প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সন্তানের লজ্জা, তাই মা দাঁড়িয়েছেন সাশ্রয়ী পণ্যের জন্য

নিউজ ডেস্ক: রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানের পাশে বিডিআর ৩ নম্বর গেটের সামনে একটা মিনিট্রাক ঘিরে দুই সারি মানুষ। সকাল ১০টার সময়ই আজ তাপমাত্রা ৩৩। তবে অনুভব হচ্ছে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কারও ছাতা, কারও মাথায় ধরা বাজারের ব্যাগ। দীর্ঘ সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন এক বয়স্ক নারী। প্রায় এক ঘণ্টা পর তাঁর পালা এল। দুজন করে পুরুষ পণ্য কেনার পর একজন নারী নিতে পারছেন। এই বৈষম্যের কারণ জানতে চাইলে বিক্রেতারা বললেন, লকডাউনের জন্য পুরুষের সংখ্যা এখন বেশি। এমন সময় নারীরাই বেশি আসেন। ট্রাকের কাছে পৌঁছাতেই জেরবার হতে হয়েছে তাঁর। ঘেমে জবজবে হয়েছেন। এক শ টাকার দুটো নোট এগিয়ে দিয়ে বললেন, শুধু তেল নিব। দুই লিটারের দুটো তেলের বোতল নিয়ে পাশের উঁচু ফুটপাতে উঠে আসতে আসতে হাঁপিয়ে গেলেন।

নাম অর্চনা ভদ্র। ষাটোর্ধ্ব নারীর কথা বলতে আপত্তি নেই। বাড়িতে তিনজন পুরুষ থাকতেও কাজটি তিনিই করছেন। টিসিবির এই পণ্য নিজে নিয়ে গেলে বাড়ির মানুষদের লজ্জার মুখে পড়তে হবে না ভেবে স্বস্তি আছে তাঁর। অর্চনা ভদ্রর পরিবারের সদস্যসংখ্যা ৯। শুধু তেল নিলেন কেন জিজ্ঞেস করলে জানালেন, চালের ট্রাক ভিন্ন। আবার আসবে কাল বা পরশু। অর্চনা ভদ্র থাকেন নিউ পল্টনের খালেক লেনে। সাত বছর হলো ঢাকায় এসেছেন। দুই ছেলের সংসার নিয়ে যৌথ পরিবার তাঁদের। ছেলেদের দোকান আছে নিউমার্কেটে। ভাড়ার দোকান। লকডাউনের জন্য বহুদিন ধরে বন্ধ। তবে আশপাশের মানুষজন ছেলেদের ভালোভাবে চেনে বলে তাঁদের টিসিবির লাইনে দাঁড়াতে লজ্জা হয়। আর ছেলেদের বাবাকে আসতে দেননি নিজেই। এই কড়া রোদ বুড়ো মানুষটার সহ্য হবে না বলে তাঁকে ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করে এসেছেন। প্রথম আলো

আজ সোমবার থেকে এক মাসের জন্য শুরু হয়েছে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য বিক্রি কার্যক্রম। অনেকেই আগে থেকে এসে অপেক্ষা করেছিলেন পলাশীর মোড়, আজিমপুর, জিগাতলার মতো নির্ধারিত জায়গাগুলোতে। বিডিআর ৩ নম্বর গেটের সামনে দুই সারি লাইন নারী-পুরুষের। এর মধ্যে শুরু হলো ঝগড়া। টিসিবির ডিলারের বিক্রেতারা দুজন পুরুষকে দিয়ে একজন করে নারীকে পণ্য দিচ্ছেন। অপেক্ষমাণ নারীরা রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে অভিযোগ করছিলেন, কেউ কেউ দুটি করে প্যাকেজও নিচ্ছেন। ফলে শেষ দিকে অনেকেরই খালি হাতে ফেরার আশঙ্কা রয়েছে।

বিক্রেতারা জানালেন, ৭০০ লিটার করে তেল এনেছেন একটি ট্রাকে। দেখা গেল চিনি আর ডালের চেয়ে মানুষের বেশি প্রয়োজন বেশি রান্নার তেল। এটা কিনলে সাশ্রয়ও বেশি। দুপুর সাড়ে বারোটার মধ্যে সাড়ে ছয় শ লিটার তেল ফুরিয়ে গেছে বিডিআর ৩ নম্বর গেটের সামনে থাকা টিসিবির ট্রাকের। ডাল আর চিনি তখনো পর্যাপ্ত রয়েছে। সবাই পুরো প্যাকেজ নিচ্ছেন না। বাজারে সয়াবিন তেল এখন লিটার প্রতি বিক্রি হচ্ছে ১৪৫ থেকে ১৫৫ টাকায়। টিসিবির তেল লিটার প্রতি ১০০ টাকা। অর্থাৎ দুই লিটার তেলে প্রায় এক শ টাকা সাশ্রয়।

বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে আবার ঝগড়া শুরু হলো পুরুষের লাইনে। কেউ একজন নিয়ম ভঙ্গ করে সামনে এসেছেন। অপেক্ষারত অন্যরা তা মেনে নেবেন না, কেননা তাঁরাও দীর্ঘ সময় ধরে এই গনগনে রোদে অপেক্ষা করছেন। সবার মুখ লাল হয়ে তেতে উঠেছে। পুরুষদের এই ঝগড়া নারীদের জন্য আগে নেওয়ার সুযোগ করে দিল। কেউ কেউ বলছিলেন, বাসায় ছোট বাচ্চা রেখে এসেছেন। আগে ফেরাটা জরুরি।

পুরুষদের লাইনে পাওয়া গেল একজন খুদে ক্রেতাকে। সাদ্দাম পড়েন ক্লাস সেভেনে। সে এই প্রথমবারের মতো টিসিবির পণ্য কিনতে এসেছে। এত ছোট বাচ্চা ক্রেতা দেখে কেউ কেউ সন্দেহ করছিলেন, সঙ্গে হয়তো পরিবারের সদস্যরাও আছে। এ নিয়ে কথা উঠলে পরিস্থিতি কিছুটা উত্তপ্ত হলো। সাদ্দামের পেছন থেকে এগিয়ে এলেন একজন বয়স্ক মানুষ। সাদ্দামের হয়ে তিনি একটা প্যাকেজ নিয়ে ওর হাতে দিলেন। জানালেন তিনি সাদ্দামদের বাড়িওয়ালা। ওর বাসায় শুধু মা আর ছোট বোন আছে, তাই আসার মতো কেউ নেই। বাড়িওয়ালা হয়েও টিসিবির পণ্য নিতে এসেছেন জানতে চাওয়ায় তিনি কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়ে জানালেন, বাড়ি থাকলেই ভাড়াটে আছে কে নিশ্চিত করল? লকডাউনে তাঁর বাড়ির চারজন ভাড়াটের দুজনই বাসা ছেড়ে গ্রামে ফিরে গেছে।

সাশ্রয়ী পণ্য কিনতে এভাবে দাঁড়াতে খারাপ লাগছে কি না জিজ্ঞেস করেছিলাম সাদ্দামকে। গরমে লাল হয়ে যাওয়া মুখ নিয়ে ছোট ছোট দুই হাতে ডাল, চিনি, তেল ধরে রাখা শিশুটি বলল, খারাপ লাগছে না; কেননা এতে ওর বেকার হয়ে যাওয়া বাবার একটু সাহায্য হবে। ওর বাবা এখন বাড়িতে নেই। এতটুকু মানুষের পরিবারের প্রতি এই মমতাবোধ কিছুক্ষণের জন্য হলেও নীরবতা এনে দিল উপস্থিত ক্রেতাদের মধ্যে। এতক্ষণ যাঁরা অভিযোগ করছিলেন, এবার তাঁরাই সহানুভূতি নিয়ে তাকালেন শিশুটির দিকে। ততক্ষণে সে পণ্য নিতে পেরে বিজয়ীর বেশে দিয়েছে দৌড়। টিসিবির পণ্য নিতে আসা মানুষদের কেউ কেউ এবার একটু প্রশ্রয়ের হাসি হাসলেন। আসলে প্রয়োজনের জন্য এক কাতারে দাঁড়ানো মানুষেরা তখন যেন সবাই এক হয়ে যায়।

করোনা অতিমারির পর থেকে টিসিবির পণ্য ক্রেতার চিত্র বদলাচ্ছে। সংকোচ আর লজ্জা পরাজিত হয়েছে মানুষের প্রয়োজনের কাছে। মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষও উপস্থিত হচ্ছেন মিনিট্রাকের সামনে। গত কয়েক মাসে বেকার হয়েছেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী অনেক মানুষ। মধ্যবিত্ত থেকে নিম্ন মধ্যবিত্তে পরিণত হওয়া এই মানুষদের জন্য খাবারের মূল্যের এই সাশ্রয়টুকু কিছুটা হলেও স্বস্তির।

এমন একজনকে পাওয়া গেল এখানকার ক্রেতা হিসেবে। ময়মনসিংহের বেলি মালির পরিবারের সদস্য পাঁচজন। স্বামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী। আজিমপুরের বাসিন্দা বেলি মালির চাহিদাও সয়াবিন তেল। আগে টিসিবির পণ্যের জন্য লাইনে দাঁড়াতেন না। এখন আসতে হয়, এর জন্য তাঁর খারাপ লাগে কি না জানতে চাইলে বললেন, খারাপ লাগারে পাত্তা দেওয়ার সুযোগ নাই। একজনের সামান্য উপার্জনে এখন সংসার চালানো কঠিন। আগে নিজেও কিছু টুকটাক কাজ করতেন। লকডাউন বলে সে কাজ বন্ধ হয়েছে। তাই একটু কম দামে পণ্য নিতে এসেছেন।

বেলা একটার মধ্যে এখানকার ট্রাকের সব পণ্য প্রায় শেষ। বিক্রেতারা ক্রেতাদের আশ্বস্ত করছিলেন, এখন থেকে এক মাস প্রতিদিন আসবেন। এত হুড়োহুড়ি না করে আগামীকালও নিতে পারবেন। কিন্তু এই লকডাউনের মধ্যে তপ্ত রোদে বাড়ি থেকে একবার বেরিয়ে ট্রাক পর্যন্ত আসা মানুষগুলো অধীর হয়ে আছেন। ভয়ে আছেন, আবার যদি বন্ধ হয়ে যায়! ৫ জুলাই থেকে টিসিবির পণ্য বিক্রি শুরুর পর আবার বন্ধ হয়েছিল ১৯ জুলাই থেকে। ২৬ জুলাই থেকে শুরু হওয়া কার্যক্রম চলবে এক মাস ধরে। টিসিবির ট্রাকে প্রতি কেজি চিনি ও মসুর ডাল ৫৫ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ চার কেজি চিনি ও দুই কেজি ডাল কিনতে পারবেন। এ ছাড়া সয়াবিন তেল ১০০ টাকা লিটারে একজন ক্রেতা দুই থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ লিটার নিতে পারছেন।
কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, সচ্ছল ব্যক্তিরাও এ কাতারে শামিল হওয়ায় তাঁদের জন্য মাঝে মাঝে পণ্য পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। অনেকেই এখান থেকে কিনে বেশি দামে বিক্রি করেন দোকানে। তবে সে কথা তো আর ক্রেতা হিসেবে কেউ স্বীকার করবেন না। উপস্থিত অনেকেই কথা বলতে বিব্রত হন।

বেলি মালি আর সাদ্দামের মতো ক্রেতাদের পিছে রেখে ফেরার সময় দেখলাম, তেলের বোতল হাতে ঝুঁকে ঝুঁকে হেঁটে চলেছেন একজন বয়স্ক মানুষ। রোদে তাঁর হাতের চুড়িগুলো চিকচিক করছে। সেই অর্চনা ভদ্র। কুমিল্লায় যাঁর নিজের বাড়ি ছিল। কিছুটা ফসলি জমি ছিল এককালে। সন্তানেরা ব্যবসা করবেন বলে সেসব বিক্রি করে তাঁদের ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে দিয়েছেন। করোনার আগপর্যন্ত সব ভালোই চলছিল অর্চনা ভদ্রর সন্তানদের।

নিউমার্কেটে ভাড়ার দোকানে দুই ভাই পোশাক বিক্রি করতেন। রোজ দুপুরে বাড়ি ফিরে সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে ভাত খেতেন তাঁরা। লকডাউনে দোকান বন্ধ বলে একেবারে শূন্য হাতে ঘুরছেন এখন। তবু পরিচিতজনদের কাছে আত্মসম্মানটুকু বজায় রাখা জরুরি। তাই নিজেরা সাশ্রয়ী পণ্যের ক্রেতা হিসেবে লাইনে দাঁড়াবেন না। সন্তানদের সম্মান বাঁচাতে তাই অর্চনা ভদ্র দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকেন ট্রাকের সামনে। অপেক্ষা শেষে রিকশাভাড়া বাঁচিয়ে সদাইপাতি নিয়ে ঝুঁকে ঝুঁকে হেঁটে ফিরে চলেন নগরের কোনো এক সংকীর্ণ ঘরের জীর্ণ বাড়িতে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত