প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাজারদর ভালো পাওয়ায় বাড়ছে আবাদ, পাটে আগ্রহ ফিরছে কৃষকের

বণিক বার্তা: সারা দেশে পাটের আবাদ ও উৎপাদন—দুই-ই বেড়েছে। দেশের শীর্ষ পাট উৎপাদনকারী জেলাগুলোর সবখানেই এবার কৃষিপণ্যটির আবাদ হয়েছে গতবারের চেয়ে বেশি। গত মৌসুমে ভালো মুনাফার দেখা পেয়ে এবারো বেশ উৎসাহ নিয়েই কৃষিপণ্যটির আবাদ করেছেন কৃষকরা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় উৎপাদনও ভালো হয়েছে। অন্যদিকে এবারো বাজারে পণ্যটির আশানুরূপ দাম পাওয়ার কথা জানিয়েছেন কৃষকরা।

এক সময়ে সরকারি পাটকলগুলোর দুর্দশা সংক্রমিত হয়েছিল পাটের বাজারেও। মুনাফার দেখা না পেয়ে পাট চাষ থেকে সরে আসতে শুরু করেন দেশের কৃষকরা। সম্প্রতি সে চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। আবার চাঙ্গা হয়ে উঠছে পাটের বাজার। এতে বড় ভূমিকা রাখছে বেসরকারি খাত। বাজার ভালো থাকায় আবারো লাভজনক হয়ে উঠেছে কৃষিপণ্যটির আবাদ। কৃষকদের মধ্যেও আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।

এছাড়া কৃষি বিভাগের তদারকি ও বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে কৃষকদের পাট চাষে উৎসাহিত করা হয়েছে। পানির অভাবে পাট জাগ দেয়া নিয়ে কোনো কোনো স্থানে কিছুটা সমস্যা দেখা দিলেও সার্বিক আবহাওয়া ছিল পাট চাষের অনুকূলে। ফলে পাট চাষের জমির পরিমাণ যেমন বেড়েছে, তেমনি ফলনও হয়েছে ভালো। গ্রামগঞ্জের হাটবাজারে পাটের দামও মিলছে ভালো। বর্তমানে মানভেদে মণপ্রতি পাট বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকায়, যা পাটের দামের অতীত রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ফলে এবার পাটের উৎপাদন ও দামে কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে। কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, পাটের বাজার ভালো থাকলে আগামীতে আবাদ আরো বাড়বে।

সোনালি ফসল পাট নিয়ে কর্ময?জ্ঞ চলছে গ্রামীণ জনপদে। রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে পাট ঘরে তোলার কাজে নেমেছেন কৃষক। বসে নেই কৃষাণীরাও। তারাও এ কাজে কোমর বেঁধে নেমেছেন। হাটবাজারেও জমে উঠেছে পাট বেচাকেনা। ফলে লকডাউনে কার্যত অচল কৃষিনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা ঘুরতে শুরু করেছে।

যশোর জেলার কৃষি বিভাগ সূত্র বলছে, যশোরে এবার লক্ষ্যমাত্রারও বেশি পাটের আবাদ হয়েছে। চলতি মৌসুমে আট উপজেলায় পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়, ২৫ হাজার ৩০০ হেক্টর। এবার মোট ২৬ হাজার ১২৫ হেক্টর জমিতে পাটের চাষাবাদ হয়েছে। গত মৌসুমে পাটের আবাদ হয়েছিল ২৩ হাজার ৫৬৫ হেক্টর। ফলে তথ্য পরিসংখ্যান বলছে, লাভজনক হয়ে ওঠায় যশোরে পাটের চাষাবাদ ও উৎপাদন ধারাবাহিক বাড়ছে।

যশোর সদরের চাঁচড়ার রূপদিয়া গ্রামের কৃষক আদিত্য বিশ্বাস জানান, এবার আড়াই বিঘা জমিতে পাটের আবাদ করেছেন। ফলনও ভালো হয়েছে। তিনি বিঘাপ্রতি ৮-১০ মণ পেয়েছেন।

কৃষক সঞ্জয় সরকার জানান, দুই বিঘা জমিতে পাট আবাদ করেছেন। ফলনও ভালো হয়েছে। যারা এরই মধ্যে পাট বিক্রি করেছেন, তাদের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন, ছোট থাকতে কাটা পাটের মণপ্রতি দাম মিলেছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা। আর এখন যেসব পাট উঠছে, সেগুলোর সর্বনিম্ন দাম ২ হাজার ৪০০ টাকা। তিনি দাবি করেন, দামের পতন না হলে মোটামুটি লাভবান হবেন।

যশোর সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তার কার্যালয়ের জেলা বাজার কর্মকর্তা সুজাত হোসেন খান জানান, জেলার হাটবাজারে মানভেদে পাটের মণ ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

নওগাঁয় এ বছর পাটের আবাদ কিছুটা কম হলেও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় জেলায় পাটের ভালো ফলন হয়েছে। বর্তমানে প্রকারভেদে প্রতি মণ পাট নওগাঁর বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৯৫০ থেকে ৩ হাজার ৭০০ টাকায়। বাজারে পাটের ভালো দাম পাওয়ায় লাভবান হচ্ছেন চাষীরা। কৃষকরা পাটের ভালো দাম পাওয়ায় আগামীতে পাটের আবাদ আরো বাড়বে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর জেলায় ৬ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেখানে ৫ হাজার ৭২৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষাবাদ করা হয়েছে। এরই মধ্যে জেলার প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমির পাট কাটা শেষ হয়েছে। এ বছর দেশী, তোষা ও মেস্তা জাতের পাট চাষ করেছেন কৃষকরা।

জেলার মান্দা উপজেলার সবচেয়ে বৃহত্তর পাট কেনা-বেচার হাট সতিহাটে সরিজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রকারভেদে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৯৫০ থেকে ৩ হাজার ৭০০ টাকায়। গত বছর এ পাট বিক্রি হয়েছিল ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকা মণ।

সতিহাটে রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলা থেকে পাট কিনতে এসেছেন আহসান হাবীব। তিনি বলেন, এ হাটে দেশী, তোষা ও মেস্তা জাতের পাট সবচেয়ে বেশি কেনা-বেচা হয়। গত বছর এ পাটের দাম ছিল ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা মণ। এখন বাজারে সেই পাটের দাম সর্বনিম্ন ২ হাজার ৯৫০ টাকা মণ। আমরা প্রকারভেদে প্রতি মণ পাট ২ হাজার ৯৫০ থেকে ৩ হাজার ৭০০ টাকায় কিনছি।

মান্দা উপজেলার ভারশো গ্রাম থেকে সতিহাটে ২৪ মণ পাট বিক্রি করতে এসেছেন পল্লব বর্মণ। তিনি বলেন, প্রতি বছর দুই বিঘা জমিতে পাট চাষ করি। পাট চাষের জন্য এ বছর বিনামূল্যে প্রণোদনার সার ও বীজ পেয়েছিলাম। জমির পাট কাটা শেষ করেছি। সেই পাট থেকে আঁশ ছাড়ানোর পর এখন ৩ হাজার ২০০ টাকা মণ দরে ৭৬ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি করলাম। গত বছর এ পাট প্রতি মণ ২ হাজার ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করেছিলাম।

আত্রাই উপজেলার বান্দাইখাড়া গ্রাম থেকে সতিহাটে পাট বিক্রি করতে এসেছেন চাষী ওমর ফারুক। তিনি বলেন, এ বছর নয় বিঘা জমিতে ৩২ মণ পাট পেয়েছি। প্রতি বিঘা জমিতে ৭ থেকে সাড়ে ৭ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সেই পাট ৩ হাজার টাকা মণ দরে ৯৬ হাজার টাকায় বিক্রি করলাম।

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শামশুল ওয়াদুদ বলেন, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে পাটের উৎপাদন আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। এরই মধ্যে জেলার বেশির ভাগ জমির পাট কাটা শেষ হয়েছে। পলিথিন ব্যবহারের পরিবর্তে সর্বক্ষেত্রে পাটের ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। এখন মানভেদে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি করতে পারছেন কৃষকরা। মৌসুমের শেষদিকে পাটের দাম আরো বাড়বে।

দিনাজপুর জেলা সদর ছাড়াও চিরিরবন্দর, বীরগঞ্জ, খানসামা, কাহারোল, ফুলবাড়ী ও বিরামপুর উপজেলায় প্রচুর পরিমাণে পাটের আবাদ হয়। দিনাজপুরের সবচেয়ে বড় পাটের বাজার পাকেরহাট। দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার পাকেরহাট বাজারে গিয়ে পাটের দাম ও চাহিদার ঊর্ধ্বমুখী চিত্র পাওয়া যায়। পাইকাররা ভ্যান থেকে পাট কিনে স্তূপ করে রাখছেন রাস্তার পাশে। পরে ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনে পাট চলে যাচ্ছে ব্যবসায়ীর গুদামঘরে।
প্রতি মণ তোষা পাট বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ১০০ থেকে ৩ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে দেশী পাট বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা দরে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত সপ্তাহেও এ বাজারে প্রতি মণ তোষা পাট বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা দরে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে পাটের দামের এ ঊর্ধ্বগতি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এবারই পাটের আবাদ ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হয়েছে। এবার ৩ হাজার ৯৩৬ হেক্টর জমিতে ৪১ হাজার ৬৮৯ টন পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। সেখানে ৪ হাজার ৪২৬ হেক্টর জমিতে ৪৭ হাজার টন পাট উৎপাদন হয়েছে।

রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের মৃধাডাঙ্গা এলাকার কৃষক আজাহার উদ্দিন বলেন, এ বছর চার বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছি। প্রতি বিঘা জমিতে ৮-১০ মণ পাট উৎপাদন হয়েছে। সব মিলিয়ে খরচ প্রতি বিঘায় ১০-১২ হাজার টাকা। বাজারে পাট বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার টাকার মধ্যে। মৌসুমের শেষ পর্যন্ত দাম এভাবে থাকলে কৃষকরা প্রচুর লাভবান হবেন এবং পাট চাষে আরো আগ্রহী হয়ে উঠবেন।

গোয়ালন্দ উপজেলার খানখানাপুর বাজারের মোল্লা ট্রেডার্সের মালিক মজিবর রহমান মজি জানান, এবার এ অঞ্চলে ব্যাপক পাটের আবাদ হয়েছে। গতবারের তুলনায় এবার পাটের মানও ভালো। ফলে কৃষকরা দামও ভালো পাচ্ছেন।

রাজবাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এসএম শহীদ নূর আকবর বলেন, রাজবাড়ীতে ব্যাপক পাটের আবাদ হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর রাজবাড়ীতে ১ হাজার ৫৩৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ বেশি হয়েছে। করোনাকালে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে।

সাতক্ষীরায় চলতি মৌসুমে তোষা, ফালগুনী, মেস্তা, গুটি ও স্থানীয় জাতের পাট চাষ করা হয়েছে। সদর উপজেলার তুজুলপুর গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি প্রতি বছর কম-বেশি পরিমাণে পাট চাষ করেন। চলতি মৌসুমেও তিনি পাঁচ বিঘা জমিতে পাটের আবাদ করেছেন। গত দু-তিন বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে পাটের দাম সবচেয়ে ভালো পাচ্ছেন। বর্তমানে প্রতি মণ পাট ২ হাজার ৮০০ টাকা দরে বিক্রি করছেন, যা গত মৌসুমের চেয়ে মণপ্রতি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি।

একই এলাকার চাষী ইয়ারব হোসেনও পাটের দামে খুশি। তিনি বলেন, পাট বিক্রির সবচেয়ে বড় মোকাম সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঝাউডাঙ্গা বাজারে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা দরে। তাছাড়া উৎপাদন শুরুর প্রথম দিকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া গেছে পাটের দাম।

সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নুরুল ইসলাম জানান, উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরায় পাট চাষ বাড়ছে। এ এলাকার কৃষকরা অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি কম-বেশি পাট চাষ করেন। গত দু-তিন বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে পাটের দামও ভালো পাচ্ছেন কৃষক।

মৌসুমের শুরুতে পাট বিক্রি করে ভালো দাম পেয়েছেন গোপালগঞ্জ জেলার কৃষকরা। ফলনও হয়েছে ভালো। জেলার হাটবাজারগুলোতে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। পাইকাররা বাড়ি বাড়ি গিয়েও পাট কেনায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সেকেন্দার শেখ বলেন, এ জেলায় গত মৌসুমে ১ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে পাট আবাদ হয়েছিল। বর্তমানে তা বেড়ে মোট ২৬ হাজার ১০৪ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে।

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষক ঠান্ডা মোল্লা পাটের বেশি দাম পেয়ে খুব খুশি। তিনি বলেন, এবার চার বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছি। ফলন পেয়েছি বিঘাপ্রতি ১২ মণ। টাকার দরকার থাকায় শুরুতে ২ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি করেছি প্রতি মণ।

বাগেরহাটের মোল্লাহাটে সোনালি আঁশের উৎপাদন ও দামে এবার খুশি চাষীরা। তোষা ও দেশী পাটের ফলন ভালো হওয়ায় পাট কাটা, পাট জাগ, আঁশ সংগ্রহ, খড়ি শুকানোসহ পাঠ পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন পাট চাষীরা।

মোল্লাহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অনিমেষ বালা বলেন, এ উপজেলায় প্রায় ৯৬০ হেক্টর জমিতে পাটের চাষ হয়েছে। আমরা চাষীদের সব ধরনের কারিগরি পরামর্শ ও সহযোগিতা করেছি। এ বছর কাঁচা পাটের মণ ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত