প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সাঈদ তারেক: সময়-অসময়: ‘টকশোজীবী’ এবং ‘জনগণ’

সাঈদ তারেক: টেলিভিশনের টকশোজীবী, তাবৎ পন্ডিত বিশেষজ্ঞদের প্রায়ই আহাজারি করতে শুনি ‘জনগণ’ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না, জনগণ এটা করছে না, জনগণ ওটা করছে না- যেন জনগণ আর তারা আলাদা কোনো প্রাণি-গোষ্ঠী। একটা কমন বুলি, মানুষ লকডাউন কেয়ার করছে না, যেন আম পাবলিক মানুষ আর তারা সব অমানুষ বা অতিমানুষ। এই ‘জনগণ’ বলতে আসলে এই সম্প্রদায়টি কাদের মিন করে থাকেন। জনগণ হচ্ছে জনগোষ্ঠী। একটি দেশে যারা বসবাস করেন সবাই মিলেই জনগণ। সে হিসেবে টকশোজীবী পন্ডিত বিশেষজ্ঞরাও জনগোষ্ঠীর অংশ, তারাও জনগণ। তাহলে জনগণ স্বাস্থ্যবিধি মানেনা বললে কী বোঝায়, তারাও মানেন না। কিন্তু তাই কি। যারা ফেসবুকে টিভিতে এসে বড় বড় জ্ঞান দেন তারা নিজেরা শতভাগ স্বাস্থ্যবিধি মানেন লকডাউন মানেন সরকারি যেকোনো আদেশ-নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেন, তাই তো জানি। তাহলে কোন ‘জনগণ’ যারা এসব মানছে না। আসলে সমাজের বিশেষ সুবিধাভোগী বা পরজীবী অংশটি কখনোই নিজেদের জনগণের অংশ মনে করেন না। ‘জনগণ’ বলতে তারা বোঝান সুবিধাবঞ্চিত হতদরিদ্র শ্রমজীবি কর্মজীবি পেশাজীবি হতভাগা মানুষগুলোকে- যতো দোষ তাদের। তারা স্বাস্থ্যবিধি লকডাউন মানে না সরকারি নির্দেশ থোড়াই কেয়ার করে রাস্তায় বের হয়, ছুটিছাটায় গ্রামের বাড়ি যায় আবার হুরমুর করে ঢাকায় ফিরে আসে। যেন আম জনতা গরু-ছাগল, ঈদ চান্দে গরুর পাল বাড়ির দিকে ছোটে। শ্রেণি চরিত্র এবং শ্রেণি অবস্থান থেকে তারা তা বলতে পারেন, কিন্তু আমি তো দেখি মানুষ যথেষ্টভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে। মাস্ক পরছে, চেষ্টা করছে ব্যক্তিদূরত্ব মেনে চলতে। পারত ঘরের বাইরে বের হচ্ছে না। আগের চাইতে অনেক বেশি সচেতন হয়ে উঠেছে। দিনদুনিয়ার খবরাখবর রাখে না তেমনও না।

পরিস্থিতির গুরুত্ব বা ভয়াবহতাও বোঝে। হ্যাঁ কিছু অসচেতন মানুষ সব সমাজেই থাকে। অনেকে আছে যারা বেশিক্ষণ মাস্ক পরে থাকতে পারে না বা মাস্কের গুরুত্ব বোঝে না অথবা মাস্ক পরতে ভুলে যায়। আমি নিজেও প্রায়ই বাসা থেকে বের হওয়ার সময় মাস্ক নিতে বুলে যাই, রাস্তা থেকে ফিরে আসতে হয়। ঘরের বাইরে যারা বের হন নিতান্ত প্রয়োজনেই তাদেরকে বের হতে হয়Ñ এমন প্রয়োজন যা টকশোজীবী পন্ডিত বিশেষজ্ঞরা কখনোই বুঝতে চান না বা বুঝতে পারেন না। কোন অবস্থায় পড়লে একজন মানুষকে চারগুন-পাঁচগুন টাকা খরচ করে গাদাগাদি অবস্থায় ট্রাভেল করতে হয় মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছুতে হয়, সমাজের সুশীল পরজীবী গোষ্ঠীটি কখনোই তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না। তারা শুধু বোঝে আনন্দফুর্তি চিত্তবিনোদনের জন্যই মানুষ বাড়ি যায়, ঘরের বাইরে বের হয়। তারপরও যদি ধরে নেই ‘জনগণ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না’, কেন মানছে না! অশিক্ষা, অসচেতনতা পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে না পারা যদি কারন হয়ে থাকে, কেন মানুষকে সচেতন করা গেলো না, কেন তাদের গুরুত্ব বোঝানো গেলো না। এ দায়িত্বটা কাদের ছিলো। সরকারের কথা বাদ দিলাম। আমলানির্ভর প্রশাসন, তারা প্রশাসক- শুধু শাসন করতেই জানে। শিখেই এসেছে আদেশ-নির্দেশ, হুকুম, সার্কুলার বিধিবিধান জারি আর তা কেউ না মানলে গ্রেপ্তার মামলা, জেল-জরিমানা করার বিদ্যা। সেক্ষেত্রে মানুষকে সামাজিকভাবে শিক্ষিত সভ্য ভব্য সচেতন করার দায়িত্ব মূলত এসব পন্ডিত বিশেষজ্ঞ সুশীলদের ওপরই বর্তায়। কী দায়িত্বটা পালন করেছেন তারা। টিভি পর্দায় এসে বড়বড় বাণী বচন আর জ্ঞান বিতরণ ছাড়া আর কোনো কাজে দেখা গেছে তাদের।

টিভির কথাই যদি বলি, ‘জনগণের’ কতো পার্সেন্ট এসব দেখে। ইলেক্ট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়াগুলোর কতোটুকু বিশ্বাসযোগ্যতা আছে আম পাবলিকের কাছে। এটাও ধরলাম সবাই এসব দেখে এবং যা প্রচারিত প্রকাশিত হয় বিশ্বাসও করে, কিন্তু দেখেটা কি। সারা দিনে বত্রিশটা দেশি চ্যানেলে সংবাদ পাঠক উপস্থাপক শিল্পী অভিনেতা টকশোর টকার মিলিয়ে কয়েক হাজার মানুষের চেহারা দেখা যায়, কয়জনকে দর্শক মাস্ক পরা অবস্থায় দেখতে পায়। চব্বিশ ঘণ্টায় কমপক্ষে একশজন করে বুদ্ধিজীবী পন্ডিত গবেষক বিশেষজ্ঞ বিভিন্ন চ্যানেলে এসে স্বাস্থ্যবিধি মানা বা মাস্ক পরিধান করা নিয়ে জ্ঞান বিতরন করেন, কয়জন নিজেরা মাস্ক পরে পর্দায় আবির্ভূত হন। কয়জনকে মানুষ পর্দায় হ্যান্ড স্যানিটাইজ করতে দেখে। মানুষ কেন রাস্তায় বের হলো এ নিয়ে তাদের অভিযোগের অন্ত নেই, কিন্তু ‘১নং আসল কঠোর লকডাউনে’র মধ্যেও হাজার হাজার প্রাইভেট গাড়ি রাজপথে ট্রাফিক জ্যাম বাঁধিয়ে দেয়, কখনো কি উনারা এসব গাড়ির অবাধ চলাচলের বিপক্ষে টু-শব্দটি করেন। কেন করেন না? এসব গাড়ির অধিকাংশই তাদের শ্রেণি-গোষ্ঠীর বলে। কোন কোন টিভি টকশোতে দেখা যায় আলোচকদের বসার দূরত্ব দুই হাতও না। তাহলে মানুষ ব্যক্তি দূরত্বের গুরুত্ব বুঝবে কী করে। মাস্ক পরে এসে চিত্রধারণের সুবিধার্থের কথা বলে যদি দর্শকদের সামনেই মাস্ক খুলে ফেলতেন বা মানুষকে দেখানোর জন্যও দুই একবার হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করতেন তাও না হয় কথা ছিলো। এখন কেউ তো বলতেই পারে তারা নিজেরাই মাস্ক পরে না এসেছে অন্যকে মাষ্ক পরার কথা বলতে। কথায় আছে ‘আপনি আচরি ধর্ম পরেরে শিখাও’। কোনো বিষয়ে উপদেশ দিতে হলে আগে নিজেকে তা করে দেখাতে হয়, সেভাবে উপস্থাপন করতে হয়। সবচেয়ে বড় কথা, জনগণকে জ্ঞান দেওয়ার আগে নিজেকে জনগণের একজন মনে করা উচিত। যেহেতু পন্ডিত গবেষক বিজ্ঞ বিশেষজ্ঞরা নিজেদেরকে ‘জনগণ’ মনে করেন না, ‘জনগণও’ তাদের কথা বিশ্বাস করে না পাত্তা দেয় না, কথাটা যদি এভাবে বলা হয়, অত্যুক্তি হবে কি। ফেসবুক থেকে

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত