প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী: ইন্টারনেটের অপব্যবহার রোধে রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর নজরদারি জরুরি

দীপক চৌধুরী: ইন্টারনেট ছাড়া আমরা যেমন অচল- তেমনি উল্টোপিঠের সত্যটি হচ্ছে এর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা আমাদের মধ্যে যেনো পারস্পরিক দূরত্ব বাড়াচ্ছে। এই দূরত্ব বাবার সঙ্গে ছেলে-মেয়ের, স্ত্রীর সঙ্গে স্বামীর। যাত্রাপথে বাসে- ট্রেনে-লঞ্চে-স্টিমারে এমনকি ঘরেও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। অফিস কর্মকর্তা অনেকে আছেন যে, যারা টেবিলে ফাইল রেখে মোবাইল ইন্টারনেটে ভীষণ মনোযোগী। অনেকে আবার সরকারি অফিসকর্ম বাদ দিয়ে কবিতা লেখার রোগেও ভুগছেন। ইন্টারনেটে তরুণ-তরুণির আকর্ষণীয় কথাবার্তা ও মন ভোলানো দৃশ্যে এ এক ভয়াবহ নেশা যেনো। ইন্টারনেটের আসক্তি অভ্যাসগ্রস্ত অবস্থা থেকে বেরুনোর পথ কোথায় এ প্রশ্ন উঠেছে আজ। ঠিক এর বিপরীত দৃশ্যও রয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করা নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড চলছে। কিন্তু দেশে ইন্টারনেট অপব্যবহার করে নানারকম সমস্যা বাড়া হচ্ছে। যিনি বা যে ব্যক্তি বা যার পক্ষে কোনোভাবেই ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারেন না বা ব্যবহার করতে জানেন না তাকে বিভ্রান্তিমূলক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এমনকি জেলেও যেতে হয়ে থাকে। সামাজিক অবমাননা ও অপরাধ করার ক্ষেত্রগুলো মূলত কিশোর বয়সের ছেলেমেয়েরা তৈরি করে থাকে। সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে কিশোরদের ইচ্ছা না থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় ‘বাহাদুরী’ দেখাতে সাসপেনসন পয়েন্ট’ থেকে তারা অনিচ্ছাকৃতভাবে কাজটি করে থাকে।

অনেকে ডিজিটাল সুবিধা নিয়ে পরিকল্পিতভাবে সরকারের বিভিন্ন ইতিবাচক কাজের নেতিবাচক সমালোচনা করে থাকে। গুজব ছড়ায়। মিথ্যাচার করে। অপবাদ প্রচার করে তারা। তারা ইন্টারনেটের অপব্যবহার করে থাকে। সত্যিকারভাবেই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যাচার করার সুযোগ নিয়ে থাকে ভণ্ডশ্রেণির মানুষেরা। ফেসবুক বাংলাদেশ সরকারের কোনো কথাই শুনছে না বিধায় এটা সম্ভব হচ্ছে। সারাবিশে^ এখন উন্নয়নের রোল মডেল বাংলাদেশে। বিশ^ মানবতার নেত্রী প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা। উন্নয়নের গতিকে নস্যাৎ করতে একটি চক্রের ষড়ষন্ত্রের হাতিয়ার হচ্ছে ইন্টারনেট। তারা বিদেশে বসেও চক্রান্তমূলক অপপ্রচার চালাচ্ছে। সুতরাং জনস্বার্থেই কঠোর হওয়া দরকার।

ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সাইবার থ্রেড ডিটেকশন ও রেসপন্স কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এর ফলে ইতোমধ্যে ২২ হাজার পর্ণো সাইট এবং ৪ হাজার জুয়ার সাইটসহ আরও সহস্রাধিক আপত্তিকর সাইট বন্ধ করা হয়েছে।

সম্প্রতি স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য দিয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেছেন, ইন্টারনেট নির্ভরতা যতো বেশি তৈরি হচ্ছে, ডিজিটাল অপরাধ ততো বেশি বাড়ছে। প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ডিজিটাল অপরাধ প্রতিরোধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

ডিজিটাল অপরাধ শনাক্ত ও তা দমনে ডিজিটাল প্রযুক্তিই ব্যবহার করতে হবে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, প্রচলিত পদ্ধতিতে ডিজিটাল অপরাধ মোকাবেলা সম্ভব নয়।

এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু তাই নয়, সবার আগে জনগণের মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই।

গণমাধ্যমে দেখলাম, ফেসবুকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গ বারবার প্রকাশ্যে বলেছেন, কোটি কোটি ব্যবহারকারীকে সমান সুযোগ দিয়েছে ফেসবুক। তবে প্রতিষ্ঠানটির আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাকারবার্গের সে দাবি সত্য নয়। কারণ, প্ল্যাটফর্মটি রাজনীতিবিদ, তারকা এবং অন্য বিখ্যাত ব্যক্তিদের বরাবরই বিশেষ সুবিধা দিয়ে এসেছে।

এতে বিষয়টির স্পষ্ট ব্যাখ্যা বোঝা গেলো কী! অকারণে ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের দায়টা কে নেবে?
ফেসবুক ও ইউটিউবের ভূমিকা নিয়ে চলতি বছরের জুনে সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের ষষ্ঠ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেছেন, ‘বাংলাদেশ সরকার ফেসবুক ও ইউটিউবের কাছে যত তথ্য চেয়েছে, তার মাত্র ৪০ শতাংশ দিয়েছে ফেসবুক ও ইউটিউব। তারা শুধু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যাপক অপপ্রচার এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে সন্ত্রাসসংক্রান্ত তথ্য দিয়ে সাহায্য করছে। কিন্তু কোনো নাগরিক যদি জঙ্গিবাদ বা গুজব ছড়ায়, তখন আর তথ্য দেয় না। তারা বলে, এগুলো বাক্স্বাধীনতা। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন যথেষ্ট নয়। এ সমস্যা সমাধানে নতুন আইন করা হচ্ছে। তার খসড়াও করা হয়েছে।’

সামাজিক অস্থিরতার কারণে সাইবার জাতীয় ক্রাইম বেড়েছে। নারীর আপত্তিকর ছবি ছড়ানো, পাত্রী চাই বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতারণা, শিক্ষা বোর্ডের তথ্য চুরি, গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, তরুণিকে বিব্রস্ত্র করার ছবি প্রচার করে, নারী পুলিশের অশোভনীয় ছবি ছড়ানো, অনলাইনে জঙ্গিবাদ প্রচার ও জাতীয়সংগীত অবমাননার মতো সাইবার অপরাধের ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছে অপরাধীরা। জানা গেছে, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট, পর্নোগ্রাফি আইন, আইসিটি আইন, টেলিকমিউনিকেশন আইনে সারা দেশে ২০১৫ সালে যেখানে ৬৩৮টি মামলা হয়েছে, সেখানে ২০২০ সালে এসে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪৫৯টিতে। ব্ল্যাকমেইলিং, মোবাইল ব্যাকিং ও পর্নোগ্রাফির অভিযোগ বেশি।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ সালে প্রণয়ন করা হলেও কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে ২০২১ সালে এসেও আইনটি অপরাধ দমনে পরিপূর্ণ ভূমিকা রাখছে না বলে সরকার থেকে বলা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আইনের অপপ্রয়োগ হচ্ছে। এই অবস্থায় আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন করা উচিৎ। অপরাধের মধ্যে নারীদের ফেসবুক ইনবক্সে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য এবং ছবি পাঠানো হয়ে থাকে বলে আমরা অভিযোগ পাই। অথচ তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার থেকে বিরত থাকা অসম্ভব। তবে এর অপব্যবহার যেনো না হয় সেটা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোর নজরদারিতে রাখা জরুরি হয়ে পড়েছে।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

সর্বশেষ