প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অতি লোভে সর্বনাশ, টাকা নিয়ে অনিশ্চয়তা লাখো গ্রাহক

নিউজ ডেস্ক : ‘লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু’ প্রবাদটি শিক্ষিত লোকজন তো বটে; দেশের নিরক্ষর লোকজনও জানেন। তারপরও লোভ সংবরণ করতে না পেরে বিপদে পড়ছেন মানুষ। অর্ধেক দামে বা বাজার মূল্যের অনেক কম দামে পণ্য ক্রয়ের লোভে পড়ে হাজার হাজার, লাখ লাখ এমনকি কোটি কোটি টাকা হারাতে বসেছেন দেশের অসংখ্য মানুষ। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি থেকে অতি অল্পমূল্যে পণ্য ক্রয়ের লক্ষ্যে অগ্রিম টাকা দিয়েছেন। টাকা ফেরত পেতে বিপদে পড়া এই মানুষগুলোর কেউ কেউ বিক্ষোভ করছেন; কেউ হতাশায় পড়েছেন। আবার কেউ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে উদ্যোগী হয়ে প্রতারিত গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেয়ার ব্যবস্থার অনুরোধ জানিয়েছেন। ইনকিলাব

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কম মূল্যে পণ্য কিনে বাবা-মাকে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য লাখ টাকা বিনিয়োগ করে আম-ছালা দুটোই হারাচ্ছেন বহু তরুণ। আর এই লোভাতুর মানুষগুলোকে যারা লোভে ফেলে ঠকানোর নীল নকশা এঁকেছিলেন সেই চক্র ইভ্যালির সিইও মো. রাসেল এবং তার স্ত্রী ও প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিনকে গ্রেফতারের পর তিন দিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়েছে। প্রতারণা ও অর্থ-আত্মসাতের জন্য গ্রাহকের দায়েরকৃত মামলায় গতকাল শুক্রবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আতিকুল ইসলাম এ আদেশ দেন।

ইভ্যালির সিইও মো. রাসেল এবং চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিনকে যখন গ্রেফতার করা হয় তখনো পণ্য ক্রয়ের জন্য অগ্রিম দেয়া টাকা ফেরত পেতে বিক্ষোভ করেছেন গ্রাহকরা। গতকাল যখন আদালতে তাদের রিমান্ডের জন্য নেয়া হয় তখনো বাইরে প্রতারিত গ্রাহকদের অনেকেই বিক্ষোভ করেছেন। শাহবাগেও ইভ্যালিকে দেয়া টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য কর্মসূচি পালন করেছেন প্রতারিত গ্রাহকদের অনেকেই। প্রশ্ন হচ্ছে প্রতারিত গ্রাহকরা কি অর্থ ফেরত পাবেন?

সারাবিশ্বে এখন অনলাইনে কেনাকাটা হয়ে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে অনলাইনের মাধ্যমে সব ধরনের পণ্য ক্রয় বিক্রয় হয়ে থাকে। বাংলাদেশেও এই প্রক্রিয়ায় কেনাকাটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অ্যামাজন, দারাজ, আলীবাবাসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান অনলাইনে অর্ডার নেয় এবং পণ্যের ডেলিভারি দিয়ে থাকে। তথ্য প্রযুক্তির যুগে নতুন প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে অনলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশেও পণ্য ক্রয় বিক্রয় হচ্ছে। এই মাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণাও চলছে সমানতালে। এর আগে ডেসটিনি, ইউনি পে টু, যুবক, আইসিএল, এইমওয়ে এবং ‘ব্রাইট ফিউচার’ এর প্রতারণার শিকার হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। কিন্তু ইভ্যালি সেগুলোর প্রতারণাকে পিছনে ফেলে প্রতারণার অভিনবত্ব দেখিয়েছে। এক লাখ টাকা মূল্যের পণ্য ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করা ভাবা যায়? যারা প্রতারণার এই লোভে পড়েছেন তারাই মূলত ধরা খেয়েছেন রাসেল-শামীমা চক্রের হাতে।

নিয়মিত বিদেশ ভ্রমণ করেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উন্নত দেশগুলোতে এখন অনলাইনে বেশি কেনাবেচা হয়। তবে কোনো পণ্যের অর্ধেক মূল্যে বিক্রি হয় এমন তথ্য তাদের কাছে নেই। গ্রাহকদের কাছে যে পণ্যের যে মূল্য সেটাই নেয়া হয়। শুধু ডেলিভারি খরচ কমবেশি হতে পারে।

জানতে চাইলে অনলাইনে কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত একজন আইটি বিশেষজ্ঞ বলেন, অনলাইনে কেনাবেচা জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও এ নিয়ে দেশে কোনো সরকারি নীতিমালা নেই। গ্রাহকের স্বার্থ সংরক্ষণ, বিক্রেতা ও সরবরাহকারীর দায়দায়িত্ব দেখভালের বিষয়ে কোনো দিক নির্দেশনা নেই। যার কারণে অনলাইন মাধ্যমে অনেকেই প্রতারণা করে থাকে। আরেকজন আইটি বিশেষজ্ঞ বলেন, লোভে পড়ে বাজার মূল্যের চেয়ে কম দামে ইভ্যালি থেকে কিনতে গিয়ে প্রতারিত হলো প্রচুর গ্রাহক। এটা অন্যান্য অনলাইন ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সূত্রমতে, পণ্য কিনলেই টাকা ফেরতের অস্বাভাবিক অফার দিয়ে ব্যবসা করেছে ইভ্যালি। ১০০ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত ক্যাশব্যাক অফার দেয়া হচ্ছে। অর্থাৎ ১০০ টাকার পণ্য কিনলে সমপরিমাণ বা তার চেয়েও বেশি টাকা ফেরত দেয়া হবে। নানা ধরনের লোভনীয় অফার দিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করা হয়। আবার ১০ জনের কাছে অগ্রিম টাকা নিয়ে ৫ জনকে পণ্য ডেলিভারি দিয়ে গ্রাহকদের লোভ বাড়িয়ে দেয়া হয়। মূলত ইভ্যালির ব্যবসায়িক অপকৌশল হলো নতুন গ্রাহকের ওপর দায় চাপিয়ে পুরনো গ্রাহকদের আংশিক অর্থ বা পণ্য ফেরত দেওয়া। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ইভ্যালির কার্যক্রমের ধরন এমএলএম কোম্পানির মতো। এমএলএম কোম্পানিগুলোর প্রতারণার চিত্র দেখার অভিজ্ঞতা থেকে মনে হচ্ছে, ইভ্যালিও তা-ই করছে।

জানা যায়, গত ৪ জুলাই ইভ্যালির বিরুদ্ধে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চারটি সরকারি সংস্থাকে চিঠি দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সংস্থা চারটি হলো দুর্নীতি দমন কমিশন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘ইভ্যালি ডট কম’ নামে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্তের উদ্যোগ নেয়। অতঃপর দুদক তদন্ত করে প্রতিবেদন পাঠায়। সে প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ১৪ মার্চ ‘ইভ্যালি ডট কম’র মোট সম্পদ ৯১ কোটি ৬৯ লাখ ৪২ হাজার ৮৪৬ টাকা (চলতি সম্পদ ৬৫ কোটি ১৭ লাখ ৮৩ হাজার ৭৩৬ টাকা) এবং মোট দায় ৪০৭ কোটি ১৮ লাখ ৪৮ হাজার ৯৯৪ টাকা। ওই সময় ‘ইভ্যালি ডট কম’র গ্রাহকের কাছে দায় ২১৩ কোটি ৯৪ লাখ ৬ হাজার ৫৬০ টাকা। মার্চেন্টের কাছে দায় ১৮৯ কোটি ৮৫ লাখ ৯৫ হাজার ৩৫৪ টাকা। গ্রাহকের কাছ থেকে অগ্রিম হিসেবে গৃহীত ২১৩ কোটি ৯৪ লাখ ৬ হাজার ৫৬০ টাকা এবং মার্চেন্টের কাছ থেকে ১৮৯ কোটি ৮৫ লাখ ৯৫ লাখ ৯৫ হাজার ৩৫৪ টাকার মালামাল গ্রহণের পর স্বাভাবিক নিয়মে প্রতিষ্ঠানটির কাছে ৪০৩ কোটি ৮০ লাখ ১ হাজার ৯১৪ টাকার চলতি সম্পদ থাকার কথা। অথচ প্রতিষ্ঠানটির কাছে চলতি সম্পদ রয়েছে মাত্র ৬৫ কোটি ১৭ লাখ ৮৩ হাজার ৭৩৬ টাকা।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ