প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

 সালেম সুলেরী: তর্জনীর তীর, যে কবিতা থেকে হাজার কবিতার জন্ম

সালেম সুলেরী: জ্বি, কবিতাটির পটভূমি ‘১৯৭০-এর ২৩ অক্টোবর’। সেদিনই মহাগণনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে প্রথম দেখি। কিছুদিন আগে মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানীকে পেলাম। আব্বার অগ্রজ মোজাম্মেল হোসেনের লাগোয়া বাড়িতেই উঠেছিলেন। মোজাম্মেল চাচা ‘ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি’র স্থানীয় সভাপতি। আর সেই বামঘেঁষা ‘ন্যাপ’ ও আ’লীগের প্রতিষ্ঠাতা একজনই। তৎকালের নির্বাচন বিরোধী নেতা মাওলানা ভাসানী। বললেন, ‘ভোটের বাকসে লাত্থি মারো, পূর্ববাংলা স্বাধীন করো।’ যতোই ভোটের জিগির তোল, ক্ষমতা দেবেনা পাকিস্তানীরা। তারপরও গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠায় নির্বাচনমুখী হলো আ’লীগ।

১৯৭০-এর নির্বাচনী সভায় ভাষণ দিতে এলেন বঙ্গবন্ধু। আমার পৈতৃকবাস রংপুরের নীলফামারীর ডোমারে। কৈশোরে মেজদা’র হাতধরা বৃষ্টিস্নাত বিলম্বিত সভা সেটি। অগ্রজ সহোদর সরকার মাহবুব ছাত্রলীগের স্থানীয় সম্পাদক। মঞ্চভরা আয়োজনের সন্চালনায় পন্চগড়ের রাজনীতিক সিরাজুল ইসলাম। দূরের দেখায়– আমার অগ্রজ তাতে সহকারী সন্চালক। ঠেলাঠেলির মধ্যেও মুখাবয়বটি দেখতে পাওয়ার মহানন্দ। তার চেয়েও বড়ো আনন্দ একটি অবিনাশী কবিতার প্রাপ্তি। সংক্ষিপ্ত অথচ তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য রাখলেন মহামুজিব।

তখনও ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিটি ব্যাপকতা পায়নি। মুদ্রামাফিক মুঠোভেঙে ডান হাত তুললেন। কনিষ্ঠাসহ তিনটি আঙুল করতলে শোয়ানো। বৃদ্ধাঙ্গুলি দাঁড়ানো তবে তর্জনী অধিক শক্তিমত্তায় উড্ডীন। আমরা কৈশোরে তখন ‘তীরধনুক’ যোদ্ধা। স্বাধীনতা, বিপ্লব, মুক্তিযুদ্ধের মন্ত্রে আবেগ-উত্থিত। আমার মনে হলো বঙ্গবন্ধু বিপ্লবী কবিতায় নিবেদিত। একটি তর্জনী উঁচিয়ে দিলেন একটিই ঘোষণা। বললেন, একটি ভোটও যেন বাইরে না যায়। বক্তব্যের দৃঢ়তার মধ্যে আঙুল-অনামিকা ভীষণ দৃপ্ত। আমার ভাবনায় চলকে উঠলো কবিতার উপমা। তর্জনী উঁচানো তীর নাকি ‘তর্জনীর তীর’।
মুক্তিযুদ্ধকালে গরুরগাড়িতে পরিবারসহ ভারতগমন, শরণার্থী সময়। কোচবিহারের হলদিবাড়িতে কাঁচা হাতেই কবিতা-প্রয়াস। পুরোটা লিখতে পারি সত্তর দশকের উপান্তে। কবিতার ছন্দ-ব্যাকরণ শেখার বয়ঃসন্ধিকালে। ছাপাও হলো প্রথমে দেয়ালিকা’য়, পরে মহাজনপ্রিয় ‘ইত্তেফাকে।’ অতঃপর কবিতার বিষয়টি আর একার থাকলো না। তর্জনীকে তীর বানিয়ে রচিত হলো হাজার কবিতা। এখনও হচ্ছে, মুদ্রাদোষে হয়তো হতেই থাকবে।
রচনার পটভূমিসহ কবিতাটি আবার ছাপা হলো। প্রবাসের প্রধান কাগজ ‘সাপ্তাহিক ঠিকানা’য়। ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসের ঋদ্ধ ক্রোড়পত্রে।কর্ণধার, সাবেক এমপি এম এম শাহীনকে মহাধন্যবাদ। সংশ্লিষ্ট কুশলী, বিশাল পাঠকগোষ্ঠীকেও আন্তরিক অভিনন্দন। নির্মমতায় নিহত বঙ্গবন্ধু পরিবার, অন্য শহিদদেরা স্বর্গশান্তি পাক। ইতিহাসের শ্বাসে বেঁচে থাক আমার কৈশোরের সেই পদ্যপ্রেম। সেই স্মৃতিসিক্তময় দৃশ্যপটের প্রতিচ্ছবি– ‘তর্জনী’র তীর’।

তর্জনীর তীর 
সালেম সুলেরী

ধনুক শরীরে তার কেঁপে ওঠে তীক্ষ্ণ তর্জনীর তীর।
পড়ন্ত রোদ্দুর গায়ে মেখে তিনি ঘোষণা করেন
আগামী দিনের লাল ইতিহাস–
আর কোনো শক্তি নয়,
আগামী সূর্যের আড়মোড়া ভেঙে দিয়ে
দেখবে নিজেরা সব আলোর নাচন পতাকায় পতাকায়।
নতুন প্রজন্ম তার অভিজ্ঞতার খাতায়
বারুদ মাখানো ক্লান্তি নিয়ে ঝুঁকে পড়ে ফেললো নিঃশ্বাস।
বিশ্বাস করেছি যাকে– তাঁকে রেখেছি প্রাণের প্রহরায়।
তাঁকে ছুঁয়েছি কৈশোরে, ডোমারের গ্রামীণ জনসভায়।
তাঁকে মঞ্চে রেখে উনিশশত সত্তরে, সূর্য ডুবে গেলো
যেন বাংলাদেশ হয়ে জেগে উঠবার জন্যে…।
তাঁকে দেখেছি তখন
হন্যে হয়ে তাকাতে, পরতে পাঞ্জাবিতে
কালো হাতাহীন কোট,
তারপর–
সাদাকালো’র মিশ্রণে তিনি হয়ে গেলেন তৃতীয় বিশ্ব।
তিল ধারণের জায়গায় দাঁড়িয়ে মেজদা’র হাতে হাত।
বৃষ্টিস্নাত সে সেঁজুতি সন্ধ্যা, সুদিন-সন্ধান।
গায়ের চাদরে মাথা ঢাকলেও সর্বাঙ্গ ভিজলো।
আমি ছাতা বলে চিৎকার করবার আগেই
জাদুকরের ভঙ্গিতে অদ্ভুত মুদ্রায় কাঁপালেন ঠোঁট।
আমি তোমাদেরই লোক– বলতেই মঞ্চের দুরন্ত সামিয়ানা
যেন বৃষ্টির বিপক্ষে এক বৃহত্তর ছাতা, ঢাকলো সমস্ত মাঠ।
বিতর্ক যুগের পর কৈশোরের হাফপ্যান্ট নিয়েছে বিদায়।
তারুণ্যের কালো চোখে বৃষ্টি এবং বিদ্যুৎ-বিদ্রোহ বিকম্পন!
সবপেয়েছির দেশে খুঁজে ফিরি
বিজয়ী জাতির পরাজিত নেতাদের মৃত্যুর দলিল!
আর খুঁজি গণতন্ত্র, ঘাতক নিরোধে রক্তচক্ষু বাঙালির, খুঁজি সেই ধনুক শরীরে কেঁপে ওঠা তীক্ষ্ণ তর্জনীর তীর।
অক্ষরবৃত্ত, নিউইয়র্ক (ফেসবুক থেকে)

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত