প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহাতাব: ‘বাকশাল’ কখনোই একদলীয় শাসন ছিলো না

অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহাতাব: বঙ্গবন্ধুর শাসনকালকে মিথ্যেভাবে উপস্থাপন করায়’ পঁচাত্তরের পর থেকে অবারিত গোয়েবলসীয় যে প্রচারণা চলছিলো তার অন্যতম লক্ষ্যবস্তু ছিলো বাকশাল। এমনকি আমরা যারা কোনোকিছু প্রাপ্তির প্রত্যাশা ছাড়াই’ নব্বইয়ের দশকে ছাত্রলীগের প্রগতিশীল রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম, আওয়ামী লীগ কোনোদিনও ক্ষমতায় আসবে না, এ বাস্তবতা মেনে নিয়েই যারা সে সময় অনেক ক্ষেত্রেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছাত্র রাজনীতি করেছি, এমনকি তারাও ‘বাকশাল’ প্রসঙ্গটা এলেই কেমন যেন একটু ব্যাকফুটে চলে যেতাম। অবচেতনে আমাদের চেতনায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিলো বাকশাল হচ্ছে নিষিদ্ধ আর অশুদ্ধের প্রতিশব্দ বৈ অন্যকিছু না। বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব হুট করে পাওয়া কোনো কনসেপ্ট ছিলো না।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন সেই রাষ্ট্রনায়ক যিনি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র আর ধর্মনিরপেক্ষতাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। তাঁর গণতন্ত্র ছিলো আব্রাহাম লিংকনের ‘ফর দ্য পিপল, অব দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল’ থেকে ভিন্নতর। তিনি ‘শোষিতের গণতন্ত্রের’ কথা বলেছিলেন। একইভাবে তাঁর ধর্মনিরপেক্ষতা লেনিন কিংবা কামাল আতাতুর্কের ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে একেবারেই আলাদা। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে প্রত্যেক নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা ছিলো। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, তিনি প্রথমে মানুষ, তারপর বাঙালি এবং তারপর মুসলমান। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে ধর্ম ছিলো সবখানেই, ছিলো না শুধু সংবিধানে আর রাজনীতিতে। একইভাবে সমাজতন্ত্রকেও বঙ্গবন্ধু সংজ্ঞায়িত করেছিলেন আমাদের মাটি আর মানুষের মতো করে, যার নাম ‘মুজিববাদ’। বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেছিলেন, ‘বিদেশ থেকে হাওলাত করে এনে সমাজতন্ত্র হয় না।’ এ বিষয়ে তাঁর ধারণা ছিলো অত্যন্ত স্বচ্ছ। তিনি বলতেন এবং বিশ্বাস করতেন যে, দেশের আবহাওয়া, বিরাজমান পরিস্থিতি, মানুষের মনোভাব, আর্থিক অবস্থা, কৃষ্টি ইত্যাদিকে বিবেচনায় নিয়েই ধাপে ধাপে সমাজতন্ত্র কায়েম করতে হবে।

মুজিববাদ প্রসূত যে ‘বাকশাল’ তা কখনোই একদলীয় শাসন ছিলো না। বাকশালে সবাইকে আওয়ামী লীগের আত্তীকৃত করা হয়নি, বরং আওয়ামী লীগই বিলুপ্ত হয়েছিলো বাকশালে। একটি জাতীয় চার মূলনীতি আর একাত্তরের চেতনায় বিশ্বাসী সব অসাম্প্রদায়িক শক্তির কমন প্ল্যাটফর্ম ছিলো বাকশাল। তবে যারা বাংলাদেশে বিশ্বাস করেনি তাদের কোনো জায়গা বাকশালে ছিলো না। বাকশালের বাংলাদেশে বাঙালির উদারতায় তাদের এদেশে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার অধিকার হরণ করা হয়নি ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশই চায়নি সেসব কুলাঙ্গারকে যাদের বাংলাদেশের শাসনক্ষমতা আর ভবিতব্য নির্ধারণের জায়গা থেকে শত কিলোমিটার দূরে রাখাটা নিশ্চিত করেছিলো বাকশাল। বাকশালে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে হরণ করা হয়নি। একইভাবে হরণ করা হয়নি মানুষের ভোটাধিকারও। বাকশাল ব্যবস্থায় নির্বাচনে রাষ্ট্রই স্বাধীনতার সপক্ষ প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারে ব্যবস্থা করত। ছিলো না টাকার খেলা, ছিলো না প্রভাব বিস্তারের প্রয়োজন। নির্বাচনে যেই জিতুক না কেন, জিতত বাংলাদেশ। আর যাইহোক বাংলাদেশ বিরোধী কারও নির্বাচনে জেতা তো দূরে থাক, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করারই সুযোগ ছিলো না। আর এমনি নির্বাচনে বৃহত্তর ময়মনসিংহে একজন প্রাইমারী স্কুল শিক্ষকের কাছে ডাকসাইটে কেবিনেট মন্ত্রীর ভাইয়ের পরাজিত হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছিলো।

প্রশাসনকে বাকশালের আওতায় একদম মাঠ পর্যায় পর্যন্ত বিকেন্দ্রীকৃত করা হয়েছিলো। প্রতিটি থানায় গঠন করা হয়েছিলো একটি করে থানা কাউন্সিল। এই কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হওয়ার কথা ছিলো সরকারী কর্মকর্তা কিংবা সংসদ সদস্য নন এমন রাজনৈতিক কর্মীদের। সদস্য হওয়ার কথা ছিলো বিভিন্ন সরকারী দফতরের কর্মকর্তা আর সঙ্গে বাকশালের প্রতিনিধিদের। সঙ্গে থাকার কথা ছিলো যুবক আর কৃষক প্রতিনিধিও। মহকুমাগুলোকে জেলার মর্যাদায় উন্নীত করে একেকটি এ্যাডমেনিস্ট্রেটিভ ইউনিট হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ছিলো বাকশালে, যার প্রধান হওয়ার কথা ছিলো একজন গবর্ণরের। এসব জেলা এ্যাডমেনিস্ট্রেটিভ কাউন্সিলের হাতে টেস্ট রিলিফ, লোন, সেচ প্রকল্প ইত্যাদি তদারকি ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব হস্তান্তরের পরিকল্পনা ছিলো। বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশাতেই ৬১টির মধ্যে ৬০টি জেলায় গবর্ণর নিয়োগ দেওয়া হয় এবং তাদের জন্য ট্রেনিংয়েরও ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। আজকের বাস্তবতায় বাকশাল বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।

তবে দ্বিতীয় বিপ্লবের আদর্শের ওপর আগামী দিনের বাংলাদেশকে দাঁড় করাতে না পারলে ভিশন ২০৪১-এর বাংলাদেশের ভিত্তিটা নড়বড়েই থেকে যাবে। এর বড় প্রমাণ আমরা দেখেছি বছরের শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটলে, যেখানে হাজার খানেক উগ্র সাদা মানুষ প্রায় মাটিতে নামিয়ে এনেছিলো মার্কিনীদের গর্বের দুইশ বছরের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যকে। আগামীর বাংলাদেশটা গড়তে হবে বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের আদলেই, যে বাংলাদেশটা হবে অসাম্প্রদায়িক, বাঙালিত্বে বিশ্বাসী বাঙালিদের। যারা এর বাহিরে তারাও থাকতে পারে, তবে তারা এমনভাবে থাকবে যেন তারা কখনও ক্ষমতার মসনদে বসে বাংলাদেশের ঘড়ির কাঁটাকে আবার পিছনে ঘুরিয়ে দেওয়ার দুঃসাহস দেখাতে না পারে। গণতান্ত্রিক জার্মানিতে যদি হিটলারের অনুসারীদের আজও রাজনীতি করার অধিকার না থাকে তবে এটুকু বোধ হয় খুব বেশি কিছু চাওয়া নয়।
লেখক : চেয়ারম্যান, ‘ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশন’, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

 

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত