প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রথম দেশ হিসেবে বিটকয়েনে লেনদেন শুরু করল এল সালভাদর

রাশিদ রিয়াজ : বিশে^র প্রথম কোনো দেশ হিসেবে কয়েক মিলিয়ন ডলার বিটকয়েনে কিনল এল সালভাদর। বৈধ লেনদেন হিসেবে দেশটি ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েনকে বেছে নিল। এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নাইব বুকেলে গত সোমবার ঘোষণা দিয়ে বলেন তার সরকার আরো ২শ বিটকয়েন কিনেছে। দেশটির সরকারের কাছে বর্তমানে ৪’শ বিটকয়েন রয়েছে এবং বর্তমান বাজার দরে যার মূল্য ২১ মিলিয়ন ডলার। সর্বশেষ প্রতিটি বিটকয়েনের মূল্য দেড় শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ৪৮৬ ডলার। মূলত ক্রিপ্টোকারেন্সি অদৃশ্য মুদ্রা যা অটোমেশনের মাধ্যমে লেনদেন হয়। মঙ্গলবার থেকে বিটকয়েন এল সালভাদরে মার্কিন ডলারের পাশাপাশি বৈধ হিসেবে লেনদেন হচ্ছে। টুইটে প্রেসিডেন্ট প্রেসিডেন্ট নাইব বুকেলে ব্রোকারদের বিটকয়েন কেনার জন্যে উৎসাহ দিয়েছেন। এর আগে দেশটিতে রীতিমত আইন পাশ করে লেনদেনের জন্যে ক্রিপ্টোকারেন্সিকে বৈধ করার ব্যবস্থা করা হয়। ওই আইনে বিটকয়েনে কর দেওয়ারও সুযোগ রাখা হয়েছে। মধ্য আমেরিকার এ দেশটি এতদিন লেনদেন করত মার্কিন ডলারে। বর্তমানে সেখানে একমাত্র প্রচলিত মুদ্রার পাশাপাশি দ্বিতীয় বৈধ মুদ্রা হিসেবে দাঁড়াল বিটকয়েন। ক্রিপ্টোকারেন্সি চালুর প্রস্তাব প্রথন করেন দেশটির প্রেসিডেন্ট। তা বাস্তবায়িত করার মাধ্যমে বিশ্বের প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ডিজিটাল মুদ্রা বিটকয়েন চালুর ইতিহাস গড়ল এল সালভাদর।

প্র্রেসিডেন্ট নাইব বুকেলে এধরনের ঘোষণা দেন ‘বিটকয়েন ২০২১’ সম্মেলনে। ডিজিটাল ওয়ালেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান স্ট্রাইকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে বিটকয়েনের মাধ্যমে নিজ দেশের আধুনিক আর্থিক অবকাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেন তিনি। ধারণকৃত ভিডিওতে প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, বিটকয়েনকে বৈধ মুদ্রা হিসেবে প্রচলনের জন্য কংগ্রেসে বিল উত্থাপন করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামিতে গত ৪ ও ৫ জুন সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। বিটকয়েনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসে সেটাই সবচেয়ে বড় সম্মেলন হিসেবে বলা হচ্ছে। ওই সম্মেলনে ডিজিটাল মুদ্রা রাখার সেবা স্ট্রাইকের প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক মলার্স দাবি করেছিলেন, বিটকয়েনের রিজার্ভ উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোকে মুদ্রাস্ফীতির ধাক্কা সামলানোর একটি পথ করে দেবে। তবে এতদিন মার্কিন ডলার একচেটিয়া আন্তর্জাতিক লেনদেনের যে প্রতীক হয়েছিল সে আধিপত্য খর্ব হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। এল সালভাদরের বেশির ভাগ মানুষ নগদ অর্থে লেনদেন করে। সেখানে কমবেশি ৭০ শতাংশ মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা ক্রেডিট কার্ড নেই। দেশটির জিডিপির ২০ শতাংশ আসে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স থেকে। বিদেশ থেকে অর্থ আনতে গিয়েই যার ১০ শতাংশ পর্যন্ত খরচ পড়ে যায়। আর অর্থ হাতে পেতে সেখানে কয়েক দিন পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। সিএনবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমস্যা হলো, বিটকয়েনের বিপক্ষে কোনো সম্পদের মজুত না থাকায় তাতে পূর্ণ আস্থা রাখা কঠিন। এর পেছনে কোনো কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাও নেই। এর মূল্য ওঠানামায় বড় ভূমিকা রাখে দুষ্প্রাপ্যতা। কারণ সব মিলিয়ে বিটকয়েনের পরিমাণ মোটে ২ কোটি ১০ লাখ। তবে বিটকয়েনে লেনদেন বৈধ করতে নেতৃস্থানীয় কয়েকজনকে নিয়ে দল গঠন করে দেশটি নতুন আর্থিক ব্যবস্থা গঠনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। বিটকয়েন নিয়ে এল সালভাদরের এটাই প্রথম বড় উদ্যোগ নয়। গত মার্চে সেখানে মুঠোফোন অ্যাপ চালু করে স্ট্রাইক। দ্রুত দেশটির সবচেয়ে বেশি নামানো অ্যাপের তালিকায় উঠে যায় সেটি। এল সালভেদরের কংগ্রেসে এক ভোটাভুটিতে বিটকয়েনকে আনুষ্ঠানিক মুদ্রার স্বীকৃতি দেয়া হয়। এই নতুন আইনের ফলে দেশটির সব আর্থিক লেন-দেনে এখন বিটকয়েনকে বৈধ মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে, তবে যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিটকয়েনে লেন-দেনের প্রযুক্তি নেই তারা ছাড়া।

প্রেসিডেন্ট নাইব বুকেলে বলেছেন এল সালভাদরের যেসব মানুষ প্রবাসে থাকেন এবং দেশে অর্থ পাঠান, তাদের পক্ষে এখন কাজটা অনেক সহজ হবে। এল সালভাদরের বহু মানুষ তাদের প্রবাসে থাকা আত্মীয়-স্বজনের পাঠানো রেমিটেন্স বা অর্থের উপর নির্ভরশীল। দেশটির জিডিপির প্রায় ২০ শতাংশ আসে রেমিটেন্স থেকে। এল সালভাদরের প্রায় ২০ লাখ মানুষ বিদেশে থাকেন। কিন্তু মাতৃভূমির সঙ্গে তাদের রয়েছে বেশ ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ, বছরে তারা দেশে পাঠান প্রায় চার বিলিয়ন বা চারশো কোটি মার্কিন ডলার। কোন লোক যখন প্রবাস থেকে তার নিজ দেশে রেমিট্যান্স পাঠান, সাধারণত তারা একটি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেন এই লেনদেনের কাজে। কিন্তু এরকম কোন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে টাকা পাঠানোর একটা খরচ আছে। এক দেশ থেকে আরেক দেশে টাকা পাঠানোর জন্য তাদেরকে একটা কমিশন দিতে হয়। যেমন কেউ যদি যুক্তরাষ্ট্র থেকে এক হাজার ডলার পাঠাতে চান এবং সেখানে যদি শূন্য কমিশনে অর্থ পাঠানোর সুযোগও থাকে, তারপরও বাস্তবে গ্রাহকদেরকে অনেক ধরনের ফি দিতে হয়। দুইদেশের ব্যাংকগুলো এই ফি নেয়। কিন্তু বিটকয়েনের ক্ষেত্রে তা লাগবে না।

প্রেসিডেন্ট নাইব বলেছেন নতুন অ্যাপ ‘চিভো ওয়ালেট’এর মাধ্যমে ৩০ ডলার মূল্যের সমপরিমান বিটকয়েন মানুষকে দেওয়া হবে যাতে তারা বিটকয়েনে লেনেদেনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। গত এপ্রিলে বিটকয়েনের মূল্য সর্বোচ্চ ৬৫ হাজার ডলারে উঠে যায়। এরপর এর দরপতনে প্রায় অর্ধেক মূল্য খোয়া যায়। এল সালভাদরে অনেক অবসরপ্রাপ্তরা বিটকয়েন সম্পর্কে পরিস্কার ধারণা নেই বলে তারা ভীত বলে জানান। তবে দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে বিটকয়েনে লেনদেন বাধ্যতামূলক নয়। লসএ্যাঞ্জেলস টাইমের এক প্রবন্ধে বিটকয়েন চালুর জন্যে প্রেসিডেন্ট নাইবের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র নস্যাতের অভিযোগ তোলা হয়েছে।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত