প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশিদ: বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে না পারা আমাদের জন্য অনেক বড় কলঙ্ক

মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশিদ: পঁচাত্তরের পনের আগস্ট নিঃসন্দেহে বাঙালি জাতির জন্য একটি কলঙ্কময়, ধিক্কার ও ঘৃণার দিন। বঙ্গবন্ধুকে কেন হত্যা করার প্রয়োজন পরলো ষড়যন্ত্রকারীদের? প্রথমত, তাদের আত্মপরিচয় খুঁজতে গিয়ে আমরা দেখতে পাই, বাংলাদেশের স্বাধীনতার রূপকার এবং স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তারা হত্যা করে বাংলাদেশেকে নিশ্চিহ্ন করতে চাইলো বাংলাদেশকে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে এবং ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের পরাজয়ের গ্লানিকে হালকা করার জন্য তারা তারা কাজ করছে বলে মনে হয়। সেই সূত্রে আমরা দেখেছি, এখানে যারা হত্যার সঙ্গে জড়িত বা সম্পৃক্ত আমরা তাদের এখনো পর্যন্ত উন্মুক্ত করতে পারিনি জনগণের সামনে। তবে যারা সক্রিয়ভাবে অস্ত্র নিয়ে হামলা করেছিলো তাদের বিচার হয়েছে। কিন্তু এখানে যার া হামলা করেছে তারাই শুধু জড়িত না। এখানে একটি বড় ধরনের চক্রান্তের অবস্থান আছে। সেটি জাতীয় এবং বিজাতীয় উভয়ই।

দ্বিতীয়ত আমরা দায়বদ্ধ করতে পারিনি। বঙ্গবন্ধু একজন অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন। তিনি তখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন। রাষ্ট্রপ্রতিকে রক্ষা করার জন্য রাষ্ট্রীয় যে প্রক্রিয়া বা মেকানিজম আছে সেই দায়দায়িত্বে যারা তখন ছিলেন তাদের আমরা দায়বদ্ধ করিনি। তাদের অবহেলা বা ইচ্ছাকৃতভাবে এর সঙ্গে সম্পৃক্ততা আছে কিনা সেটি বের করা হয়নি। যদি আগামী দিনের বাংলাদেশকে আমরা নিরাপদ করতে চাই, তাহলে অবশ্যই বঙ্গবন্ধু হত্যার কুশীলবদের উন্মুক্ত ও দায়বদ্ধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেটি এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে গণনায়ই নেওয়া হয়নি।

আরেকটি হচ্ছে এই হত্যাকাণ্ডে যারা সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলো তাদের যারা প্রকাশ্যভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে প্রকাশ্যভাবে। অর্থাৎ এই হত্যাকারীদের রক্ষার চেষ্টা করেছেন সেটি মানুষের কাছে উন্মুক্ত হয়েছে। কিন্তু এই অভিযোগে তাদের সবাইকে দায়বদ্ধ করা হয়নি। যারা হত্যাকাণ্ড করেছে তাদের ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিচার বহির্ভূত করার চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা দেখেছি যে এই হত্যাকারীদের বিদেশে পাঠিয়ে, বিভিন্ন মিশনে চাকরি দেওয়া হয়েছে, সেখানে প্রমোশন দেওয়া হয়েছে এবং তাদের আসলে পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়েছে চরমভাবে। যারা করেছেন, কেন করেছেন? কেন হত্যাকারীদের বিদেশি মিশনে চাকরি দিতে হবে? এর কারণগুলো জনগণ এখন জানতে চায়, আগামী দিনে জানতে চাইবে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পরিকল্পনা থেকে শুরু করে সবকিছু অবশ্যই আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য বের করে রাখা বা সঠিক ইতিহাস তৈরি করার জন্য এসব তথ্য উদঘাটন করা প্রয়োজন এবং যারা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে তাদের আইনি দায়বদ্ধতায় আনলেই আগামী দিনের বাংলাদেশে নিরাপদ হবে এবং আগামী দিনের বাংলাদেশের আইনের পথে চলবে এবং এ ধরনের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণে বিরত ও নিগৃহীত করার জন্য প্রক্রিয়াটা আরও শক্ত হবে। আমরা আমাদের নেতাকে হারিয়ে অত্যন্ত মর্মাহত।

আমরা দেখছি যে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের গুণাবলী নিয়ে শুধু বাংলাদেশের মানুষ আলোচনা করে না, বিশে^র মানুষও এটি আলোচনা করে। বাঙালিরা যেখানে তাকে চিহ্নিত করতে পারেনি কিন্তু বিশ^ তার গুণাবলীকে চিহ্নিত করতে পেরেছে বা পারছে। কোনো প্রজন্ম বড় হতে চাইলে তাদের একজন মডেল নেতাকে অনুসরণ করতে হয়। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুসরণ করে তাকে মডেল নেতা হিসেবে তার গুণাবলীকে অনুসরণ করে আমরা যদি একটি আদর্শ প্রজন্ম তৈরি করতে পারি, সেই আদর্শ প্রজন্ম আগামী দিনে একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আবার মানুষজনকে বিভ্রান্ত করার জন্য যেসব আদর্শ ও মতাদর্শ রয়েছে সেগুলো থেকে আমাদের নতুন প্রজন্মকে দূরে রাখার জন্য শান্তির মতাদর্শ, অন্যান্য মতাদর্শ ও বঙ্গবন্ধুর গুণাবলীকে যদি অনুসরণ করি তাহলে আমরা অবশ্যই সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবো আদর্শগতভাবে। বিভিন্ন বই ও লেখনীতে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যেসব তথ্য আমরা পাই, এই তথ্য আরও বেশি হতে হবে যাতে সাধারণ মানুষ ও নতুন প্রজন্ম জানতে পারে। এই জায়গায় আমাদের ঘাটতি রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুসরণ করার জন্য আমাদের অবশ্যই কিছু প্রক্রিয়া থাকতে হবে। বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গবন্ধু পরিবারেরর যেসব সদস্য বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে কাজ করেছেন সেটি প্রকাশ্যে হোক আর পর্দার অন্তরালেই হোক, তাদের মূল্যায়িত করতে হবে এবং তাদের মূল্যায়নের সুযোগ করে দিতে হবে নতুন প্রজন্মকে। এই জায়গাটিতে আমাদের অনেক কাজ করার আছে। বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পেছনে যে কারণগুলো আমরা খুঁজে পাই সেগুলো অত্যন্ত দুঃখজনক।

বঙ্গবন্ধুর মতো একজন নেতা বাংলাদেশে ছিলো বলেই এদেশ হয়েছে। যাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে তারাই হচ্ছে বাংলাদেশকে ধ্বংস করার জন্য সক্রিয়তা দেখিয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমরা দেখেছি, ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে খুনি মুশতাক পাকিস্তানের সঙ্গে একটি কম্প্রোমাইজ করার চেষ্টা করেছিলো বঙ্গবন্ধুকে মুক্তির প্রক্রিয়া তৈরি করে। সেই প্রস্তাব মুজিব গ্রহণ করেনি। তখন থেকেই তিনি পাকিস্তানিদের অনুচর হিসেবে কাজ করছিলো। খুনি মোশতাক, জেনারেল জিয়াসহ সামরিক বাহিনীতে যারা ছিলো সেই অনুচরদের আমরা চিহ্নিত করতে পারিনি। বাংলাদেশের বিপক্ষে যারা কাজ করেছে। বাংলাদেশে স্বাধীন হওয়ার পরও তারা বহাল তবিয়তে এই দেশে অবস্থান করে ছিলো বলেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে পেরেছে।

বঙ্গবন্ধুকে যে আমরা রক্ষা করতে পারিনি, এটি হচ্ছে বাঙালি জাতির বড় কলঙ্ক। এই কলঙ্ক থেকে মুক্ত হতে হলে বঙ্গবন্ধু হত্যার সমস্ত কুশীলবদের জনসম্মুখে উন্মুক্ত করতে হবে। তাহলে আমরা হয়তো সেই কলঙ্ক থেকে কিছুটা মুক্তি পেতে পারি। যারা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে তাদের বিচার হয়েছে। যারা পালিয়ে আছেন তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের শাস্তি ভোগ করার নিশ্চয়তা তৈরি করতে হবে। সেক্ষেত্রে অনেক বড় কাজ রয়েছে। পরিচিতি : নিরাপত্তা বিশ্লেষক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমিরুল ইসলাম

 

 

সর্বাধিক পঠিত