প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ফজলুল বারী: এক চিমটে ভাসানী ন্যাপ, এক চিমটে রাজাকার, এক চিমটে মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে ঘুটাঘুটা একটা ‘ওরস্যালাইন’ দল, বিএনপি!

ফজলুল বারী: জিয়া তখন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। সিএমএ। সেদিন রোজার সকাল। এক কর্মকর্তাকে একটা কাজে সেনানিবাসের বাসায় ডেকেছেন জিয়া। কর্মকর্তা গিয়ে দেখেন বৈঠকখানায় বেশ লোকজন। যারা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। সামরিক আইন প্রশাসক হলেও জিয়া তখনই সেনা উর্দিপরা অবস্থায় রাজনৈতিক দল গঠনের কাজ শুরু করে দিয়েছিলেন। ওই লোকগুলো জিয়ার নতুন দলে যোগ দিতে তার সঙ্গে কথা বলতে এসেছিলেন। অথবা জিয়া তাদের ডেকেছিলেন।

কর্মকর্তা পৌঁছার খবর শুনে জিয়া তাকে বৈঠকখানায় না বসিয়ে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যান। জিয়া তাকে বলেন বৈঠকখানায় সব মুসলমান বসা। রোজায় আমরা তাদের সামনে ব্রেকফাস্ট করতে পারবোনা। আপনাকে ভেতরে ডাকার কারণ এখানে দুজনে আরামসে ব্রেকফাস্ট করতে করতে কাজের কথা সেরে ফেলবো। কর্মকর্তা চলে আসার সময় দেখেন জিয়া মুখ মুছে রোজাদারের মতো মুখ শুকনো করে বৈঠকখানায় ঢুকে সবার সালাম নিতে নিতে সবার নাম পরিচয় জানতে চাইছেন!

এই হলেন জেনারেল জিয়া। যিনি রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করেছেন। সংবিধানে বিসমিল্লাহ সংযোজন করেছেন। কিন্তু নিজে ধর্মকর্ম করতেন না। পাকিস্তানের করাচিতে বড় হওয়ায় জিয়ার আরবি, বাংলা সব উচ্চারণেও সমস্যা ছিল। যেমন তিনি বলতেন ‘বেসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’। বিসমিল্লাহ বলতে পারতেন না। জিয়ার ভাষণের রেকর্ড খুঁজে বের করে শুনলে যে কেউ এর প্রমাণ পাবেন। বাংলা উচ্চারণেও উর্দুর টান ছিল তার মধ্যে। পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের রাজধানী করাচি নগরী জিয়ার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পিতার কর্মক্ষেত্রের সূত্রে সেখানেই তিনি পড়ালেখা করেছেন।

উল্লেখ্য জিয়ার মা-বাবা দুজনের কবরও করাচিতে। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে রাষ্ট্রপতি জিয়া কখনো মা-বাবার কবর জিয়ারতে করাচি যাননি। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসাবে বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তান সফরে গেছেন। কিন্তু বিষয়টি চিহ্নিত হয়ে যাবার ভয়ে কোনোদিন শশুরশাশুড়ির কবর জিয়ারত করতে যাননি! পাকিস্তানপন্থী রাজনীতিক হিসাবে জিয়া-খালেদার দুজনেরই বদনাম। আর বদনাম না বাড়াতে এমন নিকটজন মা-বাবা, শ^শুর-শাশুড়ীর কবরও কোনোদিন জিয়ারতে যাননি জিয়া-খালেদা জিয়া! স্ববিরোধিতার রাজনীতির মাশুল বুঝি এমনই নির্মম হয়!

[২] জিয়াউর রহমানকে তার তোষামোদকারীরা বললেন স্যার, আপনাকে ভূমি সংস্কারক হতে হবে। আপনার নেতৃত্বে গড়তে হবে দেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ। তবেই কিনা দেশের ইতিহাসে আপনি অমর হয়ে থাকবেন। জিয়াউর রহমান বলেন, বক্তৃতায় কী বলতে হবে লিখে দেন। লিখে দেওয়া হলো, আপনি জমির আইল তুলে দেবেন। বলবেন ক্ষেতের আইল রাখিবো না আর। দিলাম আইল ভাঙার ডাক। এই আইলের কারণে দেশের লাখ লাখ একর কৃষি জমি নষ্ট হচ্ছে। দেশের প্রতি ইঞ্চি জমি উৎপাদনে কাজে লাগাতে হবে। কারণ আমাদের দল বিএনপির রাজনীতি হলো উৎপাদনের রাজনীতি। তাছাড়া আইল তুলে দিলে দেশের খাদ্য উৎপাদনও বহুগুণ বেড়ে যাবে।

মূলত কমিউনিস্ট দেশগুলোর কমিউন সিস্টেমে এটা ছিলো। সেখানে একসঙ্গে ট্রাকটরে জমি চাষ, বুনন, মাড়াই এসব হতো। ফসল যেতো রাষ্ট্রীয় গুদামে। কিন্তু জিয়াউর রহমানের দলতো কোনো কমিউনিস্ট দল নয়। এটি একটি ওরস্যালাইন দল। এক চিমটে ভাসানী ন্যাপ, এক চিমটে রাজাকার, এক চিমটে মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে ঘুটাঘুটা বিএনপি! কিন্তু জমির আইল তোলার ডাক নিয়ে বিরোধিতা এলো বিএনপির ভেতর থেকে। দলের ভূস্বামীদের পক্ষ থেকে বলা হলো, বাংলাদেশের জমির আইল এমনিতে এতো চিকন যে কুকুরও ঠিকমতো হাঁটতে পাওে না। কাজেই আইল তুললেই খাদ্য উৎপাদন বেড়ে যাবে এটা ঠিক নয়। তাছাড়া আইল তুলতে গেলে গ্রামে যে খুনোখুনি শুরু হবে তা সামাল দেওয়া কঠিন হবে। জিয়াউর রহমানকে বোঝানো হলো তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। তার জনপ্রিয়তা নস্যাতের গভীর ষড়যন্ত্র! অতএব আঁতুড়ঘরেই সেই চিন্তাটির মৃত্যু হয়। এভাবে জমির আইলও উঠলোনা, ইতিহাসে স্থান পেতে জিয়াউর রহমানের ভূমি সংস্কারক হওয়াও হলো না। লেখক : অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সাংবাদিক। ফেসবুক থেকে

সর্বাধিক পঠিত