প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জমি দখলে ৪৯ মামলা পিরের মুরিদদের!

ডেস্ক রিপোর্ট: সম্পত্তি হস্তান্তর না করায় রাজধানীর রাজারবাগ দরবার শরিফের পির দিল্লুর রহমান ও তার অনুসারীদের সঙ্গে শত্রুতা সৃষ্টি হয় একই এলাকার বাসিন্দা একরামুল আহসান কাঞ্চনের। এই শত্রুতার কারণেই ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় তার বিরুদ্ধে ৪৯টি ‘হয়রানিমূলক’ মামলা করা হয়। এসব মামলার পেছনে দরবার শরিফের পির ও তার অনুসারীগণের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। এ সংক্রান্ত একটি তদন্ত প্রতিবেদন সম্প্রতি হাইকোর্টে দাখিল করে তারা। ইত্তেফাক

বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে গতকাল রবিবার ঐ প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। শুনানিকালে হাইকোর্ট বলেন, ‘একটি মিথ্যা মামলা দিলেই তো মানুষের জীবন শেষ হয়ে যায়। সেখানে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে এতগুলো মামলা? জায়গা-জমি দখলের জন্য পির সাহেবের কেরামতি দেখেন। সম্পত্তির জন্য তথাকথিত মুরিদ দিয়ে কীভাবে একের পর এক মামলা করেছেন।’

এর আগে দেশের বিভিন্ন জেলায় করা এসব মামলার বাদীদের খুঁজে বের করার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন কাঞ্চন (৫৫)। ঐ রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত জুন মাসে হাইকোর্ট এসব মামলা দায়েরের পেছনে কারা জড়িত, তা খুঁজে বের করতে সিআইডিকে নির্দেশ দেন। ঐ নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি তদন্তের ভার পড়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রতন কৃষ্ণ নাথের ওপর। দীর্ঘ তদন্ত শেষে তিনি হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করেন।

সিআইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাঞ্চনের বিরুদ্ধে ২৩টি জিআর (থানায়) এবং ২৬টি সিআর (আদালত) মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি জিআর এবং ২০টি সিআর মামলায় আদালত থেকে খালাস পেয়েছেন তিনি। বর্তমানে ১৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে আটটি জিআর এবং ছয়টি সিআর মামলা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একরামুল আহসানরা তিন ভাই ও এক বোন। ১৯৯৫ সালে তার বাবা ডা. আনোয়ারুল্লাহ মারা যান। রাজারবাগ দরবার শরিফের পেছনে ৩ শতাংশ জমির ওপর তিন তলা একটি পৈতৃক বাড়ি রয়েছে তাদের। বাবার মৃত্যুর পর একরামুলের বড় ভাই আক্তার-ই-কামাল, মা কোমরের নেহার ও বোন ফাতেমা আক্তার পির দিল্লুর রহমানের মুরিদ হন। কিন্তু তারা রিট আবেদনকারী একরামুল ও তার আরেক ভাই ডা. কামরুল আহসান বাদলকে বিভিন্নভাবে প্ররোচিত করেও ঐ পিরের মুরিদ করতে পারেননি। এর মধ্যে একরামুলের মা, ঐ ভাই ও বোনের নামে থাকা জমির একাংশ দরবার শরিফের নামে হস্তান্তর করা হয়।

কিন্তু একরামুল ও তার ভাইয়ের প্রাপ্য অংশটুকু দরবার শরিফের নামে হস্তান্তর করার জন্য পির দিল্লুর ও তার অনুসারীরা বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করেন। কিন্তু তারা কোনো সম্পত্তি হস্তান্তর না করায় শত্রুতার সৃষ্টি হয়। যার কারণে একরামুলের বিরুদ্ধে মানবপাচার, নারী নির্যাতন, বিস্ফোরক দ্রব্য আইন, হত্যাচেষ্টা, প্রতারণা, জাল-জালিয়াতি, ডাকাতির প্রস্তুতিসহ বিভিন্ন ধর্তব্য ও অধর্তব্য ধারায় ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলার বাদী ও সাক্ষীদের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে রাজারবাগ দরবার শরিফ এবং ঐ পিরের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এরা ঐ পিরের অনুসারী ও মুরিদ বলে তথ্য-প্রমাণে প্রতীয়মান হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কাঞ্চনের বিরুদ্ধে একটি মামলার বাদী শাখারুল কবির ওরফে ইকবাল। তিনি তিনটি মামলায় সাক্ষীর ভূমিকাও পালন করেন। ইকবাল রাজারবাগ দরবার শরিফের পির পরিচালিত মোহাম্মদীয়া ট্রি-প্লানটেশনের দায়িত্ব পালন করছেন। ফারুকুর রহমান একটি জিআর মামলার বাদী। একই সঙ্গে সাতটি সিআর মামলার সাক্ষী। তিনি ঐ দরবার শরিফের পিরের মালিকানাধীন ডেভেলপার কোম্পানি সাইয়েদুল কাওমাইন প্রোপার্টিজ লি. এর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া মো. মফিজুল ইসলাম ওরফে জামাই মফিজ রিটকারী কাঞ্চনের বিরুদ্ধে দুটি মামলার বাদী ও একটি মামলায় সাক্ষীর ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি ঐ দরবার শরিফ পরিচালিত মোহাম্মদীয়া জামিয়া শরিফ মাদ্রাসার সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া গত বছর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পরিচালিত এক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পির দিল্লুর রহমান এবং তার অনুসারীরা তাদের দরবার শরিফের স্বার্থ হাসিলের জন্য নিরীহ জনসাধারণের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করছে। কমিশনের ঐ প্রতিবেদনে কাঞ্চনের বিরুদ্ধে ঐ পির সিন্ডিকেটের হয়রানিমূলক মামলা দায়েরের বিষয়টিও উঠে এসেছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে একরামুল হক কাঞ্চন বলেন, ‘এসব মিথ্যা মামলার কারণে আমাকে সাড়ে আট বছর জেল খাটতে হয়েছে। হাইকোর্ট হস্তক্ষেপ করায় এখন প্রকৃত তথ্য আদালতের সামনে উঠে এলো।’

গতকাল আদালতে কাঞ্চনের পক্ষে আইনজীবী এমাদুল হক বশির, রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার ও একরামুলের বিরুদ্ধে মামলাকারী আফজাল হোসেনের পক্ষে ওয়াজি উল্লাহ শুনানি করেন। ওয়াজি উল্লাহ বলেন, রিটের অন্যতম বিবাদী আফজাল হোসেনের পক্ষে আপিল বিভাগে আবেদন করলে হাইকোর্টের আদেশ ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্থগিত করা হয়। এমাদুল হক বশির বলেন, ‘২০টি মামলার পাঁচ জন বাদী আপিল বিভাগে পৃথক আবেদন করেন। তাদের মামলার ক্ষেত্রে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত হয়েছে শুনেছি। তবে কপি পাইনি।’ তখন আদালত বলেন, আদেশের কপি নিয়ে আসুন। বিষয়টি মুলতবি রাখা হলো।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত