প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন: মূল ধারার শিক্ষাকেই এখন কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বানানো কি ঠিক হলো!

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন: নবম দশম শ্রেণির বিভাগ উঠিয়ে দিয়েছে। ভালো কথা। শুনতে ভালো শুনায়। কিন্তু উঠানোর সঙ্গে যা করা উচিত ছিলো সেটা হলো যতো ইচ্ছে বিষয় অপশন হিসাবে রাখা এবং সকল বিষয়কে ঐচ্ছিক করে দেওয়া। তারপর শিক্ষার্থীরা যে যেই বিষয় ইচ্ছা এবং যতো সংখ্যক ইচ্ছে বিষয় নির্বাচন করবে। সেটাই করা হয় ইংরেজি মাধ্যমসহ পৃথিবীর সকল উন্নত দেশে। আর বিভাগে বিভক্ত না থাকাটা কেবল নবম দশম শ্রেণি পর্যন্ত না বরং একাদশ দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্তও শিক্ষার্থীরা কোনো বিভাগে বিভক্ত থাকে না। শুধু তাই না। আমেরিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরেও শিক্ষার্থীরা কোনো বিষয়ে অনার্স বা আন্ডার গ্রাজুয়েট পড়বে সেটা চূড়ান্ত নির্বাচনের জন্য ১ বছরেরও বেশি সময় পায়। এ সময়ে তারা পছন্দের বিভিন্ন বিষয়ে পড়ে এবং তারপর ফাইনাললি বিষয় নির্বাচন করে।

আমরা কি করলাম? নবম দশম শ্রেণিতেই সবাইকে ঘাড়ে ধরে ১০ টি বিষয় পড়তে বাধ্য করার সিস্টেম চালু করলাম। অথচ বিভাগ উঠিয়ে দেওয়া মানে হওয়া উচিত আরও বেশি স্বাধীনতা যেন কেউ যদি সংগীত, চারুকলা নিয়ে পড়তে চায় সে যেন সেরকম বিষয় নির্বাচনের সুযোগ পায়। ইংল্যান্ডে ও-লেভেল এবং এ-লেভেলে এটাই করা হয়। অসংখ্য বিষয় নির্বাচনের সুযোগ। কোনো বিষয়ই বাধ্যতামূলক না। যারা নতুন এই কাররিকুলাম তৈরি করেছে তারা নাকি ৮৬টিরও বেশি দেশের কাররিকুলাম পর্যালোচনা ও গবেষণা করে তারপর এটা বানিয়েছে। ওরে আমার গবেষকরে। কোথায় আছে এমন ব্যবস্থা যেখানে এক চিমটি পদার্থবিজ্ঞান, এক চিমটি রসায়ন ও এক চিমটি জীববিজ্ঞান দিয়ে একটি স্যালাইন মার্কা পাঠ্যক্রম? এই স্যালাইন শিক্ষা জাতির ডায়রিয়া সারলেও পরিশেষে ক্যান্সারে আক্রান্ত করবে।

নতুন এই ব্যবস্থায় বিজ্ঞানকে অবহেলা করা হয়েছে। যারা এই কারিকুলাম বানিয়েছে আমি নিশ্চিত তাদের অধিকাংশই আর্টস, সোশ্যাল সাইন্স এবং বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থী। নতুন এই ব্যবস্থায় কি হলো। বিজ্ঞানকে সিঁড়ির কয়েক ধাপ নামানো হলো আর মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগকে একটু উপরে উঠিয়ে শিক্ষার্থীদের একটি গড় শিক্ষায় শিক্ষিত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে জীবন ও জীবিকা আর প্রযুক্তির উপর। জীবন ও জীবিকা, প্রযুক্তি আর ভালো থাকা বিষয় শিখে উচ্চ মাধ্যমিকে যখন বিজ্ঞান বিভাগ পড়তে যাবে যেখানে আগের পূর্ণ মানের পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞান থাকবে তখন সব ভালো লাগা বের হয়ে যাবে। তাতে কি হবে? বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তারা প্রশান্ত সাগরের মাঝখানে পরে কোন কুল কিণারা পাবে না। আমরা আর ভালো মানের শিক্ষার্থী পাব না। দেশে আর বড় বিজ্ঞানী, বড় ইঞ্জিনিয়ার আর বড় ডাক্তার পাওয়ার সম্ভবনা কমে যাবে। প্রযুক্তি কীভাবে বিজ্ঞানের আগে বা সঙ্গে আসে? আগে বিজ্ঞান শিখবে। বিজ্ঞানহীন প্রযুক্তি শিখতে গিয়ে প্রযুক্তিবিদ হতে পারবে না।

যা হবে সেটা হলো টেকনিশিয়ান। প্রযুক্তি, ভালো থাকা, তথ্য ও যোগাযোগ ইত্যাদি বিষয় শিখবে ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট কিংবা কারিগরি বোর্ডের অধীনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এসব ঢুকিয়ে মূল ধারার শিক্ষাকেই এখন কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বানানো কি ঠিক হলো? যারা এসব আকামের সঙ্গে যুক্ত তারা কি এ দেশের মানুষ না? নাকি লুটেপুটে সব খাওয়া শেষ হলে পরিবারসহ বেগম পাড়ায় পাড়ি দেবেন? অযোগ্যদের বেশি ক্ষমতা দিলে তাদের প্রতিনিয়ত জ্ঞানী হওয়ার অভিনয় করতে হয়। আর অভিনয়ের ফলই হলো নতুন এই কাররিকুলামের মঞ্চায়ন। লেখক : শিক্ষক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

সর্বাধিক পঠিত