প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আরিফ জেবটিক: ইভ্যালি নিয়ে কথা বলা মুশকিল

আরিফ জেবটিক: ইভ্যালি নিয়ে কথা বলার মুশকিল হচ্ছে, হাজার হাজার মানুষের টাকা ওখানে আছে, যারা অনিশ্চয়তায় ভুগছে। তাঁরা মনে করেন যদি হাউকাউ কম হয়, তাহলে তাঁরা কোনো না কোনোভাবে তাঁদের প্রোডাক্ট অথবা টাকা ফেরত পাবেন, তাই কেউ এ নিয়ে কথা বললে উনারা মারমুখি হয়ে যান।

কিন্তু আপনাদেরকে একটা জিনিস বুঝতে হবে যে, দুনিয়ার ব্যবসা বানিজ্যের সবচাইতে গোড়ার কথা হচ্ছে যত দামে পন্য কিনবেন, তার থেকে বেশি দামে বিক্রি করতে হবে-নইলে সেই ব্যবসা টিকবে না।

অনেক সময় মার্কেট শেয়ার দখল করার জন্য কিংবা কম্পিটিটরদেরকে হটিয়ে দেয়ার জন্য লোকসানে পন্য বিক্রি হয়। কিন্তু সেটা করে জায়ান্ট কোম্পানিগুলো, যারা একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত লস দেয়ার পর তাঁদের কীভাবে রিকভারি হবে, সেটাও শুরু থেকেই প্ল্যান করে রাখে।

ইভ্যালির ক্ষেত্রে কিন্তু এটি যৌক্তিক কথা নয়। কারণ বাংলাদেশের অনলাইন মার্কেট প্লেসে এমন কোনো বড় প্রতিযোগিতা ছিল না বা এই সেক্টর এত বড়ও নয়, যেটির নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্য শতশত কোটি টাকা বার্ণ করার দরকার আছে। তারপরও যদি ধরে নেই যে মার্কেট ডোমিনেট করার জন্য এটি করা হয়েছে, সেক্ষত্রে এটি শুরু থেকেই এঞ্জেল ইনভেস্টরদের টাকা হওয়ার কথা। মার্কেট থেকে ক্রেতার টাকা তুলে এনে সেটা খরচ করার সিস্টেমটা আসলে কোনো ভাবেই সাস্টেইনেবল মডেল নয়, এটা জানার মতো বিদ্যাবুদ্ধি আইবিএ গ্রাজুয়েট প্রতিষ্ঠাতার অবশ্যই আছে।

সুতরাং ইভ্যালিকে একসময় ডিসকাউন্ট ব্যবসা থেকে সরে আসতেই হতো, এবং ইভ্যালির এমডি এখন দাবিও করছেন যে তাঁরা সেদিকেই যাচ্ছিলেন।

কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে, ইটস অলরেডি টু লেট !

ইভ্যালি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম রিপোর্ট নিয়ে আমি চিন্তিত হইনি। ৬৫ কোটি টাকার চলতি মূলধন নিয়ে ৪০৩ কোটি টাকার দায় নিয়ে অপারেশন চালিয়ে যাওয়া চ্যালেঞ্জিং, কিন্তু অসম্ভব কিছু নয়।

কিন্তু বড় সমস্যা হচ্ছে, ইভ্যালি এমন মডেলে বিজনেসটা অপারেট করে যেখানে চলতি মূলধনের সাথে দায়ের গ্যাপ কমে আসার কোনো সুযোগ দেখি না। চলতি সিচুয়েশনে এই একাউন্ট বুক দেখে ব্যাংকগুলো ঋণ দেবে না। এই অবস্থায় এই গ্যাপ মেটানো সম্ভব বাইরে থেকে ইনভেস্টর এনে অথবা সাপ্লায়ারদের কাছ থেকে বড় ক্রেডিট লাইন তৈরি করে।

এ দুটোই এখন অনেকখানিই অসম্ভব। কারন বাজারে যখন কোম্পানির নিয়ে ফিসফাস শুরু হয়, তখন কিন্তু কোম্পানির প্রভাব ধীরেধীরে কমে না, একেবারে ‘সাইক্লোন’ কিংবা ‘আর্থকোয়েক’ এর মতোই ধ্বসে যায়। তখন কোনো কিছুই যেন কাজ করে না। এই মুহুর্তে বড় কোম্পানিগুলোর কোনো বোর্ডেই ইভ্যালিকে ক্রেডিট লাইন বাড়ানোর কোনো প্রস্তাব পাশ করানো যাবে বলে মনে হয় না। সাধারন সাপ্লায়াররা তো ইতিমধ্যেই পিছটান দেয়া শুরু করেছে। ( কিছু কিছু জিনিস তো একেবারেই অযৌক্তিকভাবেই প্রতিকূলে যাবে। যেমন ধরা যাক, কয়েকটি ব্যাংক বলেছে যে তাঁরা ডেবিট কার্ডেও ইভ্যালি থেকে কিছু কিনতে দেবে না। এটা কীভাবে সম্ভব! ডেবিট কার্ড মানে আমার একাউন্টে আমার টাকা। আমি যদি বেআইনি কিছু না কিনি তাহলে সে টাকা আমি ইভ্যালিতে নষ্ট করি নাকি ১ লাখ টাকার ইলিশ মাছ কিনি তাতে ব্যাংকের কী! কিন্তু এ ধরনের প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও ইভ্যালিকে যেতে হচ্ছে।)

বাইরের ইনভেস্টর পাওয়া নিয়ে ইভ্যালি কাজ করছে কী না জানি না, কিন্তু এখন এরকম কোনো খবর বেরুলে সেটাকেও লোকজন ধাপ্পাবাজিই মনে করবে।

আমার এই ছোট্ট লেখাটার উদ্দেশ্য হচ্ছে, আপনারা যারা ইভ্যালি থেকে পন্য কিনবেন বলে ভাবছেন, তাঁরা আপাতত না জড়ালেই ভালো করবেন। টুকিটাকি কেনাকাটা অন্য জিনিস, কিন্তু বড় অংকের কোনো কিছু কিনলে জেনেশুনে ঝুঁকি নিবেন। এই প্রতিকূলতা ইভ্যালি কাটিয়ে উঠতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না।

মিডিয়াগুলোতে কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন দিয়ে আর দুনিয়ার সব গায়ক, ক্রিকেটারদেরকে ফ্রি মোটরবাইক চড়িয়ে এই সংকট থেকে উদ্ধার হওয়ার কোনো উপায় নেই।

আর যারা ইতিমধ্যেই ‘রিসেলার’ নাম নিয়ে ধারদেনা করে লাখলাখ টাকা ইনভেস্ট করে বসে আছেন, তাঁরা ‘এমআরপি দেতে হবে, এমআরপি দেতে হবে’- এই স্লোগান বাদ দিয়ে, যে টাকা ঢুকিয়েছেন সেটাই বের করার দিকে বেশি মনোযোগ দেয়াটা ভালো হবে।
আমি জানি আমার এই লেখা অধিকাংশ মানুষজনের ভালো লাগবে না। লোভ আর ভয় হচ্ছে মানুষের সবচাইতে বড় দুই মোটিভেশন, এই দুটোর কোনোটাতে তাড়িত মানুষ যুক্তি শুনে না।

এই গালি খাওয়া আমার নিয়তি। শেয়ার মার্কেটের সময়ও গালি খেয়েছি, এবারও না হয় আরেকবার খাই – কোনো সমস্যা নেই।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত