্রবৃদ্ধিকে ধরে রাখাটাও আলোকিত হতে থাকবে উত্তরোত্তর।

জননেত্রী শেখ হাসিনা একজন শক্তিশালী রাজনীতিবিদ এবং প্রধানমন্ত্রী কিন্তু তার প্রভাব সরকারের সর্বস্তরে কার্যকর নয়। অর্থাৎ তার শক্তি সত্যিকার নাগরিকসেবী কর্মচারী এবং প্রশাসক গড়ে তুলতে পারেনি। যদি পারতেন তাহলে ঢাকাসহ সারা দেশের স্থানীয় সরকার ও নগর প্রশাসনে অবশ্যই প্রভাব পড়ত। প্রতিটি জেলা শহরের যা দুরবস্থা তা সভ্যতা-ভব্যতাকে লজ্জা দেয়।

কথায় বলে উন্নয়নের ওপর পিঠে দুর্নীতি বিদ্যমান। অবশ্যই সেটা সিদ্ধ। কিন্তু বর্তমানে যে দুর্নীতি সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রে হচ্ছে তা অতিরিক্ত এবং অসহনীয়। অনিয়ম, রাজনৈতিক দৌরাত্ম্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য জাতির জন্য সমূহ ক্ষতিকর। শিশু ও তরুণ প্রজন্মের জন্য কতখানি ভয়াবহ তা আর না বললেও চলে। দুর্নীতি সমূলে উৎখাত অসম্ভব হলেও সহনশীল পর্যায়ে রাখাটা অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে এমন এক ভয়ঙ্কর পর্যায়ে পর্যবশিত যা নেত্রী কতোখানি ওয়াকিবহাল, গভীর সন্দেহ রয়েছে মানুষের মধ্যে।

মানুষ হিসেবে শেখ হাসিনা একজন ধর্মপরায়ণ এবং অসাম্প্রদায়িক মানুষ তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। কিন্তু এটাও অস্বীকার করা যাবে না যে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপনে তিনি সফল হতে পারেননি আজও। সংখ্যালঘুর ক্ষেত্রে বৈষম্য, অবজ্ঞা ও অবহেলা গভীর উদ্বেগজনক। স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তি এবং নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগও একেবারেই উদাসীন বর্তমান সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর লাগাতার হুমকি-ধামকি ও জানমালের ক্ষয়ক্ষতিজনক অপতৎপরতার ক্ষেত্রে। ফলে দেশ-বিদেশে সমালোচিত হচ্ছে জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার। যা বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে অস্বস্তিকর পর্যায়ে এনে দাঁড় করিয়েছে।

প্রধানত, উপরোক্ত দুর্বলতাগুলো জননেত্রী শেখ হাসিনার ভাবমূর্তিকে অনুজ্জ্বল করে তুলছে ক্রমাগত। অনেকেই বলেন, তিনি একা কী করবেন? কতটুকু করবেন? এটা কথার কথা মাত্র। এই খোঁড়া যুক্তি দিলে বিশ্ববাসী হাসবে। বাস্তবতা বিকল্প খুঁজবে। কাজেই এই যুক্তি বা সাত্বনা নিয়ে বসে থাকলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। কেননা, বর্তমান নেত্রীর ক্ষমতাত্যাগের পর কীভাবে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে তার দিকনির্দেশনা ও সাফল্য তার বর্তমান কর্ম ও দায়িত্ব বাস্তবায়নের মধ্যে শতভাগ নির্ভর। নতুন প্রজন্ম যাতে তার কর্ম ও আদর্শের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠতে পারে তেমন সুদূরপ্রসারী প্রকল্প ও পরিকল্পনা গ্রহণে যত দ্রুত তিনি সজাগ হতে পারবেন, উদ্যোগী হতে পারবেন ততোই মঙ্গল। আর এই প্রত্যাশাই করছি তার জন্মদিনে। ঈশ্বর তাকে সুস্থ রাখুন, কর্মক্ষম রাখুন। লেখক : রবীন্দ্র গবেষক

সর্বাধিক পঠিত