প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দীপক চৌধুরী: তালেবান নিয়ে এদেশে উস্কানীমূলক ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে কেন?

দীপক চৌধুরী: কাবুল বিমানবন্দরে থেমে থেমে গোলাগুলি চলছে। গোলাগুলিতে নিহত-আহত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যেরকম নিরাপত্তার থাকার কথা তা নেই। কাবুলের আকাশে মার্কিন সশস্ত্র যুদ্ধবিমানের চক্কর দিচ্ছে। মার্কিন যুদ্ধবিমান কাবুল শহরের নিরাপত্তা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে। আফগানিস্তান থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের যে অভিযান অব্যাহত আছে, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই কাবুলের আকাশে মার্কিন যুদ্ধবিমান উড়ছে বলে পেন্টাগনের পক্ষ থেকে জানানো হয়। সম্প্রতি পেন্টাগনের মুখপাত্র জন কিরবি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো কাবুল শহরের নিরাপত্তা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে। কিরবি বলেন, আমরা তালেবানের কাছে এ বিষয় একদম স্পষ্ট করে দিয়েছি যে বিমানবন্দরে আমাদের অভিযানকে ঘিরে আমাদের লোকজনের ওপর কোনো হামলা হলে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে। ১৫ আগস্ট থেকেই এ অবস্থা। আফগানিস্তান অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে। বিমানবন্দরের আশপাশে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে লেগে গেল যানজট। কেউ জানালা দিয়ে, কেউ বা বিমানের চাকা ধরে। সবাই ছুটছে বিমানবন্দরে। দেশ ছেড়ে পালাতে চায় তারা। নিজের দেশ ছেড়ে কেউ কী এভাবে পালায়? কারণ, তারা ভয়ংকর দুশ্চিন্তায়। মানুষ যখন ভাবে এদেশ নিরোপদ নয় তখনই প্রাণ নিয়ে পালায়। যে যেভাবে পারছে, পালাচ্ছে। পাকিস্তান সীমান্তে তৈরি হয়েছে অদ্ভুত অবস্থা। হাজার হাজার মানুষ সীমান্ত পথে চাইছেন দেশ ছাড়তে। এটাই বিদেশি টিভিচ্যানেলের খবরে দেখা যাচ্ছে। অবশ্য বাংলাদেশে কিছু ভিডিওতে তালেবানের বিজয়কে পুঁজি করে জনবিভ্রান্তিকর মিথ্যাশ্রয়ী বক্তব্য দেখা যাচ্ছে। উস্কানীমূলক ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে। অবশ্যই বিষয়টি অতি গুরুত্বসহকারে গোয়েন্দাদের পর্যবেক্ষণ ও অ্যাকশন নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী উস্কানীদাতাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনা দরকার।

চরম অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা পুরো আফগানিস্তান ঘিরে। আর এর প্রথম স্বীকার হচ্ছেন নারীরা। তাদের নানারকম আশঙ্কা ও উদ্বেগ। কদিন আগেও কাবুল শহরে যে প্রাণ ছিল, এখন সেখানে আতঙ্কের জনপদ! খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক বন্ধ। কিছু সময়ের জন্য প্রতিদিন দোকানপাট খোলে। দরকারি কেনাকাটা করে আবার যে যার ঘরে। এর মধ্যে জিনিসপত্রের দামও আকাশছোঁয়া। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি, রয়টার্স, দ্য ইকোনমিস্ট, গান্ধারা, হাইপার অ্যালার্জিক ও আওয়া ওয়েবসাইটসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য থেকে জানা যায়, রোববার পর্যন্ত কাবুল বিমানবন্দরে সাতজন আফগানের মৃত্যু হয়। হুড়োহুড়িতে তঁদের মৃত্যু হয় । সামরিক জোট ন্যাটোর এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রয়টার্স বলেছে, আজকের গোলাগুলিতে নিহতের ঘটনা বাদে ১৫ আগস্টের পর থেকে কাবুল বিমানবন্দরে মারা গেছে মোট ২০ জন। বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীতে বিভক্ত আফগানিস্তান। তালেবান মূলত একটি পশতু জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। এর বাইরে তাজিক, উজবেক, হাজারাসহ নানা জাতিগোষ্ঠী রয়েছে এবং এসব জাতিগোষ্ঠীর অঞ্চলভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ফলে সবার সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতা ছাড়া তালেবানের পক্ষে আফগানিস্তানের ওপর পুরো নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করা অসম্ভব। তালেবানরা সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত। এখন নাকি এমনও কথা উঠেছে যে, কুয়োর মধ্যে ব্যাঙ বসে থেকে যদি মনে করা হয় সবকিছু পেয়ে গেছি তাহলে বিরাট ভুল হবে।

নারী ফুটবলাররা হতাশ। শুধু নারী ফুটবলার নয়। নারীর জন্য বিপদ সেখানে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সব ছবি সরিয়ে ফেরেছে নারী ফুটবলাররা। খেলার বুট, জার্সি পুড়িয়ে ফেলেছে। তালেবান নৃশংসতার উদ্বেগে নারীরা। নারী রাজনীতিক, সংস্কৃতকর্মী, নারী শিল্পী, নারী ফুটবলার, সাধারণ নারী, শিশু ও সংখ্যালঘুরা জানেন কী ভয়ংকর পরিণতি অপেক্ষা করছে সামনে। আতঙ্ক আর উদ্বেগ সর্বত্র। আফগানিস্তানের মানুষের হয়েছে উভয়সংকট দশা। অনেকেই আতঙ্কিত এ কারণে যে দেশটার দখল নিল তালেবান! তারা কী নিষ্ঠুর। শান্তিতে থাকতে দেবে কী? বিশ^বাসী জানে, তালেবানরা বর্বর ও পশ্চাৎপদ হিসেবে অভিযুক্ত। আধুনিক চিন্তার দুনিয়ায় ও আধুনিক বিজ্ঞানের এ সময়ে তালেবানের এমন উত্থানে বিশে^র নেতারাও চিন্তিত। এখন তালিকা ধরে ধরে আফগানদের খোঁজা হচ্ছে। তালেবানযোদ্ধাদের এমন আচরণে আফগানরা বিস্মিত নন। কারণ, এটাই তাদের চরিত্র। তাদের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে নারীবিদ্বেষ। আফগান নারী ও কিশোরীদের নিয়ে; তাদের শিক্ষা, চাকরি ও চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন বিশে^র বিভিন্ন দেশ। আফগানিস্তানজুড়ে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের ও কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও ঊনিশটি দেশ।

নব্বইয়ের দশকে তালেবান যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল, তখন নানাভাবে মানুষের ওপর নির্যাতন, হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। বিশেষত নারীদের তো তারা মানুষই গণ্য করেনি। তালেবান শাসনের ভীতিকর সেসব স্মৃতি এখন আফগানদের ভিতর। আফগানিস্তানের মানুষের ভয়, আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে তা বলার বাইরে। বিশে^র বিভিন্ন গণমাধ্যমে আফগানদের আকুঁতি ফুটে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতি শিল্পী–সাহিত্যিকদের জন্য ‘আর্টিস্ট ভিসা’ চালু করারও আহ্বান জানান হয়েছে। এ ছাড়া নারী, শিশু, আদিবাসী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্যও আলাদা ভিসা চালু করার অনুরোধ করেছেন আফগান সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো। সে দেশের বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা সাহরা কারিমি। তিনি সুপরিচিত তাই এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। তাদের এ উদ্বেগ যুক্তিসংগত। কারণ, তালেবানদের অতীত আদর্শের সঙ্গে বর্তমানের কী কোনো তফাৎ আছে। আফগানিস্তানের মানুষ কোনোভাবেই আশ্বস্ত হচ্ছে না। তালেবানের হাক্কানি নেটওয়ার্ক অতি ‘ভয়ংকর’ বলেই মনে করেন আফগানরা।

তালেবান কর্তৃক কাবুল দখলের পর আফগানিস্তানে সরকার গঠন নিয়ে ১৮ আগস্ট সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন হাক্কানি নেটওয়ার্কের নেতা আনাস হাক্কানি। কাবুলের পতনের মধ্য দিয়ে বদলে গেছে দেশটির চরিত্রসহ বদলে যাচ্ছে অনেক সমীকরণ। স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও । সরকার গঠনে দেশটিতে তালেবানের শাসনকাঠামো কেমন হবে, তা আলোচনা করতে কাবুলে হাজির হয়েছেন হাক্কানি সংগঠনটির অনেক নেতা। পশ্চিমা বিশ্বের চোখে ভয়ংকর হাক্কানি নেটওয়ার্কের প্রতিনিধিদেরও। এই হাক্কানি নেটওয়ার্কই তালেবানের নতুন সরকার গঠনে বড় ভূমিকা রাখবে বলে চলতি সপ্তাতে কাবুলে তাদের প্রতিনিধির উপস্থিতি এমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকরেব হাক্কানিরা। তাদের কথা চোখের সামনে এলেই উঠে আসে গোষ্ঠীটির নৃশংসতা ও নিষ্ঠুরতার ইতিহাস। হাক্কানি নেটওয়ার্কের শুরু জালালুদ্দিন হাক্কানির হাত ধরে। সংগঠনের নাম পরিচিতি পায় গত শতকের আশির দশকে আফগানিস্তানে। সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন তিনি। একই সময় চলছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ। দেশটিতে সোভিয়েতের বিরুদ্ধে লড়তে তৎকালীন সেই সময় মুজাহিদিনদের নানা রসদ জোগায় মার্কিন মিত্র পাকিস্তানও। মুজাহিদিন যোদ্ধাদের অর্থ আর অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে যুক্তরাষ্ট্র এবং মিত্ররা। নিজ স্বার্থ উদ্ধারের কাজে সে সময় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইয়ের কাছে মূল্যবান হয়ে উঠছিলেন জালালুদ্দিন হাক্কানি। তালেবানের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আফগানরা যারা পরিচিত, তারা হাক্কানি নেটওয়ার্ক সম্পর্কেও কমবেশি জানেন। কী অভিযোগ নেই তাদের বিরুদ্ধে? আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই, বেসামরিক লোকজন, সরকারি কর্মকর্তা ও বিদেশি সেনাসদস্যদের হত্যা থেকে শুরু করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। শোনা যায়, হত্যা আর রক্তারক্তির ইতিহাসে হাক্কানির জায়গা কেউ পূরণ করতে পারেনি।

লেখক : উপসম্পাদক, আমাদের অর্থনীতি, সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

 

সর্বাধিক পঠিত