প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

যায়নুদ্দিন সানী: তালেবান টু পয়েন্ট ও বিগ্যান

যায়নুদ্দিন সানী: আনুষ্ঠানিকভাবে তালিবান টু পয়েন্ট ও তার যাত্রা শুরু করে দিয়েছে। ফেসবুকে এই মুহূর্তে কমবেশি সবাই, তালেবান নিয়ে নিজ নিজ মতামত জানাচ্ছে। যারা তালেবানদের এই বিজয়ে খুশি, তাঁরা আসলে খুশি আমেরিকা হেরেছে বলে। আর যারা তালেবান বিজয়ে বেজার, তাঁরা আসলে বেজার তালেবানদের অতীত নিয়ে। তালেবানদের প্রথম ইনিংসে তাঁরা নারীদের সাথে যে ব্যবহার করেছিল, তার পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে, এই ভেবে তাঁরা নাখোশ।

তবে রিয়েলিটি হচ্ছে, আপনার আমার ভালো লাগা বা খারাপ লাগা দিয়ে তালেবানদের কিছু যায় আসে না। তারপরও, কমবেশি আমরা সবাই তালেবানদের খবর রাখছি। টেলিভিশানের সামনে বসে আপডেট দেখছি। আর বুদ্ধিজীবীদের মতো ভবিষ্যৎ বাণী কপচাচ্ছি। কেউ দেশটাকে স্টোন এজে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। আর কেউ অপটিমিস্টিক হচ্ছেন।

ওদিকে বাইডেন সাহেব নিজেকে ডিফেন্ড করেই যাচ্ছেন। ‘ওখান থেকে সৈন্য ফিরিয়ে এনে ঠিক কাজই করেছি’। এই ব্যাপারে পলিটিক্যাল অ্যানালিস্টরা যা ভাবছেন, তা হচ্ছে, এই অপমান বা অসম্মান যে হবে, সেটা বাইডেন জানতেন। সেটা মেনে নিয়েই তিনি কাজটা করছেন। এটা তাঁর লিগেসির অংশ হতে যাচ্ছে, এটাও তাঁর অজানা না। আরে এখানেই আমার কেন যেন সন্দেহ জাগছে। কেন যেন মনে হচ্ছে, পর্দার পেছনে কিছু একটা ঘটিয়েছে আমেরিকা। এই মুহূর্তে পরিষ্কার বোঝা না গেলেও, অচিরেই স্পষ্ট হয়ে যাবে।

ইয়টিউবের কল্যাণে, নতুন তালেবান সরকারের সদস্যদের সাথে পরিচয় ইতোমধ্যেই অনেকের হয়ে গেছে। সবাই জেনে গেছি, প্রেসিডেন্ট হয়েছেন মোল্লা আব্দুল ঘানি বারাদার। কমবেশি সবাই এটাও জেনে গেছি, মোল্লা ওমরের সঙ্গে তিনি ছিলেন তালেবান সংগঠনটির কো-ফাউন্ডার। ১৯৯৪-৯৫ সালের দিকে সৃষ্টি হওয়া এই সংগঠনটির নেতা মোল্লা ওমর মারা যান ২০১৩-তে। বয়স তাঁর তখন ৬০-এর কাছাকাছি। কীভাবে মারা যান, স্পষ্টভাবে কেউই জানে না। ইভেন ২০১৫ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুর খবর কেউ জানতো না। এনিওয়ে, কো-ফাউন্ডার হলেও, লাইম লাইটে আসেন মোল্লা ওমর। সময় এগিয়ে গেলে, মোল্লা ওমর অন্যান্য কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলে, তিনি তাঁর সামরিক কর্মকান্ড পরিচালনার দায়িত্ব দেন, মোল্লা ওবেদুল্লাহকে। ২০০৭ এ মোল্লা ওবেদুল্লাহকে গ্রেফতার করে পাকিস্তান আর্মি। সম্ভবত মার্কিন সহায়তায়। যাইহোক, তিনি ২০১০ পর্যন্ত পাকিস্তান জেলে বন্দী ছিলেন। এরপর? এরপরে হঠাৎ করেই, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে জেলখানায় তিনি মারা যান। হৃদরোগের ব্যাপারটা নিয়ে সন্দেহ করা যেতেই পারে। তবে সরকারি বয়ান সেটাই। যাইহোক, এরপরে মোল্লা ওমর পুনরায় দায়িত্ব নেন।

২০১৩ তে মোল্লা ওমরের মৃত্যুর পরে, তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন, মোল্লা মানসুর আখতার। কিন্তু আমেরিকানরা তাঁকে ট্র্যাক করে ফেলে। আর ২০১৬তে এক ড্রোন অ্যাটাকে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর সম্পর্কে আরেকটা উল্লেখযোগ্য তথ্য হচ্ছে, ভারতের বিমান হাইজ্যাক ইনসিডিন্সের সময় এই মোল্লা মানসুর আখতার ছিলেন তালিবান সরকারের সিভিল এভিয়েশানের দায়িত্বে।
যাইহোক, এরপরে তালেবানের নেতা, বা কমান্ডার বা আমির হন, হিবাতুল্লাহ আকুন্দজাদা। এখনো তিনি রয়েছেন নেতৃত্বে। মৃদুভাষী এই নেতা মূলত তালেবানদের ধর্মীয় নেতা। সাধারনত ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে ফতোয়া, নির্দেশনা ইত্যাদি আসে তাঁর কাছ থেকে। তালেবানের অন্যান্য নেতারা সামরিক বিভিন্ন দায়িত্ব থাকলেও তিনি মূলত ছিলেন ধর্মীয় শিক্ষকতায়। আধ্যাত্মিক গুরু।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তালেবান সরকারে তাঁর অবস্থান কেমন হবে? ইরানের মত? যেখানে গণতান্ত্রিকভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেও, আয়াতুল্লাহর হাতে রয়েছে অসীম ক্ষমতা। তেমন কিছু? এই মুহূর্তে ব্যাপারটা পরিষ্কার না। তবে আকুন্দজাদার ব্যাপারে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে, আমির হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পরে তিনি তৎকালীন আলকায়েদা প্রধান, বিন লাদেনের উত্তরসুরি, আইমান জাওয়াহিরির প্রতি সমর্থন জানান। জাওয়াহিরি বেঁচে আছেন না মারা গেছেন, কেউই জানে না।

আবার ফিরে যাচ্ছি বারাদারের ব্যাপারে। এই তালেবান কো-ফাউন্ডার মূলত ছিলেন সামরিক নেতৃত্বে। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করেছেন। শুধু তাই না, সেই সময় তিনি আর মোল্লা ওমর একই সাথে যুদ্ধ করেছেন। ফলে বোঝাই যায় তালেবান সংগঠনটিতে তাঁর অবস্থান বেশ শক্ত। ২০০১ এ তিনি হামিদ কারজাইকে একটা ডিল অফার করেন। ‘তোমাকে আমরা আফগানিস্তানের নেতা হিসেবে মেনে নেব, বিনিময়ে’। তবে সেই ডিল আর এগোয়নি। আমেরিকা অফারটা রিজেক্ট করে। এরপরে বেশ অনেক বছর তিনি ছিলেন আমেরিকার মোস্ট ওয়ান্টেড লিস্টে। এবং অবশেষে, ২০১০-এ, পাক মার্কিন জয়েন্ট অপারেশানে, করাচীতে তিনি ধরা পড়েন। এরপর থেকে ২০১৮ পর্যন্ত তিনি পাকিস্তানে ডিটেনশানে ছিলেন।

রহস্যজনকভাবে, এই মোস্ট ওয়ান্টেড টেরোরিস্টকে, গোয়ান্তানামো বে তে ট্রান্সফার করার ব্যাপারে পাকিস্তানকে সেভাবে কখনও চাপ দেয়নি আমেরিকানরা। শুধু তা ই না, ২০১৮তে তারা পাকিস্তানকে চাপ দেয়, তাঁকে মুক্তি দেয়ার জন্য। সম্ভবত তারা ততোদিনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে, আফগানিস্তান থেকে তারা সরে আসবে। আর সরে আসোবার পরে পছন্দের ব্যক্তিই যেন ক্ষমতায় থাকে, তাই বেছে নেয় বারাদারকে। আর তাই, মুক্তির পরে তাঁকে পাঠিয়ে দেয়া হয় কাতারে। আর এরপর থেকে তিনি সেখানেই অবস্থান করেন আর শান্তি আলোচনায় নেতৃত্ব দেন। সো? কি মনে হচ্ছে? সব কিছু কেমন ছকে বাঁধা? নিশ্চিত হয়ে হয়তো বলা যায় না, তবে সন্দেহ করাই যায়। তালেবান নেতৃত্ব সম্পর্কে আবার একদিন কথা হবে। টিল দেন, গুড বাই।

সর্বাধিক পঠিত