প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দেশব্যাপী সংক্রমণ, করোনামুক্ত স্বাভাবিক জীবনযাপনে বস্তিবাসী!

নিউজ ডেস্ক: ১২ বছরের মোস্তাকিম পরিবারের সঙ্গে থাকে রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে। করোনা মহামারির কারণে পড়াশোনা ছেড়ে এখন এই বস্তির বউবাজারে সবজি বিক্রি করে সে। তার পরিবারের কারো করোনা হয়েছিল কি না জানতে চাইলে হেসে কুটিকুটি হয়ে জানাল, ‘না’। শনিবার বিকেলে কড়াইল বস্তির কাঁচাবাজারটি ঘুরে দেখা গেল, একজন ক্রেতা-বিক্রেতার মুখেও মাস্ক নেই। শুধু বাজারের মধ্যেই নয়, পুরো বস্তির মধ্যে চলতি পথে মাত্র চার ব্যক্তিকে দেখা গেছে মাস্ক পরা। তবে তারা কেউই এখানকার বাসিন্দা নয়।

বউবাজারের মুদি দোকানি কহিনুর বেগম জানালেন, তাঁর পরিবারে বা প্রতিবেশী কারোরই এখন পর্যন্ত করোনা হয়নি। এমনকি এই বস্তির কারো করোনা হয়েছে, এমন খবরও জানা নেই তাঁর। সরেজমিনে একই রকম চিত্র দেখা গেছে মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পে। হাজার হাজার মানুষ থাকলেও করোনা রোগী না থাকায় চলাচলে কোনো সতর্কতা নেই।

সরেজমিনে কড়াইল বস্তিবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায় তাদের করোনামুক্ত স্বাভাবিক জীবনের কথা। ৯ সদস্যের পরিবার নিয়ে কয়েক বছর ধরে বস্তিতে আছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব বারেক। পেশায় রিকশাচালক। রিকশায় চড়ে যেতে যেতে কথা হয় বারেকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এই বস্তির কারোর করোনা অয় নাই। তয় অনেকের জ্বর-ছর্দি অইছে। আমারও অইছিল। আবার আপনা-আপনিই ঠিক অইয়া গেছে।’ করোনা টেস্ট করেছিলেন কি না জানতে চাইলে একগাল হেসে উত্তর, ‘না’। কড়াইল বস্তির প্রায় ২০টি পরিবারের সঙ্গে কথা বললে তাদের বেশির ভাগই জানিয়েছে, এই বস্তির কারো করোনা হয়নি। তবে কারো কারো মধ্যে জ্বর, সর্দি, কাশির লক্ষণ দেখা গেলেও কেউ করোনা টেস্ট করেনি। একই উত্তর দিলেন এই বস্তিতে স্বাস্থ্যসেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান ‘মমতাময় কড়াইল’-এর এক নারী কর্মী। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে সেবা নিতে আসা কারো মধ্যে করোনার লক্ষণ দেখলে আমরা তাদের টেস্ট করার পরামর্শ দিই। কিন্তু এখন পর্যন্ত একজনও আমাদের কাছে এসে বলেনি যে সে টেস্ট করিয়েছে।’

বস্তিতে স্বাস্থ্যসেবা দানকারী আরেকটি প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক। প্রতিষ্ঠানটির স্বাস্থ্যকর্মী মমতাজ বলেন, ‘আমাদের ব্র্যাক থেকে কভিড টেস্টের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর আগে এখানে হাতে গোনা কয়েকজনের করোনা ধরা পড়েছে। তবে গত কয়েক দিনে কারো মধ্যে করোনা ধরা পড়েনি।’ কড়াইল বস্তির উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে ‘কড়াইল আদর্শনগর’ নামের একটি সংগঠন। এর সভাপতি এবং ১৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মাওলানা আব্দুস সোবহান বলেন, ‘আমরা ডাক্তার এনে এখানে অনেকের করোনা টেস্ট করেছি। তবে এ যাবৎকালে একজনেরও করোনা ধরা পড়ে নাই।’

মোহাম্মদপুর গজনবী রোড, বাবর রোড, শাহজাহান রোড, হুমায়ুন রোড ঘিরে অবাঙালিদের জন্য গড়ে ওঠা জেনেভা ক্যাম্পে অন্তত ১০ হাজার পরিবার বসবাস করছে। এখানে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। ক্যাম্পের ভেতরে আট-দশ হাতের কক্ষগুলোতে ঠাসাঠাসি করে চার-পাঁচজন করে থাকছে এই করোনা পরিস্থিতিতেও। কোনো কোনো ঘরে তিন শিফটেও ঘুমায় বলে জানায় ক্যাম্পবাসী। এ ছাড়া গণশৌচাগার ব্যবহার করে প্রায় সব বাসিন্দা।

ক্যাম্প ঘুরে দেখা যায়, যে যার মতো করে কাজ করছে। দোকানপাট সব খোলা। জাকির নামে জেনেভা ক্যাম্পের এক বাসিন্দা বলেন, ‘ক্যাম্পে করোনা রোগী না থাকলে সচেতনতার কী আছে? এ জন্য সবাই স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছে।’ শাহেদ নামের এক চা দোকানি বলেন, ‘আগের মতো সবাই দোকানে আসে। করোনা এইখানে নাই, এই জন্যে কেউ মাস্ক-টাস্কও পরে না। খালি খালি দম বন্ধ হইয়া যায়।’ শাহেদ কথা বলতে বলতেই দোকানে উপস্থিত ক্রেতা রিকশাচালক ইসমাঈল হোসাইন বলে ওঠেন, ‘সারা দিন শরীর থেকে পানি (ঘাম) বাইর হয়। ভিতরে কিছুই থাকে না। তয় করোনা কেমনে টিকব?’ ক্যাম্পে করোনার শুরু থেকে করোনার লক্ষণ নিয়ে অনেকের মৃত্যুর কথা শোনা গেলেও দালিলিক তথ্য নেই কারো কাছে।

ক্যাম্পবাসী কয়েকজন জানায়, গত বছরের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝিতে দুই দিনের ব্যবধানে দুই ভাই মারা যাওয়ার মধ্য দিয়ে জেনেভা ক্যাম্পে করোনায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। তাঁদের একজনের বয়স ৩০ বছর, অন্যজনের ৫০। এরপর আরো কয়েকজনের মৃত্যু হলেও সেগুলো করোনার মৃত্যু কি না নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এদের কেউ কেউ হাসপাতালে গেলেও সবাই যায়নি। কারো দাফন হয়েছে কভিড-১৯ রোগীদের জন্য নির্ধারিত খিলগাঁও তালতলা কবরস্থানে। কারো দাফন হয়েছে রায়েরবাজার কবরস্থানে। তবে গত কয়েক মাসে আর নতুন করোনা রোগীর সন্ধান মেলেনি।

জেনেভা ক্যাম্পটি পড়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে। ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পের করোনা পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়ার্ড কাউন্সিলর সৈয়দ হাসান নূর ইসলাম বলেন, ‘করোনার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত দুজন আক্রান্ত পাওয়া গেছে। এখানে বেশির ভাগ মানুষ শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করে থাকে। হতে পারে এ কারণেই আক্রান্তের সংখ্যা কম। দুজন রোগী পাওয়ার পর পুরো এলাকায় লকডাউন দেওয়া হয়। এরপর একটি এনজিওর মাধ্যমে পুরো জেনেভা ক্যাম্পে করোনা পরীক্ষা করানো হয়। তখনো করোনা রোগী পাওয়া যায়নি। তবে অনেকে স্বাভাবিক মৃত্যুকে করোনার লক্ষণ বলে ভয় পেয়ে যায়।’

সূত্র: কালের কণ্ঠ

সর্বাধিক পঠিত