প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সুলভ-সস্তা হলেও ভোক্তাঋণ বাড়াতে পারছে না ব্যাংক

বণিক বার্তা: উচ্চসুদহারসহ নানা শর্তের বেড়াজালে আবদ্ধ ছিল ভোক্তাঋণ। পণ্যে বৈচিত্র্যের অভাবের পাশাপাশি এ ঋণের ব্যাপ্তিও ছিল ছোট। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেঁধে দেয়া শর্ত ও মহামারীসৃষ্ট আর্থিক দুর্যোগে ভোক্তাঋণের ক্ষেত্রে উদার হয়েছে ব্যাংকগুলো। এ ঋণের সুদহারও নামিয়ে আনা হয়েছে ইতিহাসের সর্বনিম্নে। তার পরও প্রত্যাশিত গ্রাহক খুঁজে পাচ্ছে না ব্যাংক।

২০২০ সালের ১ এপ্রিল থেকে ভোক্তাঋণের সর্বোচ্চ সুদ ৯ শতাংশ। কোনো কোনো ব্যাংক এ মুহূর্তে এ ঋণের সুদহার ৭-৮ শতাংশেও নামিয়ে এনেছে। তার পরও প্রবৃদ্ধি আসছে না ভোক্তাঋণে। গত বছর ভোক্তাঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৬ শতাংশ। অথচ উচ্চসুদহার সত্ত্বেও ২০১৭ সালে ভোক্তাঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৬ শতাংশের বেশি।

সমাজের উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ওপর ভর করে গড়ে উঠেছে ব্যাংকগুলোর ভোক্তাঋণের কাঠামো। কিন্তু করোনাসৃষ্ট আর্থিক দুর্যোগে পর্যুদস্ত হয়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণী। আয় কমলেও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ব্যয় বেড়েছে। করোনার প্রভাবে চাকরিও হারিয়েছেন অনেকে। বেতন কর্তনের মুখে পড়েছেন বৃহৎ করপোরেটে চাকরি করা কর্মীও। এ অবস্থায় ভোগ ব্যয় কমিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করছে মধ্যবিত্তরা। ঋণ নেয়ার সক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণেই চেষ্টা করেও ভোক্তাঋণের বিতরণ বাড়ানো যাচ্ছে না বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা।

ক্রেডিট কার্ড, গাড়ি ও ফ্ল্যাট কেনার ঋণের পাশাপাশি ব্যক্তিগত ঋণকে ভোক্তাঋণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেশের প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সংগতি রেখে কয়েক বছর ধরেই দেশে ভোক্তাঋণের চাহিদা বাড়ছিল। ভোক্তাঋণের প্রবাহ বাড়াতে জনবল নিয়োগ ও অবকাঠামো গড়ে তুলছিল ব্যাংকগুলোও। কিন্তু নভেল করোনাভাইরাস পুরো ভোক্তাঋণের কাঠামোকেই নড়বড়ে করে দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক থেকে নেয়া ব্যক্তিগত ঋণে মধ্যবিত্তরা টিভি-ফ্রিজ, আসবাবসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় গৃহস্থালি পণ্য কেনে। কিন্তু মহামারীর ধাক্কায় দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আয়ের পথ সংকুচিত হয়ে এসেছে। এ কারণে মধ্যবিত্তরা ভোগ ব্যয় কমিয়ে জীবননির্বাহের চেষ্টা করছে। ব্যক্তি খাতের ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার নেতিবাচক প্রভাব দেশের ভোক্তাবাজারে উৎপাদন ও বিপণনের ওপর পড়েছে।

চাহিদা পড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোও যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন ভোক্তাঋণ বিতরণে বেশি সতর্ক বলে জানান মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, ক্রেডিট কার্ডসহ ভোক্তাঋণের মূল গ্রাহক সমাজের উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী। চলমান মহামারী উচ্চবিত্ত শ্রেণীর জীবনযাপনে খুব বেশি প্রভাব না ফেললেও মধ্যবিত্ত অংশ বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। দেশের অনেক ভালো কোম্পানিও এ সময়ে কর্মীদের বেতন-ভাতা কমিয়েছে। অনেকে চাকরিচ্যুতির শিকার হয়েছেন। সামগ্রিকভাবে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ব্যয় বাড়লেও আয় কমে গেছে। ফলে ভোক্তাঋণের চাহিদাও অনেক কমে এসেছে। আবার ব্যাংকগুলোও এ খাতে ঋণ বিতরণে অনেক বেশি সতর্ক। ব্যাংক ও ভোক্তা উভয়ের রক্ষণশীলতার নেতিবাচক প্রভাবে ভোক্তাঋণের প্রবৃদ্ধিতে ভাটা পড়েছে।

ভোক্তাঋণের উচ্চসুদহার নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ ছিল দীর্ঘদিনের। অনেক ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের সুদহার ছিল ৩০ শতাংশেরও বেশি। ২০২০ সালের ১ এপ্রিল থেকে ক্রেডিট কার্ড ছাড়া সব ধরনের ব্যাংকঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ শতাংশে বেঁধে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের সব ব্যাংক ভোক্তাঋণের সুদহারও ৯ শতাংশের নিচে নামিয়ে এনেছে। আমানতের সুদহার ইতিহাসের সর্বনিম্নে নেমে আসায় কোনো কোনো ব্যাংক বর্তমানে ভোক্তাঋণ বিতরণ করছে মাত্র ৭-৮ শতাংশ সুদে। যদিও এ ব্যাংকগুলোই ২০১৯ সালের আগে ১৫-২০ শতাংশ সুদে ভোক্তাঋণ বিতরণ করেছিল। সুদহার কমলে ভোক্তাঋণের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কথা। যদিও বাজারে এর বিপরীত চিত্রই দেখা যাচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০১৭ সালে ব্যাংক খাতে ভোক্তাঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৬ শতাংশেরও বেশি। ২০২০ সালে ভোক্তাঋণের এ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। চলতি বছরের প্রথমার্ধে ভোক্তাঋণের প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়লেও করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে তা আবারো সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

বর্তমানে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ভোক্তাঋণের পরিমাণ প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা। ভোক্তাঋণের বড় অংশই ব্যক্তিগত ঋণ। সাধারণত চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতার পরিমাণ বিচার করে ব্যাংকগুলো ব্যক্তিগত ঋণ দেয়। ছোট ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ব্যবসার পরিধি বিচারে ব্যক্তিগত ঋণ দেয় ব্যাংকগুলো। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ব্যক্তিগত ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। ভোক্তা খাতের গৃহ নির্মাণ ঋণ আছে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার। এছাড়া সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার ঋণস্থিতি আছে ব্যাংকগুলোর বিপরণকৃত ক্রেডিট কার্ডে। গাড়ি কেনার জন্য গ্রাহকদের মাঝে বিতরণকৃত ঋণ রয়েছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৫ সাল-পরবর্তী সময়ে দেশে ভোক্তা খাতের ঋণে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়। ২০১৬ সালে ভোক্তাঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। এরপর ২০১৭ সালে ভোক্তা খাতের এ ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। ২০১৮ সালেও ভোক্তাঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১৪ শতাংশ। ২০১৯ সালে ভোক্তাঋণের প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমলেও তা ছিল ১২ শতাংশের বেশি। কিন্তু ২০২০ সালে ভোক্তাঋণের এ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে।

ভীতিকর পরিস্থিতির কারণেই ২০২০ সালে ব্যাংকগুলো ভোক্তাঋণ বিতরণে দেখেশুনে হেঁটেছে বলে মন্তব্য করেন দ্য সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা এ ব্যাংকার বলেন, করোনার মতো বৈশ্বিক মহামারী আমাদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছে। গত বছর সাধারণ মানুষের মতো ব্যাংকারদের মধ্যেও আতঙ্ক ছিল। পাশাপাশি দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জীবনযাপনেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। একদিকে চাহিদা পড়ে যাওয়া, অন্যদিকে ব্যাংকারদের বাড়তি সতর্কতার কারণে ভোক্তাঋণের প্রবৃদ্ধি কমে গিয়েছিল।

ক্রেডিট কার্ডসহ ভোক্তাঋণ বিতরণে সিটি ব্যাংক বরাবরই সামনের সারিতে থাকে জানিয়ে মাসরুর আরেফিন বলেন, ২০২০ সালে কমলেও চলতি বছর আমরা ভোক্তাঋণ বিতরণে বাড়তি জোর দিয়েছি। চলতি বছরের প্রথমার্ধেই আমরা ভোক্তাঋণ বিতরণ করেছি ৪২১ কোটি টাকার। জুন শেষে সিটি ব্যাংকের বিতরণকৃত মোট ঋণের ১৮ শতাংশই ছিল রিটেইলে। চলতি বছরের বাকি সময়েও আমরা ভোক্তাঋণ বিতরণ ও আদায়ে বাড়তি গুরুত্ব দেব। তবে কোনোভাবেই অন্য ব্যাংকের ভোক্তাঋণ আমরা অধিগ্রহণ করব না।

একাধিক ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী জানান, কস্ট অব ফান্ড বা তহবিল ব্যয় কমে যাওয়ায় বেসরকারি খাতের সামনের সারির কিছু ব্যাংক সুদহার কমিয়ে দিয়ে অন্য ব্যাংকের গ্রাহক টানছে। যেসব ব্যাংকের তহবিল ব্যয় ৩ শতাংশের নিচে তারা ৭-৮ শতাংশ সুদেও ভোক্তাঋণ দেয়ার প্রস্তাব করছে। এক্ষেত্রে যে ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যয় এখনো ৫ শতাংশের বেশি সেসব ব্যাংক গ্রাহক ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত