প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিশ্বসাহিত্যের অনন্য ধ্রুবতারা আর্নেস্ট হেমিংওয়ে

আহমাদ ইশতিয়াক: আর্নেস্ট হেমিংওয়ের জীবনটা ছিল দুর্দান্ত। এমন দুর্দান্ত জীবন ও চলন্ত রসদ নিয়ে কজন ছুটতে পারে? মাত্র সাতটি উপন্যাস, ছয়টি ছোটগল্পের বই ও দুটি অকল্পিত সাহিত্য গ্রন্থ। এই হলো হেমিংওয়ের রচনাসম্ভার।

তবে তিনি সাহিত্যকর্মের বাইরেও অমর হয়ে থাকবেন তার অদ্ভুত জীবনযাত্রার জন্য। বিখ্যাত হয়ে থাকবেন প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে সাহিত্যকর্মে নিজের জীবনের ঘটনাবলি ফুটিয়ে তোলার জন্য। অথচ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মাত্র ১৫ বছর বয়সেই তার জীবনের অবসান হতে পারতো মর্টারের আঘাতে। এরপর হাসপাতালেই ভন কুরোস্কি নামের এক সেবিকার প্রেমে পড়া। কিন্তু জীবনের শেষ চিত্রনাট্য যে তার হাতেই লেখা ছিল। ভাবুন তো, তার লেখা বিশ্বখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’-তে তিনিই তো বলিয়েছিলেন সেই সান্তিয়াগো নামের এক ৮০ বছরের জেলেকে দিয়ে, ‘a man can be destroyed but not defeated!’ কিন্তু নিজের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে সমস্ত কিছুর অবসান করা শুধু তার পক্ষেই সম্ভব ছিল। তাইতো তিনি পাপা হেমিংওয়ে।

১৯২০-১৯৫০ সাল পর্যন্ত যে কজন সাহিত্যিক দোর্দণ্ড প্রতাপে বিশ্বসাহিত্যে রাজত্ব করেছেন, তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক বলা হয় আর্নেস্ট হেমিংওয়েকে। হেমিংওয়ের কথাসাহিত্য আজও ইংরেজি কথাসাহিত্যের সর্বাধিক পঠিত।

আর্নেস্ট হেমিংওয়ের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের শিকাগো শহরের ওক পার্কে ১৮৯৯ সালের ২১ জুলাই। বাবা ক্লেরেন্স অ্যাডমন্ডস হেমিংওয়ে ছিলেন চিকিৎসক আর মা গ্রেস হল হেমিংওয়ে ছিলেন অপেরা শিল্পী।

 

তার মা-বাবা তাদের বিয়ের পর কিছু সময় গ্রেসের পিতা আর্নেস্ট হলের বাড়িতে ছিলেন। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের নাম আর্নেস্ট রেখেছিলেন তার নানা। যদিও পরবর্তীতে এই নাম পছন্দ করতেন না হেমিংওয়ে। কারণ অস্কার ওয়াইল্ডের বিখ্যাত  নাটক ‘দ্য ইমপোর্টেন্স অব বিয়িং আর্নেস্ট’-এর সেই সাদাসিধে, বোকাসোকা ধরনের প্রধান চরিত্রের নাম ছিল আর্নেস্ট।

হেমিংওয়ের মা অপেরা শিল্পী হওয়ায় প্রায়ই গ্রামে গ্রামে কনসার্ট করতে যেতেন। মায়ের পীড়াপীড়িতেই হেমিংওয়ের হাতেখড়ি হয়েছিল বেহালায়। কিন্তু এই বেহালা বাজানো নিয়েই হেমিংওয়ে ও তার মায়ের মধ্যে প্রচণ্ড ঝগড়া হয়েছিল। হেমিংওয়ে তাই শৈশব-কৈশোরে মাকে প্রচণ্ড ঘৃণা করতেন। গরমের দিনগুলোতে হেমিংওয়ের কাটতো মিশিগানের ওয়ালুন লেকের পাড়ে তাদের বাড়ি উইন্ডমেয়ারে।  উত্তর মিশিগানের বনে ও হ্রদে শিকার, মাছ ধরা ও ক্যাম্প করা শিখেছিলেন বাবার কাছে। ১৯১৩ সালে হেমিংওয়ের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার সূচনা হয়। তাকে ভর্তি করানো হয়েছিল ওক পার্ক অ্যান্ড রিভার ফরেস্ট হাই স্কুলে। কিন্তু এক বছরের মাথায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় হেমিংওয়ের বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর। বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে অ্যাম্বুলেন্স চালক হিসেবে চলে যান ইতালিতে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে ১৯১৮ সালে মারাত্মক আঘাত পেলেন মর্টারের আঘাতে। আহত হলেন মারাত্মকভাবে।

অথচ আহত হওয়া সত্ত্বেও অ্যাম্বুলেন্সে করে মুমূর্ষু যাত্রীদের পৌঁছে দিয়েছেন হাসপাতালে। আহত হেমিংওয়ে ছয় মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ইতালিয়ান সরকার অবশ্য তার এই সাহসিকতার জন্য ভূষিত করেন ‘ইতালিয়ান সিলভার মেডেল অব ব্রেভারি’ পদক দিয়ে। হাসপাতালেই হেমিংওয়ে ভালোবেসে ফেলেন এগনেস ভন কুরোস্কি নামের রেডক্রসের এক নার্সকে।

এগনেস আর হেমিংওয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন কয়েক মাসের মধ্যে আমেরিকাতেই হবে তাদের বিয়ে। ১৯১৯ সালের প্রথম দিকে হেমিংওয়ে ফিরে গেলেন আমেরিকায়। অপেক্ষা করতে লাগলেন এগনেসের জন্য। কিন্তু হঠাৎ ইতালি থেকে এগনেসের চিঠি এলো। এক ইতালিয়ান অফিসারের সঙ্গে এগনেসের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। সেই কুড়ি বছর বয়সে প্রেমে ব্যর্থ হলেন হেমিংওয়ে। কিন্তু রসদ জুগিয়ে গেল এই প্রেম ও বিশ্বযুদ্ধের ঘটনা নিয়ে। পরবর্তীতে তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘এ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস’ সৃষ্টি হলো এই প্রেম ও যুদ্ধ নিয়ে।

এসময় তিনি বুঝতে পারেন, চাকরি ছাড়া ঘরে বসে থাকা খারাপ দেখাচ্ছে এবং তার এই অবসাদ থেকে বের হয়ে আসা উচিত।

একই বছরের সেপ্টেম্বরে হাইস্কুলের বন্ধুদের নিয়ে মিশিগানের এক দ্বীপে মাছ ধরতে ও ক্যাম্পিং সফরে গিয়েছিলেন হেমিংওয়ে। এই সফর নিয়ে তিনি লিখেছিলেন তার বিখ্যাত গল্প ‘বিগ টু হার্টেড রিভার।’

এসময় তার এক পারিবারিক বন্ধু তাকে অন্টারিওর টরন্টোতে একটি চাকরির প্রস্তাব দেন। কোনো কাজ না পেয়ে তিনি এই চাকরি করতে রাজি হয়েছিলেন। পরে তিনি টরন্টো স্টার পত্রিকাতে সংবাদদাতা হিসেবে কাজ শুরু করেন। এই সময়ে তার পরিচয় হয় একই পত্রিকার সাংবাদিক কানাডার বিখ্যাত সাহিত্যিক মর্লে কালাঘানের সঙ্গে। তিনি হেমিংওয়ের লেখনীর প্রশংসা করেছিলেন। কিন্তু পরের বছর জুন মাসেই তিনি মিশিগানে ফিরে আসলেন।

কিন্তু বেশি দিন না। ১৯২০ সালের সেপ্টেম্বরে বন্ধুদের সঙ্গে থাকার জন্য শিকাগো চলে যান হেমিংওয়ে।

এসময়ও তিনি টরেন্টো স্টারে নিয়মিত গল্প লিখতেন। হেমিংওয়ের রুমমেটের বোন হ্যাডলি রিচার্ডসন শিকাগোতে তার ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে আসলে হেমিংওয়ের সঙ্গে পরিচয় হয় হ্যাডলির। হেমিংওয়ে ভীষণ আকৃষ্ট হলেন হ্যাডলির প্রতি। কিন্তু হ্যাডলি ছিলেন হেমিংওয়ের চেয়ে আট বছরের বড়। কিন্তু বয়সের ব্যবধান থাকলেও মানসিকভাবে কম পরিপক্ব ছিলেন হ্যাডলি। বিশেষ করে বাচ্চাসুলভ ভঙ্গিমা ছিল তার মধ্যে। ১৯২১ সালে হেমিংওয়ে বিয়ে করলেন হ্যাডলি রিচার্ডসনকে। বিয়ের কয়েক মাস পরেই তারা চলে গেলেন ফ্রান্সে। প্যারিসেই শুরু হলো হেমিংওয়ের সাহিত্য।

সেখানে প্রথমে কানাডার পত্রিকা টরেন্টো সরকারের  ফ্রান্স প্রতিনিধি হিসেবে হেমিংওয়ে সাংবাদিকতার কাজ শুরু করেন। হেমিংওয়ের প্রথম উপন্যাস ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’ প্রকাশিত হলো প্যারিসে থাকাকালীন। প্যারিসে থাকার সময়েই সবচেয়ে সমৃদ্ধ হয়েছিলেন হেমিংওয়ে। পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার সুবাদে পরিচয় হলো জেমস জয়েস, পাবলো পিকাসো, স্কট ফিটজেরাল্ডের মতো মহারথীদের সঙ্গে।

 

প্যারিসে থাকার সময়ে হেমিংওয়ে টরন্টো স্টার পত্রিকার জন্য লিখেছিলেন ৮৮টি গল্প। বিশেষ করে গ্রেকো-তুরস্ক যুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। দেখেছিলেন ভয়াবহ স্মার্নার অগ্নিকাণ্ড।

এর কিছুদিনের মধ্যেই প্রকাশিত হয়েছিল তার ‘টুনা ফিশিং ইন স্পেন’ ট্রাউট ফিশিং অল অ্যাক্রস ইউরোপ: ‘স্পেন হ্যাজ দ্য বেস্ট দেন জার্মানি’ নামে দুটি ভ্রমণকাহিনী।

১৯২২ সালের ডিসেম্বরে হ্যাডলি সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় হেমিংওয়ের সঙ্গে দেখা করতে আসার পথে প্যারিসের রেলস্টেশনে হেমিংওয়ের পাণ্ডুলিপিসহ একটি সুটকেস হারিয়ে ফেলেছিলেন। খবর শুনে ভীষণ হতাশ হয়ে পড়েছিলেন হেমিংওয়ে। ১৯২৩ সালে প্যারিস থেকে প্রকাশিত হলো হেমিংওয়ের প্রথম বই ‘থ্রি স্টোরিজ অ্যান্ড টেন পোয়েমস’। প্রকাশক ছিলেন রবার্ট ম্যাকেলমন।

হারিয়ে যাওয়া সুটকেসের পাণ্ডুলিপিতে থাকা দুটি গল্প এই বইয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং তৃতীয় একটি গল্প তিনি আগের বছর ইতালিতে থাকাকালীন লিখেছিলেন। এক মাসের মধ্যে বইটির দ্বিতীয় খণ্ডও প্রকাশিত হলো। এর কিছুদিন পর তারা টরেন্টোতে ফিরে গেলেন। সে বছরের অক্টোবর মাসেই হেমিংওয়ের প্রথম ছেলে জন হ্যাডলির জন্ম হলো।

পরিবারের পিছনে সময় দেওয়ার জন্যে একপর্যায়ে তিনি পত্রিকার চাকরিও ছেড়ে দিলেন। তিনি এরই মধ্যে প্যারিস শহরের মায়ায় পড়ে যাওয়ায় টরন্টো তার কাছে স্রেফ বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। ভাবলেন সাংবাদিকের জীবনে থাকার চেয়ে লেখকের জীবনই ভালো। আর তাই ১৯২৪ সালের জানুয়ারিতে প্যারিসে ফিরে গেলেন।

হেমিংওয়ে তখন বিখ্যাত ইংরেজ কবি ফোর্ড ম্যাডক্স ফোর্ডকে বিখ্যাত মাসিক পত্রিকা দ্য ট্রান্স আটলান্টিক রিভিউতে সম্পাদনায় সাহায্য করতেন। এই পত্রিকায় পাউন্ড, জন ডস প্যাসস, বারোনেস এলসা ফন ফ্রাইটাগ-লরিংহোফেন ও গারট্রুড স্টেইনের মতো প্রখ্যাত লেখকদের লেখা প্রকাশিত হতো এবং মাঝে মাঝে ইন্ডিয়ান ক্যাম্পের মতো হেমিংওয়ের নিজের লেখা ছোটগল্পগুলোও প্রকাশিত হতো। ১৯২৫ সালে হেমিংওয়ের প্রথম গল্প সংকলন ইন আওয়ার টাইম প্রকাশিত হতেই আলোচনায় এসে গেলেন হেমিংওয়ে।

এর ছয় মাস আগে প্যারিসের ডিঙ্গো বারে বিখ্যাত মার্কিন সাহিত্যিক এফ স্কট ফিটজেরাল্ডের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল হেমিংওয়ের। ফিটজেরাল্ড ও হেমিংওয়ে শুরুতে ভীষণ ভালো বন্ধু ছিলেন। তারা একে অপরের পাণ্ডুলিপি বিনিময়ও করতেন। তাছাড়া লেখক হিসেবে হেমিংওয়েও নানাভাবে তার কাছে ঋণী ছিলেন। তার লেখা প্রথম বইটি প্রকাশে সাহায্য করেছিলেন ফিট্জেরাল্ড। কিন্তু পরবর্তীতে সেই সম্পর্কে শীতলতা তৈরি হয়। যাই হোক, এই বছর ফিটজেরাল্ডের দ্য গ্রেট গেটসবি উপন্যাস প্রকাশিত হলো। হেমিংওয়ের বইটি পড়ে পছন্দ করেছিলেন এবং তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিলেন তার পরবর্তী কাজ হবে একটি উপন্যাস।

মোঁপারনাসে অবস্থানকালে হেমিংওয়ে টানা আট সপ্তাহ ধরে লিখে শেষ করেন তার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’। এর এক মাস পর ডিসেম্বরে হেমিংওয়ে অস্ট্রিয়ার শ্রুন্সে চলে গেলেন শীতকালীন অবকাশ কাটাতে। সেখানেই হেমিংওয়ে পাণ্ডুলিপিতে ব্যাপক সংশোধনী আনলেন। পলিন ফাইফার জানুয়ারি মাসে তাদের  সঙ্গে যোগ দিলেন। মজার বিষয়ে হলো স্ত্রী হ্যাডলি হেমিংওয়েকে নিউইয়র্কের বিখ্যাত প্রকাশনা চার্লস স্ক্রিবনার্স সন্সের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে পীড়াপীড়ি করেছিলেন। হেমিংওয়েও ওই প্রকাশকের সঙ্গে দেখা করার জন্য অস্ট্রিয়া থেকে হঠাৎ করেই নিউইয়র্কে চলে এলেন। ফেরার পথে প্যারিসে অবস্থানকালে তিনি ফাইফারের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ালেন।  শ্রুনে ফিরে এসে হেমিংওয়ে মার্চের মধ্যে আবার পড়লেন এবং সংশোধন করলেন। আর এপ্রিলে পাণ্ডুলিপিটি নিউইয়র্কে পাঠালেন।  ১৯২৬ সালের অক্টোবর মাসে স্ক্রিবনার্স থেকে উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছিল। এই উপন্যাসটি ছিল হেমিংওয়ের সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস। হেমিংওয়ে নিজে পরবর্তীকালে তার সম্পাদক ম্যাক্স পারকিন্সকে লিখেছিলেন ‘বইয়ের মূল বিষয়বস্তু’ এমন নয় যে একটি প্রজন্ম হারিয়ে গেছে; কিন্তু ‘পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে’। তিনি মনে করতেন দ্য সান অলসো রাইজেস-এর চরিত্রগুলো বার বার প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছে, কিন্তু হারিয়ে যায়নি। ‘দ্য সান অলসো রাইজেস’ উপন্যাসটি লেখার সময়েই  হ্যাডলির সঙ্গে হেমিংওয়ের সম্পর্ক খারাপ হয়েছিল।

এর কিছুদিন পরেই হ্যাডলির সঙ্গে বিচ্ছেদ হলো হেমিংওয়ের। পরের বছরই হেমিংওয়ে বিয়ে করলেন পলিন ফাইফারকে। বিয়ের কিছুদিন পর লেখা শুরু করলেন তার বিখ্যাত গল্পগ্রন্থ ‘ম্যান উইদাউট ওমেন।’ স্পেনের গৃহযুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর ফাইফারের সঙ্গেও তার বিচ্ছেদ হলো। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে লিখলেন ‘আ ফেয়ার ওয়েল টু আর্মস’। এর পরের বছর প্রকাশিত হলো তার আরেক বিখ্যাত উপন্যাস ‘হুম দ্য বেল কোর্স’। এরই মধ্যে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের গল্পও প্রকাশিত হচ্ছে নিয়মিত। বেশ জনপ্রিয়তা পেয়ে গেছেন ততদিনে।

 

১৯৫২ সালে তার সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্যা সী’ প্রকাশিত হওয়ার পরে হইচই পড়ে গেল চারদিকে। ছোট্ট একটি উপন্যাস। অথচ কি দোর্দণ্ড শক্তিমান বার্তা ৮০ বছরের এক বৃদ্ধ সান্তিয়াগোকে দিয়ে দিয়েছেন।

এই উপন্যাস প্রকাশের কিছুদিন পর হেমিংওয়ে আফ্রিকায় সাফারি ভ্রমণে গেলেন। সেখানে পরপর দুটি বিমান দুর্ঘটনায় প্রায় মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পেলেন তিনি কিন্তু বাকি জীবনের বেশির ভাগ সময় সেই শারীরিক আঘাত নিয়েই বেঁচে ছিলেন। চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে কিউবায় স্থায়ী হয়ে গেলেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ে।

কিন্তু আবারও ফিরে গেলেন নিজ মাতৃভূমি আমেরিকায়।

নতুন বাড়ি কিনলেন আইডাহোর রাজ্যের কেচামে। তখন তার মধ্যে ভীষণ মানসিক অস্থিরতা। কিছুই লিখতে পারছেন না নতুন করে। কেবল স্মৃতিকথা ছাড়া। সমালোচকেরা বলতো হেমিংওয়ে ফুরিয়ে গেছেন।

হেমিংওয়ে ভীষণ শিকার করতেন। মাঝে মাঝে শিকারে চলে যেতেন কয়েক দিনের জন্য। বড়শিতে মাছ ধরতেন। পাহাড়ে যেতেন হতাশা কাটাতে। কিন্তু তাতেও হতাশা কাটছিল না। লিখতে বসলেই টের পেতেন চারদিকে হতাশা আর হতাশা। শিকারেও কোনো আনন্দ পাচ্ছিলেন না।

তার বংশের রক্তেই ছিল ‘বাইপোলার মোড ডিসঅর্ডার’ নামের এক ধরনের মানসিক ব্যাধি। এই রোগের দুটো লক্ষণ একদিকে উচ্ছ্বাস অন্যদিকে ভীষণ বিষণ্ণতা। তার বাবা, ভাই ও এক বোন আত্মহত্যা করেছিলেন। শেষ দিনগুলোতে হেমিংওয়ের আচরণ তার বাবার শেষ দিনগুলোর আচরণের মতো হয়ে গিয়েছিল। উনিশ দিন পরেই ছিল তার জন্মদিন। ৬২তম জন্মদিন পালন করবেন কত অপেক্ষা ছিল সবার। তবে সেই অপেক্ষা সইলেন না তিনি। ২ জুলাই সকালে প্রিয় বন্দুক নিয়ে মাথায় ঠেকিয়ে দিলেন শেষমেশ! বিদায় পৃথিবী, বিদায় এই জগতের সাহিত্য। পাপা হেমিংওয়ে ঢলে পড়লেন সকল বিষণ্ণতার ঊর্ধ্বে।

অবশ্য তার স্ত্রী মেরি হেমিংওয়ে অবশ্য বলেছিলেন ‘হেমিংওয়ে আত্মহত্যা করেননি। হয়তো ভোরে শিকারে যাওয়ার আগে বন্দুক সাফ করার সময়ে আচমকা অসাবধানতাবশত গুলি বের হয়ে তার মাথায় লাগে।’

১৯৬১ সালের আজকের দিনেই চলে গিয়েছিলেন বিশ্বসাহিত্যের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। প্রয়াণ দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই তার প্রতি।

তথ্যসূত্র:

Ernest Hemingway: A Life Story/ Carlos Baker

Hemingway: A Life Without Consequences/ James Mellow

Hemingway: The Final Years/ Michael Reynolds

Hemingway: The Paris Years/ Michael Reynolds

আহমাদ ইশতিয়াক, [email protected]

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত