প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জান্নাতুন নাঈম প্রীতি: বাংলা সাহিত্যের ‘ছোটগল্পের রাজপুত্র’ হাসান আজিজুল হক সেরে উঠুন

জান্নাতুন নাঈম প্রীতি: আমার দুইজন বন্ধু অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের বিছানায় পড়ে আছেন, একজন হেলাল হাফিজ, অন্যজন হাসান আজিজুল হক। আমার আংকেল হাসান আজিজুল হকের থেকে গতকাল বিদায় নিতে গিয়ে বললাম- তুমি অবশ্যই সেরে উঠবে, আমাদের দেশ বিদেশ ঘুরতে হবে না? তিনি ভয়ংকর ব্যথা চেপে হেসে বললেন- যাবো! মানুষ জীবনে নানারকম বন্ধু পায়, আমি পেয়েছি হাসান আজিজুল হককে পেয়েছি এমন বন্ধুরূপে যিনি বিপদে কখনো হাত ছাড়েন না। আমার মাথার ওপর মামলা চলছে, আমাদের ‘আগুনপাখি’টি কপট রাগী চেহারায় বললেন- আবার কী অঘটন ঘটালি? আমি মিনমিন করে বললাম- ইয়ে মানে, তেমন কিছু না। একটা মামলা! তিনি বুড়োদের মতো উপদেশ দিলেন না। বললেন- বাক স্বাধীনতার জন্য লড়াই করবি ভালো কথা। কিন্তু লড়াইয়ে প্রাণ হারিয়ে ফেললে কী হবে? একদম ছোটবেলা থেকে আমার পড়ার খবর নিতেন তিনি, জিজ্ঞেস করতেন- নতুন কোন বই পড়ছিস? এইতো সেদিন- তাঁর অনুবাদ করা পঞ্চাশ বছর আগের ‘গ্রেপস অফ র‌্যাথ’- এর হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজগুলি হাতে তুলে দিলেন, দিয়ে বললেন- যত্নে রাখিস! আমি কথা দিলাম- আমার মৃত্যুর পরে ওগুলো পাবে কোনো এক আগ্রহী জাদুঘর! মরার আগে কাছ ছাড়া করছি না!

শেষ উপহার দিয়েছেন আহমদ ছফা ‘গাভী বিত্তান্ত’র যে কপি উপহার দিয়েছিলেন তাঁকে। আমি জিজ্ঞেস করলাম- এটাতো ছফার উপহার। তিনি বললেন- আমার তোকে দেয়া উপহার। তুই বুড়ো হলে আর কাউকে দিস। সেই যে আমি চারুকলায় পড়বো। তিনি বললেন- খুবই খাটুনির পড়া। কিন্তু তুই পারবি। সত্যিই কেমন করে যেন পেরে গেলাম।

ক্লাস এইটে আমি দস্তয়েভস্কির ‘নোটস ফ্রম আন্ডারগ্রাউন্ড’ পড়ছি, তিনি বললেন- এরপর পড়বি ‘দ্যা ইডিয়ট’, তারপর ‘ইস্পাত’। একবার একটা পরীক্ষা করলেন তিনি, ‘সোফির জগৎ’ বইটা খুলে বললেন- দেখি এই বই কতোদূর পড়েছিস? একবার জিজ্ঞেস করলেন- পিরামিডের পাথরগুলো কেমন করে অত্ত উঁচুতে গেলো? এইসব প্রশ্ন করতে করতে আমার নাম তাঁর কাছে হয়ে গেলো- ক্ষুদে এনসাইক্লোপিডিয়া। আমাদের দুইজনেরই সম্ভবত সবচেয়ে প্রিয় লেখক সাদাত হাসান মান্টো, এডগার এলান পো আর আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। হেমিংওয়ের গল্প অনুবাদ করতে গিয়ে হাতে লেখা কাগজ থেকে প্রায়ই তিনি পড়ে শোনাতেন- ব্রিজের ধারের সেই বৃদ্ধর কথা, যার কাছে জীবনটা অর্থহীনভাবে অর্থপূর্ণ। যে কবিতাগুলো অনুবাদ করেছেন, প্রতিটা আমার প্রিয় কবিতা। আমার সংগ্রহের অসংখ্য বই উপহার দিয়েছেন তিনি, আমার বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন, আবার নিজের বইয়ের ভেতর লিখেছেন- পাঠ প্রতিক্রিয়া জানাবি। সেই অটোগ্রাফ দেখে হিংসেয় জ্বলেপুড়ে অনেককেই বলতে শুনেছি- প্রীতি কি পাঠ প্রতিক্রিয়া লেখে নাকি? এক সপ্তাহ আগেই একজন সাক্ষাতকার নিতে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন- কোন লেখকের সঙ্গে জীবনের সবচেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছেন? আমি উত্তর দিলাম- হাসান আজিজুল হক।

আমাদের বাংলা সাহিত্যের ‘ছোটগল্পের রাজপুত্র’, তিনি সেরে উঠুন। তিনি জেনে রাখুন- আমি জীবনে একজন লেখকের প্রতিকৃতিই এঁকেছি। ভুল প্রমাণ করেছি আমাদের প্রিয় লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘লেখকেরা দীর্ঘদিন বন্ধু থাকতে পারে না’- বিষয়ক বাণী। হাফিজ আম খেতে চেয়েছিলো, করোনার কারণে তাঁকে বলেছিলাম আমসত্ব হলে চলবে? হেলাল হাফিজ বলেছে- তুই এলেই চলবে! হাসান আজিজুল হক বলেছেন- অসমাপ্ত উপন্যাসটা শেষ করতে চান। নিজের আয়ু যদি দিয়ে দেয়া সম্ভব হতো তাহলে এই দুইজনকে খানিকটা ভাগ করে দিয়ে দিতাম আর বলতাম সেই ইচ্ছের কথা, যেটা দুজনের কাউকেই বলিনি। পদ্মার পাড়ে বসে এই দুজনকে নিয়ে একটু আড্ডা দিবো। ছোট্ট জীবনে এইটুকু চাওয়া কি খুব বেশি কিছু? ফেসবুক থেকে

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত