প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

হাসান মোরশেদ: পরাজিতরা কি সারাজীবন ধরে মিথ্যাচার, ইতিহাস বিকৃতি আর অপরের কৃতিত্ব ছিনতাই করেই টিকে থাকার চেষ্টা করবে?

হাসান মোরশেদ: ‘বিএনপির স্বাধীনতা সূবর্ণজয়ন্তী উদযাপন জাতীয় কমিটির উদ্যোগে ‘২৮ আগস্ট ১৯৭১: জিয়াউর রহমান কর্তৃক রৌমারীতে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রথম বেসামরিক প্রশাসনের উদ্বোধন’ শীর্ষক এই ভার্চুয়াল আলোচনা সভা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দলের ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম বলেন, রৌমারী মুক্তিযুদ্ধের একটি গৌরবময় ইতিহাস, আমাদের গর্বের স্থান। জেড ফোর্সের অধীনে এই অঞ্চলটি ছিলো স্বাধীন দেশের মুক্তাঞ্চল। ২৮ আগস্ট আমাদের জেড ফোর্সের কমান্ডার জিয়াউর রহমান সেখানে বেসামরিক প্রশাসনের উদ্বোধন করেন। জিয়াউর রহমান কেবলমাত্র একজন সমর নায়কই ছিলেন না। কীভাবে বেসামরিক প্রশাসন চালাতে হবে একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন তিনি রৌমারীতে।’ মেজর(অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের লেখা বই ‘রক্তে ভেজা একাত্তর’, প্রথম প্রকাশ ১৯৯৭।

সেই বইয়ে হাফিজ জানিয়েছেন ১ম ইস্ট বেঙ্গলকে নিয়ে যশোর থেকে বিদ্রোহ করে পেট্রাপোলে এসে অবস্থানরত অবস্থায় মে মাসের শেষের দিকে তাঁর উপর মুজিব নগর থেকে নির্দেশ আসে আরও ৬০০ তরুণকে রিক্রুট করে প্রথম ইস্ট বেঙ্গলকে পূর্ণাঙ্গ ব্যাটেলিয়নে রূপান্তর করে তাকে যেতে হবে দূরবর্তী এক জায়গায়। নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাটেলিয়ন প্রস্তুত করে তিনি মেঘালয়ের গারো পাহাড়ের তেলঢালায় গিয়ে পৌঁছান। এদিকে তৃতীয় ও অষ্টম বেঙ্গল নিয়ে তেলঢালা পৌঁছান- এই দুই ব্যাটালিয়নের কমান্ডার মেজর শাফায়াত জামিল ও ক্যাপ্টেন আমিনুল হক। এই তিন ব্যাটালিয়ন তেলঢালা পৌঁছার চারদিন পর উপস্থিত হন মেজর জিয়া- ব্যাটালিয়ন তিনটি নিয়ে নব গঠিত জেড ফোর্সের কমান্ডার। ৩১ জুলাই শেষ রাতে এই ফোর্স কামালপুর যুদ্ধের সুচনা করে। তাহলে জেডফোর্স রৌমারি গেলো কবে?

হাফিজ উদ্দিন জানাচ্ছেন কামালপুর যুদ্ধের ঠিক আগে আগে- ‘স্থির হলো আমি ও সালাহউদ্দিন মমতাজ রৌমারী এলাকায় যাবো মুক্তাঞ্চল পরিদর্শনে। মানকা চর হয়ে সীমান্ত পেরুলে নৌপথে রৌমারী বেশী দূর নয়, লঞ্চে গেলে ঘন্টাতিনেক লাগে। পরদিন আমরা দুজন রৌমারীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম, সঙ্গে পাঁচজন জোয়ান। সীমান্ত পেরিয়ে একটা ছোট লঞ্চযোগে ঘন্টাচারেক পর রৌমারীতে পৌঁছালাম। পাকবাহিনী এখনো এখানে আসেনি। মুক্ত এলাকায় প্রবেশ করেই স্বাধীনতার সুবাস পেলাম। রৌমারীর ঘরে ঘরে বাংলাদেশের পতাকা। পুলিশ, ছাত্র, যুবকরা সব সামরিক কায়দায় মার্চ করে চলেছে। আমাদের স্থানীয় জনসাধারণ বিপুল উৎসাহে স্বাগত জানালেন। সুবেদার আফতাব নামে ইষ্ট বেঙ্গলের একজন জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্যায় থেকে এ অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করে বিশাল এক এলাকা জুড়ে তৎপরতা চালাচ্ছে’ হাফিজ সাহেব এখন রৌমারীতে জিয়াউর রহমানের বেসামরিক প্রশাসন চালু বিষয়ে যে উচ্ছ্বসিত কথা বলছেন, ২০০৭ এ তাঁর প্রকাশিত বইয়ে এ বিষয়ে এক লাইনও নেই! বেসামরিক প্রশাসন বিষয়ে লিখেছেন তৃতীয় বেঙ্গলের কমান্ডিং অফিসার মেজর শাফায়াত জামিল তাঁর বই ‘মুক্তির জন্য যুদ্ধ’- এ। দেখা যাক কী লিখেছেন- ‘রৌমারিতে বাংলাদেশের প্রথম প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এ সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

লে.নবী ওই এলাকায় প্রয়োজনের তাগিদে একটি বেসামরিক প্রশাসন গড়ে তোলে। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদেরকে নিয়ে নবী একটি ‘নগর কমিটি’ গঠন করে। নবী রৌমারীতে কাস্টমস অফিস, থানা, স্কুল এবং পোস্ট অফিসের জন্য কাজ শুরু করেছি। ১০ শয্যার একটি হাসপাতালও চালু করে সে। কর্ণেল জিয়া ২৮ আগস্ট সকাল আটটায় রৌমারীতে মুক্ত বাংলাদেশের প্রথম পোস্ট অফিসের উদ্বোধন করেন। এরপর আরও কয়েকটি অফিস উদ্বোধন করেন তিনি। বেসামরিক প্রশাসনের পাশাপাশি লে.নবী রৌমারী সদরে একটি বড় সামরিক ট্রেনিং একাডেমিও স্থাপন করে’ তো এই হলো রৌমারী মুক্তাঞ্চলে বেসামরিক প্রশাসন স্থাপনে কর্ণেল জিয়ার অবদান!

২৫ মার্চ রাতে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার দুদিন পর ২৭ মার্চ একটি দুর্বল ফ্রিকোয়েন্সির রেডিও স্টেশনে পঞ্চম ব্যক্তি হিসেবে বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠকে যেমন বিএনপি মিথ্যাচার করে ’ ২৬ মার্চে স্বাধীনতার ঘোষণার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করেন’ বলে প্রচার করে এসেছে বহুবছর ধরে, তেমনি রৌমারী মুক্তাঞ্চলে একটি পোস্ট অফিস ও কয়েকটি অফিস উদ্বোধনকেও তেমনি ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রচার শুরু করেছে। রৌমারী মুক্তাঞ্চলের কৃতিত্ব সুবেদার আফতাব ও রৌমারীর স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের। বেসামরিক প্রশাসন স্থাপনের কৃতিত্ব ল্যাফটেনেন্ট নুরন্নবী বীরবিক্রমের। লুজাররা কি সারাজীবন ধরে মিথ্যাচার, ইতিহাস বিকৃতি আর অপরের কৃতিত্ব ছিনতাই করেই টিকে থাকার চেষ্টা করবে? লেখক ও গবেষক

সর্বাধিক পঠিত