প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এদেশেও হিন্দু জমিদাররা কোরবানি দিতে বাধা দিত

শফিকুল ইসলাম, ফেসবুক থেকে,  (পূর্ববঙ্গে একসময় গরু কোরবানি দেওয়া যেত না। তাই ছাগল বা বকরি দিয়ে ঈদুল আজহা পালন করা হত। তাই বকরি ঈদ নামেই পরিচিত ছিল। এ বিষয়ে একটি গবেষণা প্রবন্ধ সংগ্রহ করে এখানে হুবহু উপস্থাপন করা হলো। এখানে আমার ব্যক্তিগত কোন দৃষ্টিভঙ্গি নেই)

ভারতবর্ষে মুসলমানি রীতিনীতি বিকাশ ঘটেছে আরবদের মাধ্যমে। যখন ৭১২ খ্রিষ্টাব্দে সেনাপতি মুহম্মদ বিন কাসিম অভিযান করেন রাজা দাহিরের বিরুদ্ধে। ইসলামের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ভারতবর্ষে প্রসার ঘটেছে এর ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানও। সেসবের ধারাবাহিকতার পথ ধরেই বাংলায় মুসলমানদের ব্যাপক প্রভাব প্রতিষ্ঠা পায় ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দে।
তবে পূর্ববঙ্গে অনেকটা সময় ধরেই মুসলমানদের আধিপত্য বিস্তার হয়নি। ফলে এখানে কোরবানির কথা তেমনভাবে খুব একটা শোনা যায় না।

সুলতান ফিরুজ শাহের রাজত্বকালে ৭০৩ হিজরি/১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে, সিকান্দর খান গাজী প্রথম সিলেট জয় করেছিলেন। আর মুসলমানদের সিলেট জয়ের পেছনে পরোক্ষভাবে নাকি কাজ করেছিল কোরবানি, বিশেষ করে বললে গরুর কোরবানি। যদিও এটা কতটুকু ঐতিহাসিকভাবে প্রামাণিত তা নিয়ে ইতিহাস জোর গলায় কিছু বলে না।

কথিত আছে সিলেট শহরের পূর্বদিকে টোল টিকর এলাকার বাসিন্দা ছিলেন শেখ বুরহানউদ্দিন। তিনি পুত্রসন্তানের আশায় আল্লাহর নামে একটি গরু কোরবানির মানত করেছিলেন। পুত্র হওয়ার পর তিনি নিজের মানত অনুযায়ী একটি গরু কোরবানিও করলেন। কোরবানি করা সেই গরুর এক টুকরা মাংস চিল ছোঁ মেরে নিয়ে যায়। আর তা ঘটনাক্রমে সিলেটের শাসক রাজা গৌড় গোবিন্দের প্রাসাদের সামনে পড়ে (কেউ বলেন রাজার মন্দিরে)।

রাজা ক্রোধান্বিত হয়ে গো হত্যাকারীকে খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন। অনুসন্ধানে শেখ বুরহানউদ্দিনকে দায়ী করে রাজার সামনে উপস্থিত করা হয়। শেখ বুরহানউদ্দিন গরু জবাইয়ের কথা স্বীকার করলে রাজা তার ডান হাত কেটে নেন এবং শিশুসন্তকে হত্যা করেন।

বুরহানুদ্দীন বাংলার প্রাচীন রাজধানী গৌড়ে গিয়ে সুলতান শামসুদ্দীন ফিরুজ শাহের কাছে এর বিচার চান। সুলতান তার ভাইয়ের ছেলে সিকান্দর খান গাজীর নেতৃত্বে একটি সেনাবাহিনী পাঠান। গৌর গোবিন্দ দুবার তাকে পরাজিত করেন। এরপর সুলতান তার সিপাহসালার নাসিরুদ্দীনকে যুদ্ধে যেতে নির্দেশ দেন। ঠিক সে সময়েই তিনশত ষাট জন সঙ্গী-সাথী ও মুরিদ নিয়ে বাংলায় হাজির হন হযরত শাহ জালাল (রঃ) এবং সিলেট অভিযানে মুসলমান সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে যোগ দেন। এবার মুসলমান সৈন্যরা জয়লাভ করে। গৌর গোবিন্দ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান এবং সিলেট মুসলমানদের শাসনাধীন হয়।

১২৫ বছর আগেও একই ধরনের এক ঘটনার কথা শোনায় মুন্সিগঞ্জে। ১১৭৮ সালে এখানে ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে আরব থেকে আসেন বাবা আদম। তার কোরবানি করা গরুর একটি টুকরা মাংসে রাজবাড়িতে ফেলে দেয় চিল। অপমানিত রাজা বল্লাল সেন স্বসৈন্যে বাবা আদমের বিরুদ্ধে অভিযানে নামেন। রাজা এসে দেখলেন বাবা আদম গভীর ধ্যানে মগ্ন। এই সুযোগে তাকে হত্যা করলেন রাজা।

তিনি মনের আনন্দে দরবেশের রক্ত শরীর থেকে পরিষ্কার করার জন্য নিকটবর্তী নদীতে নামলেন। এ সময় তার বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখা কবুতরটি হঠাৎ ছাড়া পেয়ে উড়ে গেল রাজবাড়িতে। কবতুর দেখে রাজার অন্তঃপুরের নারীরা মনে করলো যুদ্ধে বোধহয় রাজা মারা গেছেন। এটা বুঝে সবাই আগুনে আত্মাহুতি দিলেন। মনের দুঃখে রাজাও তাদের অনুসরণ করলেন। ফলে সেখানে মুসলমান রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এইসব ঘটনাও ইতিহাসে প্রমাণিত না।

ঘটনাগুলো থেকে অনুমান করে নেওয়া যায় পূর্ববঙ্গে গরু কোরবানির খুব একটা প্রচলন বোধহয় ছিল না। তবে এ অবস্থার পরিবর্তন হয়েছিল দিল্লির সুলতানদের দুর্বলতায়। এ সময়টা বাংলা স্বাধীন সালতানাত যুগ (১৩৩৮-১৫৩৮ খ্রিষ্টাব্দ) হিসেবেই পরিচিত। সেই সময়েও যে পূর্ববঙ্গ বাংলার সুলতানদের সার্বিক নজরের মধ্যে ছিল তা কিন্তু বলা যাবে না। কেননা শাসন কেন্দ্রের মূল কেন্দ্রবিন্দু তখনও ছিল হজরত পান্ডুয়া, গৌড়, রাজমহলের মতো অঞ্চলগুলো।

তারপরেও এখানে একটু একটু পরিবর্তনের হাওয়া লাগছিল। মুসলমানদের সংখ্যাধিক ঘটছিল। তবে তা বিশাল সংখ্যায় অবশ্যই নয়। পূর্ববঙ্গে মোগলদের আসা পর থেকে বলা যায় সে চিত্রের রূপ কিছু হলেও পাল্টাতে শুরু করে।

ঢাকা, রাজধানী হিসেবে গড়ে ওঠার পর (অর্থাৎ ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দ) থেকেই এ অঞ্চলের ধর্মীয় বিষয়গুলো সেভাবে মেনে চলার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে দৃষ্টিপাত করা হয়। সেই সঙ্গে এটাও বলা যৌক্তিক হবে না, ধর্মী আচার-ব্যবহার, অনুশাসনগুলো পালন করার ধারাটা যতটুকু না শাসনযন্ত্রের সঙ্গে জড়িত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও উচ্চবিত্তরা পালন করতেন ঠিক ততটুকুই স্থানীয় মুসলমানরা (বিশেষ করে সাধারণ মুসলমানরা) অংশগ্রহণহীনই থেকে যেতেন। এখানে সামর্থ্যের সঙ্গে অজ্ঞতারও খানিকটা যোগসূত্র থাকত বৈকি!
শাসনকেন্দ্র থেকে এতটা দূরে থেকেও মোগলরা উৎসবের কমতি বা উৎসব আনন্দ থেকে নিজেদের বঞ্চিত করার ব্যাপারে একেবারে পক্ষপাতী ছিলেন না।

ঈদের চাঁদ দেখা গেলেই মোগল রীতি অনুযায়ী কামান, গুলি ও আঁতশবাজি ফোটানো হত। ঈদুল আজহার দিনটি কীভাবে পালিত হত তার খানকিটা বর্ণনা পাওয়া যায় কর্মসূত্রে ঢাকায় অবস্থানকারী তৎকালীন মোগল সেনাপতি মির্জা নাথনের স্মৃতিকথা ‘বাহারিস্থান-ই-গায়বি’-তে।

ঈদের নামাজ, খতিবের খুতবাহ পাঠ শেষ হলে; লোকেরা (ধনী মোগলরা আরকি) তাকে (খতিবকে) সম্মান করে পোশাক-পরিচ্ছদ ও অর্থ-কড়ি উপহার দিত। টাকা-পয়সা বিলিয়ে দেওয়া হত শহরের গরীব-দুঃখীদের মধ্যে। অভাবগ্রস্ত লোকেরা সেই অর্থ দিয়ে নিজেদের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করতে পারত। পরস্পরের প্রতি সম্ভাষণে মুখরিত হয়ে উঠত আকাশ-বাতাস। এই দিনে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও রাজকর্মচারীরা একে অন্যের কাছে বেড়াতে এসে ঈদের শুভেচ্ছা জানাতো। কোনো কোনো সেনাপতি আনন্দ উৎসবের এই দিনে বন্ধু-বান্ধবদের আপ্যায়নের জন্য সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজনও করতেন। সেখানে আয়োজন থাকত বিরাট ভোজের (অবশ্যই তা কোরবানির পর)। এ ভোজানুষ্ঠানে উপস্থিত সুরেলা কণ্ঠের গায়ক-গায়িকা, মোহনীয় নর্তকী এবং নম্র স্বভাবের গল্প-কথকদের বেশ আপ্যায়ন করা হত। উৎসব চলত দুতিন দিনব্যাপী। শিল্প-কারখানার শ্রমিকরাও এ আনন্দোৎসবে থেকে বাদ পড়ত না। তাদের উপহার সামগ্রী দিয়ে তুষ্ঠ করা হত।

এর পরবর্তী সময়ে কোরবানি ঈদের তেমন কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে অনেকের ধারণা, শাসকশ্রেণি মুসলমান হওয়ায় ঢাকায় কোরবানি হত। ক্ষমতার পালাবদলে সেই অবস্থার পরিবর্তনও হয়েছিল।

বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে চলে যাওয়ায় পতন শুরু হয় ঢাকার। ফলে ঢাকার সীমানা ও জনসংখ্যাও সঙ্কুচিত হয়ে যায়। উনিশ শতকের প্রথম দিকে ঢাকার জনসংখ্যা তিন লাখে গিয়ে দাঁড়ায়। এসময় ঈদের (সম্ভবত রোজার ঈদের পাশাপাশি কোরবানির ঈদেও) মিছিল বের হত ঢাকার নায়েব নাজিমদের পৃষ্ঠপোষকতায়।

১৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দের পর এ ধারাও বন্ধ হয়ে যায়। আগেই বলা হয়েছে, সেই সময় স্থানীয় মুসলমানদের ধর্ম-কর্ম পালনটা সেভাবে বলতে গেলে ব্যাপক ছিল না। ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ঢাকার সিভিল সার্জন জেমস ওয়াইজ যেমনটা লিখেছিলেন, ‘কোরবানি ঈদের সময় লক্ষ্যা নদীর তীরে স্থানীয় গ্রামবাসী মিলিত হয়েছিলেন নামাজ পড়ার জন্য। কিন্তু সেটা কীভাবে করবেন তা তারা বুঝে উঠতে পারছিলেন না। আসলে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সর্ম্পকে তাদের অজ্ঞতাই এর জন্য দায়ী। অবশেষে নদীতে নৌকায় করে ঢাকার এক যুবক যাচ্ছিল; তাকে দিয়ে ঈদের জামাত পড়ানো হলো।’ ওয়াইজ সাহেবের এই কথার মধ্যে দিয়ে দুটো জিনিস বুঝা যায়। এক, ঢাকার বাইরে, মানে পূর্ববঙ্গের বাইরের অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় অনুষ্ঠান যথাযথভাবে অনুসরণ না করার একটা প্রবণতা ছিল, পাশাপাশি আরও ছিল ইসলাম ধর্মে লোকজ উপাদান প্রবেশ। দুই, ঢাকার মুসলমানদের মধ্যে ধর্মীয় কর্মকাণ্ড বেশ করে পালন করার একটা চর্চা ছিল। সে কারনে আমরা দেখতে পাই ঢাকার সেই যুবককে দিয়ে ঈদের জামাত পড়ানো হয়েছিল।

ঢাকার বাইরে কোরবানির ঈদ পালন করাটা বেশ কষ্টকর ছিল সেসময়ের মুসলমানদের জন্য। কেননা স্থানীয় হিন্দু জমিদাররা তাদের মুসলমান প্রজাদের কোরবানি দিতে বাধা দিতেন। সুধাকর পত্রিকা (৭ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯০) সেরকমটাই জানাচ্ছে;
‘বকরি ঈদেও উর্ধ্বতন হিন্দু কর্মচারী এবং জমিদারদের আমলারা বগুড়ার নারহাট্টার মুসলমানদের কোরবানি দিতে দেয়নি। মুসলমানদের উচিত এ ব্যাপারে লে.গভর্নরের কাছে স্মারকলিপি পেশ করা।’

মুসলমানদের কোরবানি করতে না দেওয়ার ফলে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে তিক্ততা বাড়তে থাকে। ইংরেজ সরকার তা দেখেও না দেখার ভান করত। কেননা হিন্দু-মুসলমানদের এই দ্বন্দ্ব তাদের শাসনকার্যের সুবিধার্থে একান্ত প্রয়োজন ছিল।

ফরায়েজি আন্দোলন এবং মুসলমানদের বিভিন্ন ধর্মীয় সচেতনতামূলক প্রচারণায় মুসলমানদের ধর্মীয় অত্যাবশ্যকীয় অনুশাসন বা ফরজ কাজ সর্ম্পকে আরও সচেতন হয়ে ওঠে। ফলে হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্বও বৃদ্ধি পাচ্ছিল দিনকে দিন।

তবে ঢাকা এসব তর্ক-বিতর্কের বাইরেই ছিল বলা যায়। সম্ভবত ঢাকায় মুসলমান অধিবাসীদের সংখ্যাধিক্য এবং ক্ষমতাশীল মুসলমান নবাবদের জন্য সেটা সম্ভব হয়েছিল। সে কথাই উল্লেখ করে পত্রিকা ‘সারস্বতপত্র’ লিখেছে,
‘এটা সত্যিই যে, ঢাকার সমাজের অনেক ত্রুটি ও দুনার্ম আছে। কিন্তু এখন যখন দেশে গরু কোরবানি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলন চলছে, সে সময় ঢাকা এসব থেকে মুক্ত। ঢাকার হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে নিখুঁত ভালো সর্ম্পকই বিদ্যমান ছিল। উভয়ে উভয়ের ধর্মীয় উৎসবাদিতে যোগ দেয় এবং কেউ কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিতে চায় না।’ (৩০.৩.১৮৯০)

ঢাকায় হিন্দু-মুসলমানদের সাম্য অবস্থা বিরাজ করলেও ঢাকার বাইরের অঞ্চলগুলোসহ গোটা ভারতবর্ষেই গো-গত্যার বিরুদ্ধে জোট বা সমিতি গড়ে উঠেছিল। এগুলো ‘গো-হত্যা রিবারণী সভা’, ‘গো-রক্ষিণী সভা’ নামে পরিচিত ছিল।

দুই সম্প্রদায়ের মধ্যকার উত্তেজনাময় সময় মধ্যপন্থাবলম্বী যে একেবারেই ছিল না তা কিন্তু নয়। কখনও কখনও সংবাদপত্রই সেই দায়িত্ব পালন করতো।

যেমনটা ‘ঢাকা প্রকাশ’ করেছিল, ‘কোনো মুসলামান সহযোগী বলেন, ভণ্ড হিন্দুরাই এই হাঙ্গামার নেতা। আমরা বলি, বস্তুত তা নয়। যুগবেশে এখন সমস্ত জাতিরই ধর্ম্ম কার্য্যে ভণ্ডামি প্রবেশ করিয়াছে। যাহা শাস্ত্রের কথা, তাহা যথাযথ প্রতিপালিত হয়না, হয় তাহার ভেল্কি। পূজার সময় নৈবেদ্য আসে, ঢাকঢোল বাজে মন্ত্র পড়ে; কিন্তু ভক্তি-শ্রদ্ধার সঙ্গে অনেক হিন্দুরই দেখা হয় না। মুসলমানদিগের মধ্যেও যে সেই প্রলয় প্রবেশ করে নাই; এত কথার পর বোধকরি কোনো মুসলমান তাহা বলিতে পারিবেন না।… মুসলমানের বকরি ঈদে কোরবানি (কিন্তু গরু কিনিয়া কোরবানি করিবার বিধি না) অবশ্য কর্তব্য। এখন উভয়েই ধর্ম্মের আদেশ উভয়কে অনুপ্রাণিত করিতেছে, যদি আপস চাহেন, তবে উভয়েরই কিছু কিছু আবদার ছাড়িয়া দিতে হইবে।’ ১৬ আশ্বিন ১৩০০; ১ অক্টোবর ১৮৯৩ গরুর কোরবানির বিষয়টি হিন্দু-মুসলমানদের কাছে এক ধরনের জাতি ভিত্তিক গৌরবের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, পরবর্তী সময়ে ‘গরু কোরবানি’ ইস্যু হিসেবে থমকে পড়লে এই সম্প্রদায় অন্য বিষয়গুলো (যেমন নামাজের সময় মসজিদের সামনে কীর্তন করে যাওয়া, দুর্গাপূজার সময় বাধা দেওয়া প্রভৃতি) নতুন করে সামনে একে অপরের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে।

যদিও এ বিষয়গুলো কোনোটিই নতুন কিছু ছিল না। এসবের মধ্যে দিয়েই হিন্দু-মুসলমান প্রায় হাজার ধরে একে অপরের প্রতিবেশি হিসেবে বাস করেছে।

এ ব্যাপারে ইতিহাসবিদ ড. মুনতাসীর মামুন যথাযথই বলেছেন, ‘গরু কোরবানির ব্যাপারটা দুই সম্প্রদায়ের ধর্মীয় জিদে পরিণত হয়েছিল। তার ওপর ওই সময় দুই সম্প্রদায়ের ধর্মীয় পুনরুত্থান জুগিয়েছিল এতে ইন্ধন। গত শতকের শেষদিকে বিষয়টি জড়িয়ে গিয়েছিল রাজনীতির সঙ্গে।’

মুনতাসীর মামুনের এই উক্তির সত্যতা পাই ‘সারস্বতপত্র’য়ের ১৮৯০ সালের ৩০ মার্চের সংখ্যায়, ‘হিন্দু-মুসলমান শক্রতা বাড়ছে। আগে প্রয়োজন না হলে মুসলমানরা গো-হত্যা করত না আর হিন্দু তা সহ্য করত। কিন্তু দু’পক্ষই এখন অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। মনে হতে পারে, গো-হত্যাই এদের শত্রুতার মূল কারণ। কিন্তু মূল কারণ, দু’পক্ষেরই ধর্মীয় শত্রুতার পুর্নজারণ। কিন্তু এই জাগরণের জন্য দায়ী কারা? কংগ্রেসকে ঘৃণা করে এমন কিছু অ্যাংলো ইন্ডিয়ান এবং কিছু কর্মকর্তা।’

এসব তর্ক-বির্তক, নানা উদ্যোগের মধ্যদিয়েও ১৯৪৭ সালের আগ মুহূর্ত পর্যন্তু পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশে হিন্দু জমিদাররা নিজেদের জমিদারিতে কোরবানি বা গো-হত্যা করতে দিত না। জমিদারদের অত্যাচার আর ধর্মী অনুশাসন মানতে গিয়ে অনেকেই ‘বকরি’ কোরবানি দিতো। আর এভাবেই ব্রিটিশ আমলে ‘ঈদুল আজহা’ স্থানীয়ভাবে ‘বকরির ঈদ’য়ে পরিণত হয়েছিল।

আর এই তথ্যের সততা পাই ১৯০৪ সালের দিকে ঢাকার নবাব পরিবারের এক সদস্য কাজী আবদুল কাইউমের ডায়েরি থেকে।
সেবছরের কোরবানির ঈদ ছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি। তিনি লিখছেন, ‘আজ রোববার, পবিত্র বকরির ঈদ। নামাজ শেষ আমিও অন্যান্যের মতো নওয়াবের সংগে কোলাকুলি করি। নওয়াব সাহেব আমাকে আদেশ দেন অন্যান্যকে নিয়ে বিনা খরচে ক্ল্যাসিক থিয়েটারের নাটক দেখার জন্য।’

এই দিনলিপি থেকে অনুমান করে নেওয়া যায়- সেসময়ে কোরবানির ঈদ, ‘বকরির ঈদ’ হিসেবে ভালোই পরিচিতি পেয়ে গিয়েছিল। সেটা এতোটাই যে ঢাকার লোকজনদের কোরবানি দিতে তেমন কোনো ঝামেলা না হলেও তারাও এই কোরবানির ঈদকে ‘বকরির ঈদ’ই বলতেন।

১৯৪৭য়ে ঢাকা পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী হওয়ায় এটির জাঁক যত বেড়েছে, কোরবানির মাত্রাটাও হয়তো ততটাই বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর নব্য ধনীরা কোরবানিকে ব্যবহার করেছে নিজেদের বিত্ত-বৈভব আর ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে। সর্বশ্রেষ্ঠ ত্যাগের যে প্রতীকী মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কোরবানি মুসলমানদের জন্য আল্লাহ ফরজ করে দিয়েছেন, সেই উদ্দেশ্য থেকে লোক দেখানো কোরবানি আজ অনেক দূরে সরে গেছে। এই লোক দেখানোর কোরবানি পরিহার করে নিজেদের ভেতরের পশুকে কোরবানি দেওয়ার চেষ্টা করাই আমাদের জন্য মঙ্গলময় হবে।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত