শিরোনাম
◈ মধ্যপ্রাচ্যে গভীর সংকট, সমাধান খুঁজতে এক টেবিলে আরব-ইসলামী দেশগুলো ◈ স্বজনের টানে ঘরমুখো মানুষ, কোথাও যানজট কোথাও স্বস্তি ◈ ঈদ ছুটিতে রাজধানীতে অপরাধের ঝুঁকি, সতর্কতায় জোর পুলিশের ◈ জেট ফুয়েলের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা থেকে সরে এলো বিইআরসি ◈ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় অংশ নিয়ে সমঝোতা নাগালের মধ্যে ছিল বলে মনে করেছেন যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ◈ দক্ষিণ কোরিয়াকে হা‌রি‌য়ে নারী এশিয়ান কাপের ফাইনালে জাপান  ◈ মে‌হেদী হাসান মিরাজের পক্ষে রায় দিলো এমসিসি ◈ ট্রেন দুর্ঘটনায় ক্ষতি হ্রাস ও দুর্ভোগ এড়াতে ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ◈ ইরান অভিযানে ১৬ মিলিয়ন ডলারের এক ডজনের বেশি রীপারের ড্রোন ধ্বংস, জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা ◈ শুক্রবার ঈদ উদযাপন করবে সৌদি আরব

প্রকাশিত : ১৯ মার্চ, ২০২৬, ০৩:৪৭ রাত
আপডেট : ১৯ মার্চ, ২০২৬, ০৬:০০ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ঈদ ছুটিতে রাজধানীতে অপরাধের ঝুঁকি, সতর্কতায় জোর পুলিশের

রাজধানীর ডেমরার মুসলিমনগরের বাসিন্দা আসিফ গত বছর ঈদুল আজহায় স্ত্রী, বাবা-মাকে নিয়ে মুন্সীগঞ্জে শ্বশুরবাড়িতে যান। ১০ জুন রাতে বাসায় ফিরে দেখেন ড্রয়িং রুমের মেঝেতে জামাকাপড় এলোমেলোভাবে পড়ে আছে। আলমারি ভাঙা। প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যের স্বর্ণালংকার নেই। পরে দেখেন শয়নকক্ষের জানালার একটি গ্রিল কাটা।

গত বছরের ১৫ জুন ঈদুল আজহার ছুটি শেষে গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থেকে ঢাকায় ফিরে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন মুজাহিদুল ইসলাম নামে এক দোকান কর্মচারী। ভোরে রিকশায় চকবাজারের বাসায় যাওয়ার পথে মতিঝিল এলাকায় ছিনতাইকারীর ছুরির আঘাতে গুরুতর আহত হন তিনি। এর আগে ২০২৩ সালের ১ জুলাই ভোরে ঈদের ছুটি শেষে গ্রামের বাড়ি শেরপুর থেকে ঢাকার ফার্মগেট পৌঁছে ছিনতাইকারীর আঘাতে মারা যান পুলিশের কনস্টেবল মনিরুজ্জামান। প্রতি ঈদের ছুটিতে রাজধানীতে এমন অসংখ্য অপরাধ সংঘটিত হয়। এ সময় নাড়ির টানে গ্রামে যায় রাজধানীবাসীর একটি বড় অংশ। ফলে ঈদের আগে-পরে অনেকটাই ফাঁকা হয়ে যায় রাজধানী। আর সেই সুযোগে বেপরোয়া হয়ে ওঠে পেশাদার ছিনতাইকারী ও চোররা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘটে ছিনতাই, দুর্ধর্ষ চুরি-ডাকাতি। ফলে ঈদে রাজধানী ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে যারা যান, তাদের চিন্তার বিষয় হয় বাসার চুরি-ডাকাতি নিয়ে। রাজধানীতে চুরি-ছিনতাই-দস্যুতার মামলার পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপির) তেজগাঁও, মতিঝিল, উত্তরা, রমনা বিভাগ বেশি অপরাধপ্রবণ।

ডিএমপি সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সাল থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আটটি বিভাগে ১ হাজার ৫৯১টি চুরির মামলা হয়েছে। একই সময়ে ৫৭৬টি ছিনতাই ও দস্যুতার মামলা হয়েছে। এছাড়া ডাকাতির ৫৩টি ও খুনের ৪৩৯ মামলা হয়েছে। অপরাধের এ পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, এ সময় তেজগাঁও বিভাগে ছিনতাই ও দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে। ছিনতাই ও দস্যুতার মামলায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মতিঝিল বিভাগ। আর চুরির ঘটনায় সর্বোচ্চ মামলা হয়েছে মতিঝিল বিভাগে। চুরির মামলার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে উত্তরা বিভাগ। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে রমনা বিভাগ।

তবে অপরাধ আরও বেশি সংঘটিত হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। ছিনতাইয়ের শিকার একাধিক ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে মোবাইল ফোনসহ সর্বস্ব হারালেও তারা শুধু মোবাইল হারানোর জিডি করেছেন। কোনো ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী নিজেই মামলা করতে চাননি। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশ ছিনতাইয়ের মামলা না নিয়ে হারানোর জিডি নিয়েছে এমন অভিযোগও রয়েছে।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র বলছে, রাজধানীতে ৯৭২ জন ছিনতাইকারী সক্রিয় আছে। তারা বিভিন্ন সময় গ্রেফতার হলেও জামিনে বের হয়ে ফের অপরাধে জড়ায়। ফলে এদের প্রতিহত করা পুলিশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

এদিকে ডিএমপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঈদের আগে ও পরে রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো রাখতে বেশকিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম ক্রাইম জোন চিহ্নিত করে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা। পুলিশের পক্ষ থেকে নগরবাসীকে অনুরোধ করা হয়েছে, ঈদুল ফিতরে ঢাকা ছাড়ার আগে নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার ও গুরুত্বপূর্ণ দলিল বাসায় অরক্ষিত অবস্থায় না রেখে আত্মীয়স্বজনের কাছে রেখে যেতে। ঢাকায় আত্মীয়স্বজন না থাকলে প্রয়োজনে এসব মূল্যবান জিনিস নিকটস্থ থানায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ফাঁকা ঢাকায় চুরি, ছিনতাই ও মলম পার্টির তৎপরতা রোধে পুলিশের টহল কয়েক গুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজধানীর অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে চেকপোস্ট, টহল, ফুট প্যাট্রোল ও গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস্) এসএন মো. নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘ঈদকেন্দ্রিক রাজধানীবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে বরাবরের মতো ফুট প্যাট্রোল ও বাইক প্যাট্রোলসহ পুলিশের সব ধরনের তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। নিরাপত্তাঝুঁকি বিবেচনায় রাজধানীর আবাসিক এলাকা, মার্কেটকেন্দ্রিক ও অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক পুলিশের তৎপরতা বেশি থাকবে।’

রাজধানীর ছিনতাই ও চুরিপ্রবণ এলাকার দিকে পুলিশের আলাদা নজর থাকবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন লোকজন ছুটিতে চলে গেছে। ফলে ছিনতাই কম হবে। তবে ঈদের সময় গ্রিল কাটা সিঁধেল চুরি বেশি হয়। তাই চুরি ঠেকাতে আবাসিক এলাকাকেন্দ্রিক টহল জোরদার করা হবে। এছাড়া সার্বিক তৎপরতা তো থাকবেই। আবাসিক এলাকা, মার্কেটগুলোর স্বর্ণের দোকানের দিকে নজরদারি বেশি থাকবে।’

পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘যে এলাকাগুলোতে মিডিল ক্লাসের লোকজন বেশি বসবাস করে-যেমন মোহাম্মদপুর, বসিলা, হাজারীবাগ এলাকা, কদমতলী, যাত্রাবাড়ীর কিছু অংশ, উত্তরার তুরাগ এলাকা, মিরপুরের পল্লবী, রূপনগর এরিয়া সেখানে অপরাধ বেশি হয়। ওইসব এলাকার থানার ওসিরা জানেন তার থানা এলাকার কোনো অংশে অপরাধ বেশি হয়। সেই বিবেচনায় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

গত বছর এবং চলতি বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে ডিএমপির ৫০টি থানায় হওয়া মামলার পরিসংখ্যানে দেখা যায়, তেজগাঁও বিভাগে সব থেকে বেশি ছিনতাই ও দস্যুতার মামলা হয়েছে ১৫২টি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ছিনতাই ও দস্যুতার মামলা হয়েছে মতিঝিল বিভাগে ১০৮টি। এছাড়া ওয়ারী বিভাগে ১০১টি, মিরপুর বিভাগে ৫৫ এবং রমনা বিভাগে ৪৭টি মামলা হয়েছে।

এছাড়া গত বছর এবং চলতি বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে চুরির ঘটনায় সর্বোচ্চ মামলা হয়েছে মতিঝিল বিভাগে ৩০১টি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চুরির (২২০টি) মামলা হয়েছে উত্তরা বিভাগে। এছাড়া রমনা বিভাগে চুরির ২১০টি, তেজগাঁও বিভাগে ২০৪টি, গুলশান বিভাগে ২০৪টি, মিরপুরে ১৬৮টি, ওয়ারীতে ১৪২টি ও লালবাগে ৭০টি মামলা হয়েছে।

জানা যায়, ডিএমপির মতিঝিল বিভাগে বাসাবাড়ি ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মাঝে মধ্যেই চুরির ঘটনা ঘটে। মামলার পরিসংখ্যান বলছে, চুরির শীর্ষে মতিঝিল এলাকা। ঈদের সময় এ এলাকায় বড় ধরনের চুরির শঙ্কা রয়েছে। অপরাধ দমনের প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে চাইলে গোয়েন্দা-মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ সালাউদ্দিন শিকদার যুগান্তরকে বলেন, ডিবির পক্ষ থেকে টহল পুলিশ থানার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে। নিয়মিত টহল অব্যাহত রয়েছে।

ডিএমপির আটটি বিভাগের মধ্যে অন্যতম অপরাধপ্রবণ তেজগাঁও বিভাগ। এ বিভাগের বিভিন্ন থানা এলাকা থেকে গত বছর ও চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে মোট ১৩ হাজার ২৩২ জন অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তেজগাঁও বিভাগের অধীন মোহাম্মদপুর এলাকাকে বলা হয় ছিনতাইয়ের হাব। এ এলাকায় ছিনতাইয়ের লোমহর্ষক অনেক ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সম্প্রতি ভাইরাল হয়েছে।

সূত্র বলছে, মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকা মিলে ২৫ থেকে ৩০টি স্পটে ছিনতাই হয়ে থাকে। বিহারি ক্যাম্পের আশপাশের মোড়ের রোড, মোহাম্মদপুরের তাজমহল ও নুরজাহান রোড, ঢাকা উদ্যান, চাঁদ উদ্যান, রায়ের বাজার, বসিলার বাজার এলাকা, পলিথিন গলি, অক্সিজেন গলি, কয়েকটি ঢাল, বুড়িগঙ্গার পারের ওয়াকওয়েতে নিয়মিত ছিনতাই হয়। আদাবরের সেখের টেক, পুলপার, সুনিবির হাউজিংসহ বেশ কিছু পয়েন্ট অপরাধপ্রবণ। এসব এলাকায় আগে থেকেই পুলিশের বাড়তি নজর রয়েছে। ঈদ উপলক্ষ্যে এসব এলাকা ছাড়াও আশপাশের এলাকায় পুলিশের তদারকি বাড়ানো হয়েছে।

তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান যুগান্তরকে বলেন, তেজগাঁও বিভাগের অপরাধপ্রবণ এলাকা রয়েছে প্রায় ১০০টি। এসব এলাকায় চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ছিনতাই ছাড়াও কোথাও চুরি হয়, কোথাও ঠেক দেয়, কোথাও মার্কেট কিংবা স্বর্ণের দোকানে চুরি হয়। আবাসিক এলাকায় চুরির সম্ভাবনা থাকে বেশি। ফলে মহানগর প্রজেক্ট, বসিলা গার্ডেন সিটি, জাপান গার্ডেন সিটি, ঢাকা উদ্যান, চাঁদ উদ্যানে চুরির শঙ্কা থাকায় বাড়তি নজর রাখা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমরা এলাকাবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে জনগণের সহায়তা নিচ্ছি। আবাসিক এলাকার পাহারাদার বা সিকিউরিটিতে যারা আছে তাদের সঙ্গে সমন্বয় করছি। বাজারের পাহারাদারদের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোর লোকাল কমিউনিটির হেল্প নেওয়া হচ্ছে। আমরা অপরাধপ্রবণ স্পটে নিয়মিত কাজ করছি। উৎস: যুগান্তর।

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়