প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ড. আতিউর রহমান: বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের পথ ধরেই হাঁটছে বাংলাদেশ

ড. আতিউর রহমান: শোকের মাসে প্রকৃতি যেমন কাঁদে তেমন আমরাও কাঁদি। যিনি বাংলাদেশের আরেক নাম তাকে পঁচাত্তরের পনের আগস্ট একদল বিশ্বাসঘাতক আমাদের কাছ থেকে শারীরিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। তারা ভেবেছিলো এর মাধ্যমে তিনি শেষ হয়ে গেলেন এবং তারপর দেশে নেমে এসেছিলো এক গভীর অন্ধকার। সেই অন্ধকারে দেশ চলছিলো একেবারেই উল্টো দিকে পাকিস্তানের পক্ষে। অর্থনীতি, সমাজ এবং রাজনীতি সবই হয়ে পরেছিলো কলুষিত। মুক্তিযুদ্ধের পর মাত্র সাড়ে তিন বছরে বঙ্গবন্ধু তার সুদৃঢ় নেতৃত্বে আমাদের অর্থনীতিকে ধংসস্তুপ থেকে টেনে অনেক ওপরে নিয়ে গিয়েছিলেন। কৃষি এবং শিল্পের ওপরে সমান গুরুত্ব দিয়ে তিনি সেই অর্থনীতির পুনর্নিমাণ করছিলেন। শুরুর দিকে যে সমস্ত বাধা ছিলো তার মধ্যে প্রধান ছিলো আমাদের খাদ্য ঘাটতি। আমাদের যে খাদ্যের প্রয়োজন ছিলো তার অর্ধেকও আমরা উৎপাদন করতে পারতাম না। আর সেই সময় চলছিলো বন্যা এবং নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ। মুক্তিযুদ্ধের বছরও ছিলো দারুণ বর্ষা ও বন্যার সময়। পরবর্তীকালে আমরা দেখতে পাই প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই আছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছিলো পাকিস্তানিদের প্ররোচনায় নষ্ট কূটনীতি। যেই কূটনীতির প্রভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের খাদ্য সহযোগিতার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তারপরে পৃথিবীর অনেক দেশ যারা মানবিক কারণে আমাদের খাদ্য সাহায্য দিয়ে যায়। তা সত্ত্বেও আমাদের খাদ্য নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছিলো। সেই সময়টায় বিশ^ অর্থনীতিও খুবই বৈরী ছিলো। হঠাৎ করে ডলার এবং স্বর্ণের মধ্যে যে বিনিময় হার সেটা মার্কিনিরা তুলে দিলে। ডলারের দাম বাড়তে শুরু করলো। এর প্রভাব গিয়ে পড়লো তেলের দামের ওপরে ও আন্তর্জাতিক খাদ্য বাজারে। যে তেল আমরা দুই ডলার ব্যরোলে কিনতাম তার দাম বেড়ে গিয়ে ১০ ডলারে উন্নীত হয়ে গেলো। যে গম আমরা ৮০ ডলারে কিনতাম প্রতি টন সেটা ২৮০ ডলার হয়ে গেলো। যে সার আমরা ৭০ ডলারে কিনতাম প্রতি টন সেটা ২৮০ ডলার হয়ে গেলো। এসবের প্রভাব গিয়ে আমাদের নিত্যপণ্যের ওপর পড়তে লাগলো। খাদ্যের মূল্যের ওপরে পড়তে লাগলো এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ওপর পড়তে লাগলো। এর প্রভাবে মূল্যস্ফীতি আকাশ ছোঁয়া হয়ে গেলো। আমাদের দেশে ৬৫ শতাংশেরও ওপরে মূল্যস্ফীতি বেড়ে গিয়েছিলো।

বঙ্গবন্ধু অবকাঠামোগুলো ঠিক করছিলেন। তখন আমাদের সবচেয়ে বড় সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামের নাঈম পোতা ছিলো, আমাদের রেলের হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, ভৈরব ব্রিজ ভেঙে গেছে। সুতরাং এগুলোকে মেরামত করতে হয়েছে। সড়ক, রেল, নদীপথ আর সমুদ্র বন্দর এগুলো গভীরভাবে একটির সঙ্গে আরেকটি জড়িত বা সংযুক্ত। খাদ্য এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নেওয়ার জন্য এই অবকাঠামোগুলোকে সচল করা খুবই জরুরি। এমনকি আমাদের কোনো ভালো ফেরিও ছিলো না। বঙ্গবন্ধু অক্সফামের প্রতিনিধি ফ্রান্সিসকে বলেছিলেন, আমাদের ফেরি দাও, তোমরা রিলিফ লাগবে না, ফেরি দাও।’ তখন অক্সফাম কিছু ফেরির ব্যবস্থা করেছিলো, এখন মাওয়া ঘাটের পাড়াপাড়ের ফেরির মতো। অবস্থাটা এতোই খারাপ ছিলো যে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় খাদ্য নিয়ে যাওয়া যাচ্ছিলো না। একদিকে খাদ্যের সরবার কম, খাদ্যের রাজনীতি চলছে, বিশ^রাজনীতি চলছে, আরেকদিকে বন্দরগুলো যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত, রেল ক্ষতিগ্রস্ত। এগুলো নিয়ে খাদ্য সরবরাহ করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছিলো। অন্যদিকে কৃষিতেও বড় প্রভাব পড়েছিলো যুদ্ধের কারণে। এক কোটি মানুষ চলে গিয়েছিলো রিফিউজি বা শরণার্থী হিসেবে। দেশের ভেতরে প্রায় ২০ লাখ ঘরবাড়ি ধ্বংস বা পুড়ে ফেলা হয়েছিলো। অনেক জায়গাতে ফসল ফলানো যায়নি ওই বছর। হানাদার বাহিনী আমাদের হালের বলদ জবাই করে খেয়ে ফেলেছে। এসব কিছুর দিকে নতুন করে এসে বঙ্গবন্ধুকে নজর দিতে হলো। কৃষিতে তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিলেন। এক লাখ কৃষকের কৃষিঋণের যে মামলা ছিলো তিনি এক ধাক্কায় সেগুলো তুলে দিলেন। তখন কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানও ছিলো না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছিলো না। তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্থাপন করলেন। তারপরে সোনালী, রূপালী, অগ্রণী, জনতা ব্যাংক ও কৃষিব্যাংক স্থাপন করলেন। উদ্দেশ্য ছিলো কৃষককে এবং শিল্পকে যেন টাকা দিতে পারেন। মনে রাখতে হবে ওই সময়টাতে পাকিস্তানিরা শিল্পকারখানার সমন্ত মেশিনপত্র ফেলে রেখে চলেগিয়েছিলো। টপ ম্যানেজার, ভালো শ্রমিক ও উদ্যোক্তারাও পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলো। এগুলো তাড়াতাড়ি জাতীয়করণ ছাড়া কোনো উপায় ছিলো না। সেটা তিনি করলেন।

কৃষকেদের জন্য তিনি সার, বীজ ও সেচের ব্যবস্থা করলেন। বাজেটের একটা বড় অংশ কৃষির জন্য দিলেন। বিশেষ করে প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার প্রায় এক-চতুর্থাংশ বরাদ্দ তিনি কৃষির জন্য করেছিলেন। তার মানে কৃষিকে তিনি খুবই গুরুত্ব দিতেন। কারণ তিনি মনে করতেন যে কৃষকরাই হলো আমাদের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কৃষিতে কর্মসংস্থান হয়, কৃষি খাদ্য দেয়, শিল্পের যে চাহিদা সেটা কৃষিই তৈরি করে। সুতরাং কৃষিকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন তিনি। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ে গিয়ে তিনি ছাত্রদের বলেছিলেন, ‘তোমরা কৃষকের কাছে যাও, কৃষকের কাছ থেকে শিখো, ফুলপ্যান্ট ছেড়ে হ্যাফপ্যান্ট পরো। পরে তাদের কাছ থেকে শিখো। তাহলে বুঝতে পারবে যে কৃষি আমাদের কতো গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি আমাদের কতো জরুরি।’ এইভাবে তিনি কৃষি এবং শিল্পকে সমানতালে তৈরি করলেন। প্রাদেশিক একটি সরকারকে কেন্দ্রীয় সরকারে পরিণত করলেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি এগিয়ে যাচ্ছিলেন।

এমন একটি পরিবেশ তিনি তৈরি করেছিলেন যে দেশ কিন্তু ঘুরে দাঁড়াচ্ছিলো। দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছিলো। যেমন, ১৯৭২ সালে আমাদের মাথাপিছু আয় ছিলো ৯৩ মার্কিন ডলার। এটাকে তিনি টেনে ১৯৭৫ সালে টেনে ২৭৩ মার্কিন ডলারে তুলে ফেললেন। অথচ বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশে পরের বছরই এই মাথাপিছু আয় ধপাস করে ১৩৮ মার্কিন ডলারে নেমে এলো। তার পরের বছর ১২৮ ডলারে নেমে এলো। দীর্ঘ ১৩ বছর লেগে ছিলো। ১৯৮৮ সালে এসে সেই মাথাপিছু আয় ২৭০ ডলারের ওপরে উঠেছিলো। বঙ্গবন্ধু কতোটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন অর্থনীতির জন্য এবং আমাদের সমাজের জন্য। তিনি সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র ছিলেন। রবীন্দ্রণাথ তার ‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধে বলেছিলেন, ‘স্বদেশকে একটি ব্যাক্তির মধ্যে আমরা উপলব্ধি করিতে চাই। এমন একটি লোক চাই যিনি আমাদের সমস্ত সমাজের প্রতিমাস্বরুপ হইবেন। তাহাকে অবলম্বন করিয়াই আমরা আমাদের বৃহৎ স্বদেশী সমাজকে ভক্তি করিবো, সেবা করিবো। তাহার সঙ্গে যোগ রাখিলে সমাজের প্রত্যেক ব্যাক্তির সঙ্গে আমাদের যোগ রক্ষিত হইবে।’ আমার কাছে মনে হয় বঙ্গবন্ধুকে উপলক্ষ্য করেই বোধহয় তিনি এই কথাগুলো লিখে গিয়েছিলেন। আমরা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যোগ রেখেছিলাম বলেই এই সমাজে ঐক্য এসেছিলো। এই সমাজ মুক্তিযুদ্ধেও জন্য প্রস্তুত হতে পেরেছিলো। পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধউত্তর বাংলাদেশে সেই যোগাযোগটাই আমাদের সামনের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু ঘাতকেরা ঠিক জানতো বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশ। সেজন্য বাংলাদেশের হৃদয় যিনি সেই হৃদয়ের মধ্যে গুলি করলো। তিনি গুলিবিদ্ধ শুধু হলেন না, বাংলাদেশের হৃদয় ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো এবং দীর্ঘ সময় আমাদের লেগেছে এই হৃদয়কে সংযত করতে। হৃদয় থেকে যে রক্ত বের হচ্ছিলো সেই রক্ত সারা বংলাদেশের সবুজ প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়েছিলো। তার ঊর্বর রক্তে আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি বাংলাদেশের কৃষি, অর্থনীতি এখন উজ্জীবিত। এটি সম্ভব ছিলো না যখন বঙ্গবন্ধু চলে গিয়েছিলেন। তার পরপর কিন্তু দেশটাকে একেবারে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছিলো। আমাদের বড়ই সৌভাগ্য যে বঙ্গবন্ধুকন্যা ফিরে এসে হাল ধরেছিলেন। তিনি হাল ধরেছিলেন বলেই বাংলাদেশ আবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ হতে পেরেছে। আজকের বাংলাদেশ সেইদিক থেকে বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্নের পথ ধরেই এগিয়েছে। যেই বাংলাদেশ কৃষকের, মজুরের ও শ্রমিকের। যেই বাংলাদেশ সকল ধর্মের মানুষের। এটা বঙ্গবন্ধুরই সৃষ্টি। এই বাংলাদেশ তার কন্যার হাত ধরেই এগিয়ে যাচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু এমন একটি উন্নয়ন চেয়েছিলেন যেটা হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। যেখানে মানুষ ভদ্রভাবে শিক্ষা পাবে, ভালো খাবে, ভালো পরবে, ভালো একটি আবাসনে বাস করবে এবং রোগের হাত থেকে বাঁচবার উপায় খুঁজে পাবে। একই সঙ্গে শিল্প ও সংস্কৃতিচর্চাও করবে। এরকম একটি অর্থবহ বাংলাদেশ তিনি চেয়েছিলেন। আজকে এই মহামারির মধ্যে সেই বাংলাদেশ অনেকটা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পরেছে। করোনা মহামারির কারণে অনেক মানুষের কর্মচ্যুতি ঘটেছে, অনেকের মৃত্যু হচ্ছে, অনেকের কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু আমাদের সরকার এবং সমাজ চেষ্টা করে যাচ্ছে। এই সংকটকালে যেন আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকি, বঙ্গবন্ধু যেমন চেয়েছিলেন। ঐক্যবদ্ধ থেকে এই সংকট থেকে আমরা উত্তোরণের চেষ্টা করছি। আমার আহ্বান থাকবে এই সময়টায় আমরা যেন বঙ্গবন্ধুর আত্মার প্রতি সশ্রদ্ধ হই। তিনি যেমন বাংলাদেশ চেয়েছিলেন তেমন বাংলাদেশ গড়বার জন্য আমরা সকলেই আমাদরে যার যা শক্তি আছে, সেই শক্তিটা যেন আমরা প্রয়োগ করি। কারণ তিনিই যে বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশের নদী, গাছ-পালা, সবুজ প্রান্তর, প্রকৃতির সকল অঙ্গ সর্বত্রই তিনি বিরাজমান। সুতরাং আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তাকে শুধু স্মরণ করবো না, তিনি যেমন বাংলাদেশ চেয়েছিলেন তেমন বাংলাদেশ গড়বার জন্য আমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ হবো এই শোকের সময়ে। এই আশাবাদ ব্যক্ত করে, বঙ্গবন্ধুর আত্মার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।
পরিচিতি : বঙ্গবন্ধু গবেষক ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমিরুল ইসলাম

সর্বাধিক পঠিত