প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

খান আসাদ: বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও মতাদর্শের সম্পর্ক কী?

খান আসাদ: মানুষের (হোমোসেপিয়েন্স) পূর্বপুরুষের হাতিয়ার বা প্রযুক্তি ব্যবহার করার সূচনা বিশ লক্ষ বছরের মতো। মানুষ বা হোমোসেপিয়ন্সের বয়স দুই লাখ বছরের মতো। মানুষ মাটির পাত্র তৈরি করেছে মাত্র ২৫ হাজার বছর আগে। মানুষ পশুপালন, কৃষি ও পাথরের বা কাঠের হাতিয়ারের বদলে, ধাতুর (লোহা) হাতিয়ার বা অস্ত্র তৈরি করেছে মাত্র সেদিন বারো হাজার বছর আগে থেকে সাত হাজার বছর আগে। ‘আধুনিক’ বিজ্ঞানের জন্ম ১৫৭২ সালে, যখন জ্যোতির্বিদরা নতুন একটি নক্ষত্র আবিষ্কার করলেন। ‘আধুনিক’ বিজ্ঞান মানে, নক্ষত্র সম্পর্কে যা ধারণা করা হলো, সেটা ‘প্রমাণের’ ভিত্তিতে। যে প্রমাণে অন্য বিশেষজ্ঞরা একমত হয়। এবং এই সুনিশ্চিত জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে, নিয়মের আবিস্কার বা পে ্রডিকশন করা যায়। সহজ কথায় বলি, যেমন- মা জানে আগুনে হাত দিলে বাচ্চার হাত পুড়ে যাবে, মা এই ক্ষেত্রে ‘বিজ্ঞানী’ যে প্রেডিকশন করতে পারে। আধুনিক বিজ্ঞান এখন থিওরি। যে থিওরি দিয়ে নতুন কিছু বানানোর প্রেডিকশন করা যায়। কম্পিউটার, একেফর্টিসেভেন, এটম বোমা, বা স্পেসস্টেশন কিংবা মহাশূন্যে যাওয়ার রকেট সবই হাতিয়ার। হাতিয়ার মানে যা দিয়ে কিছু করা যায় বা তৈরি করা হয়। এটি দ্রব্য, সার্ভিস বা জ্ঞান নানা কিছু হতে পারে। এই হাতিয়ার তৈরির পিছনে আছে বিজ্ঞান, ক্লাসিকাল মেকানিক্স ও কোয়ান্টাম মেকানিক্স, নিউটন ও আইনস্টাইন প্রধান আরও অনেকে রয়েছে। তাহলে যে কোনো প্রযুক্তি হচ্ছে বিজ্ঞানের তথা বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমের অবদান। এই শ্রম আবার গড়ে উঠেছে, আগের প্রজন্মের বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানের ভিত্তিতে বা মৃত শ্রমের পরম্পরায়। বিজ্ঞানীরা বিজ্ঞানী, কোনো পুঁজিবাদী নয়।

বিজ্ঞানের ও প্রযুক্তির বিকাশের ক্ষেত্রে, পুঁজিবাদী বা সমাজতন্ত্রী বা অন্য কোনো মতাদর্শের ভূমিকা কি? আদি সাম্যবাদী সমাজে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (হাতিয়ার) ছিলো, গোত্রের বা সমাজের সকলের জীবনের জন্য। অর্থাৎ লোহার হাতিয়ার দিয়ে যে শিকার করা হলো, সেই শিকার করা পশুর মাংসে সকলের অধিকার আছে। শ্রেণি সমাজের উদ্ভবের ফলে, যেমন দাস সমাজে প্রযুক্তির উদ্দেশ্য ও মালিকানা বদলে গেলো। প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলো মানুষের নিজেদের একাংশের বিরুদ্ধে ও অনেক প্রযুক্তি হলো শোষণের, বৈষম্যের ও সহিংসতার হাতিয়ার। শ্রেণি সমাজ যা বর্তমানে পুঁজিবাদ, সেটা আছে বলেই, এখন যুদ্ধের প্রযুক্তি অনেক অনেক। প্রযুক্তি দিয়ে মানুষ মারা শুরু হলো। পুঁজিবাদ বা শ্রেণিসমাজ থাকলে এই মানুষ মারা বন্ধ হবে না। এখন মানব সভ্যতা যদি শ্রেণি বিভক্ত না হতো, তাহলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরিত্র কেমন হতো? যেমন- ঊ=গঈ২ বিজ্ঞানের তত্ত্ব দিয়ে এটম বোমাও বানানো যায় আবার কোয়ান্টাম কম্পিউটার ও বানানো যায়। শ্রেণি শোষণে ও যুদ্ধ না থাকলে, মানুষ আরো হাজার বছর এগিয়ে থাকতে পারতো। মানুষের শ্রেণিস্বার্থ ও লোভের কারণে তা হয়নি। রাজনৈতিক মতাদর্শ, কি প্রযুক্তির কোথায় ব্যবহার হবে, এই সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করতে পারে মাত্র। যেমন মডেল মসজিদে বিনিয়োগ, সাবমেরিনে বিনিয়োগ নাকি রোগ বা মহাকাশ গবেষণায় বিনিয়োগে। পুঁজিবাদে বিশ্বাসীরা সেই ধরনের প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করবে, যা তার মুনাফা ও শ্রেণিস্বার্থে ও আধিপত্যের জন্য প্রয়োজন। সোভিয়েত ইউনিয়ন মহাকাশ বিজ্ঞান গবেষণার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্রও তৈরি করতে হয়েছে, পুঁজিবাদ না থাকলে পুরো সম্পদ মানবিক প্রযুক্তির কাজে লাগাতে পারতো। চার্চিলের ভাষায়, স্ট্যালিন লাঙ্গল ধরনের প্রযুক্তির একটি দেশকে আণবিক বোমার প্রযুক্তি এনে দিয়েছে।

রাশিয়ার সম্পদ যুদ্ধ খাতে যাওয়ার ফলে, অন্যখাতে সংকট ছিলো। চীন এই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে যুদ্ধ প্রযুক্তির সঙ্গে অন্যদিকে (অবকাঠামো, কোয়ান্টাম কম্পিউটর, মহাকাশ গবেষণা) মন দিয়েছে। মতাদর্শের ফলে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হয়, ফলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুফল সব মানুষ পেতে পারে, অথবা পারে না। মতাদর্শের ফলে, প্রযুক্তি হতে পারে মানবিক ও পরিবেশসম্মত, অথবা প্রকৃতি ধ্বংসের। প্রযুক্তি হতে পারে অনেক অনেক বেশি মাত্রায় বিকশিত, মানবিক, যদি তা যুদ্ধের খাত থেকে সরে আসে। মনে করুন, বাংলাদেশের মাদ্রাসা ও স্কুলগুলো সব বিজ্ঞানের গবেষণাগার। সকল শিশুরা প্রয়োজনীয় মৌলিক দ্রব্য ও সেবা পাচ্ছে (যা দেয়া সম্ভব, এবং যা এখন পুঁজিবাদের কারণে সম্ভব হচ্ছে না), সকলে বিজ্ঞানের চর্চা করছে, তাহলে কীরকম একটি সভ্যতা আমরা পেতে পারি? পুঁজিবাদ থেকে মুক্তি মানে, বিজ্ঞানের এক অসাধারণ বিকাশের সুযোগ, যা মানুষকে এক নয়া বিকশিত সভ্যতায় নিয়ে যেতে পারে। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত