প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সুমাইয়া আক্তার কেয়া: শিক্ষা ব্যবস্থা নয়, কর্তাদের কাছে যেন নির্বাচন অনুষ্ঠানই বেশি গুরুত্বপূর্ণ!

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম চীনে গিয়েছিলেন ১৯৫২ সালে চীনে অনুষ্ঠিত শান্তি সম্মেলনে যোগদান করতে। তিনি সেখানে গিয়ে যারপরনাই বিস্মিত হয়েছিলেন চৈনিকদের চারিত্রিক, অবকাঠামোগত এবং প্রশাসনিক দিক দিয়ে আমূল পরিবর্তন দেখে। মাত্র কয়েক বছর আগেও যারা আফিমখোর জাতি হিসেবে বিশ্বে পরিচিত ছিলো তারা এতো দ্রæত কিভাবে নিজেদের বদলে ফেললো? বহু বছর ধরে চলা চিয়াংকাইসেক সরকারের স্বৈরশাসন থেকে কীভাবে মাও সেতুং সরকার এতো দ্রæত নিখুঁত একটা সিস্টেম এর প্রবর্তন করলেন? চীনের হাট-বাজারে কয়েকদিন ঢু মেরেই বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারলেন তাদের এই বদলে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে তাদের মধ্যে নতুন করে জেগে ওঠা জাতীয়তাবোধ। হ্যা মাও সেতুং সরকার তার নিজ জাতির মধ্যে জাতীয়তাবোধ এবং সরকারের প্রতি আস্থাবোধ জাগিয়ে তুলতে পেরেছিলেন। বঙ্গবন্ধু চীনের সেলুনে গিয়ে দেখলেন সবাই দাড়ি কামায় খুর দিয়ে কিন্তু পাকিস্তানিরা দাড়ি কামায় বেøড দিয়ে আর চীন দেশেও সেসময় বেøডের আমদানি অসম্ভব ছিলো না। তাহলে সমস্যাটা কী? আসলে সমস্যা অন্য যায়গায়, চৈনিকরা নিজেদের উৎপাদিত পণ্য ছাড়া অদরকারি কোনো বিদেশি পণ্য ব্যবহার করবে না বলে শপথ নিয়েছে। এবার আমাদের কথা একবার ভাবুন! আমরা স্নো ক্রয় করি ইন্ডিয়ান, জামা ক্রয় করি পাকিস্তানি লোন, জুতা ক্রয় করি বাটা, এপেক্স, অ্যাডিডাস, পুমা ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব বড় বড় ব্র্যান্ডের ভীরে বাংলার ঐতিহ্য বড়ই পানসে। সেগুলো স্থান পায় শুধু বছরে কয়েকটা উৎসবে। আসলে আমরা জাতি হিসেবে বাঙালি হলেও আমাদের কোনো জাতীয়তাবোধ নেই। তাই কারো মতের সঙ্গে মতের অমিল হলেই আমরা হরহামেশাই গালি দিয়ে বলি ইন্ডিয়ার দালাল, পাকি বীর্য ইত্যাদি ইত্যাদি। আফসোস! বাংলার মানুষ হয়েও আমরা কেউ ভারতপন্থী আবার কেউ পাকিস্তানপন্থী। আমার প্রশ্ন, তাহলে বাংলাদেশি কারা?

যাইহোক ধান বানতে শীবের গীত অনেকটাই গেয়ে ফেললাম। এবার মূল কথায় আসি। তো বঙ্গবন্ধু যতোই চীনকে দেখলেন ততোই চৈনিকদের সততা, ডিসিপ্লিন দেখে মুগ্ধ হলেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষ্য অনুযায়ী সব জাতিরই নাকি একটা প্রিভিলেজ ক্লাস থাকে। চৈনিকদেরও ছিলো। আর তাদের প্রিভিলেজ ক্লাস ছিলো শিশুরা অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা। এবং তাদের সর্বোচ্চ ইনভেস্টমেন্ট ছিলো এই খাতের ওপর। হ্যাঁ চীন সরকার শিক্ষার মূল্যটা যথার্থই বুঝতে পেরেছিলো। তাই শিশু শিক্ষার্থীদের সেভাবেই গড়ে তেলার জন্য তারা আলাদা খাবারেরও বরাদ্দ করেছিলেন। সাংস্কৃতিক সব কর্মকাÐে তারা শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভূক্ত করে ছিলেন। চীনা স্কুল গুলোতে বালক বালিকারা একই পোশাক পড়তো। আর এটা নারী পুরুষ একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার জন্য অনেক বড় প্রেরণা। যা আমরা একবিংশ শতাব্দিতে এসেও কল্পনা করতে পারি না। যাইহোক শান্তি সম্মেলনের সমস্ত অতিথিদের ফুল দিয়ে, গান গেয়ে অভ্যর্থনা জানিয়ে ছিলো এই চীনা প্রিভিলেজ ক্লাস শিক্ষার্থীরাই। শিশুদের মননে মগজে ডিসিপ্লিন, সততা, সমতা শুরু থেকেই ঢুকিয়ে দেওয়ার একটা সুন্দর প্রচেষ্টা। আর ওই সময় চীন সরকার সঠিক পথে হেটেছিলেন বলেই বিশ্বব্যাপী চীনের জয়জয়কার আমরা এখন দেখতে পাই।
চীনের কথা বলছি দেখে অনেকেই হয়তো মনে মনে রাগ করে বলছেন, ‘আমরাই তো উন্নয়নের রোল মডেল।’ বিশ্ব এখন আমাদের অনুসরণ করে। ‘আমাদের শিক্ষার হার তো হু হু করে বেড়েই চলছে।’ হ্যাঁ কথা সত্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হেসেন গতকাল বলেছেন, ‘বিবিএস এর জরিপ অনুযায়ী আমাদের বর্তমান শিক্ষার হার ৭৪ দশমিক ৭ শতাংশ যা ২০২০ এ ছিলো ৭৩ দশমিক ৯ শতাংশ।’ এছাড়া শিক্ষার্থীদের আমরা ব্যাপক প্রিভিলেজ দেই। শিক্ষার্থীদের সুরক্ষিত রাখার জন্য আমরা কতো পদক্ষেপ নিচ্ছি। করোনাকালে অফলাইন ক্লাসে জীবনের ঝুকি আছে তাই শিক্ষামন্ত্রী বললেন, ‘আমরা কোমলমতী শিক্ষার্থীদের মৃত্যু মুখে ঠেলে দিতে পারি না। শিক্ষার্থীর কী পারবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রতিদিন ক্লাস করতে?’
আমার আফসোস এখানেই। আমরা কেন ধরে নিচ্ছি শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পারবে না? একটা শিশু একতাল কাদার মতো। তাকে আপনি যেভাবে গড়ে তুলবেন সে সেভাবেই গড়ে ওঠবে। তাই করোনাকালীন ডিসিপ্লিন শিক্ষাটা হতো আমাদের শিশুদের জন্য সবচেয়ে সময়োপযোগী শিক্ষা। নিউ নর্মালটাকে মেনে নিয়েই অন্য সেক্টরের মতো চলতে পারত আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষকেরা শ্রেণি কক্ষে শিক্ষার্থীদের মননে ও মগজে খুব সুন্দর করে প্রতিদিন কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে ঢুকিয়ে দিতে পারতেন স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো। এতে করে ভবিষ্যতে আমরা হয়তো ডিসিপ্লিনড একটা প্রজন্ম পেতাম। কিন্তু না আমরা মাসের পর মাস ফাঁকা বুলি দিয়ে যাচ্ছি। অবাক হই আমাদের মন্ত্রীসভার সবচেয়ে শিক্ষিত মন্ত্রীর মানসিক বিকারগ্রস্থতা দেখে। তিনি দিনের পর দিন একই বুলি তোতা পাখির মতো আউড়ে যাচ্ছেন। তিনি চিন্তাই করছেন না এই দীর্ঘমেয়াদি বন্দিদশা এবং তার এসব বুলি শিক্ষার্থীদের মনঃস্তত্তে¡ কতোটা বিরূপ প্রভাব ফেলে। কয়েকদিন আগে যমুনা টিভিতে এক প্রতিবেদনে দেখলাম পাবানা জেলার একটা কিন্ডার গার্টেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে খুলে দেওয়া হয়েছে অভিভাবক এবং সহকারী শিক্ষকদের চাপে। এক অভিভাবক বললেন দীর্ঘদিন ঘরে বন্দি থেকে তার বাচ্চা এখন পাগলের মতো আচরণ করছে। তাই তিনি বাচ্চাকে স্কুলে পাঠাচ্ছেন। প্রধান শিক্ষক বললেন স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষকেরা আর্থিক সংকটে পড়ে গেছেন এবং অভিভাবকেরা চাপ দিচ্ছেন তাই স্কুলটি খুলে দেওয়া হয়েছে। অথচ শিক্ষামন্ত্রী বলছেন, একবছর লেখাপড়া না করলে কিছু হবে না। শিক্ষামন্ত্রীর মুখে এই কথার চেয়ে আর দুঃখজনক কি হতে পারে!

অনলাইন, টিভিতে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে, অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হচ্ছে। দুঃখের বিষয় গুগলে সার্চ দিলে সব অ্যাসাইনমেন্টের উত্তর পাওয়া যায়। শিক্ষার্থীরা এজন্য বই ঘাটার প্রয়োজন মনে কওে না। অনলাইন ক্লাসের সুবাদে ইন্টারনেট প্রযুক্তিতে পারদর্শী হয়ে তারা পাবজি, ফ্রি ফায়ার গেমে আসক্ত হচ্ছে। এজন্য মন্ত্রী ওঠে পড়ে লাগলেন এসব বন্ধ করতে অথচ এর আগে মন্ত্রী কি শহরের প্রতিটা শিক্ষার্থীদের সুষ্ঠু বিকাশের জন্য একটা খেলার মাঠ নিশ্চিত করতে পেরেছেন? অনলাইনে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। গ্রামের প্রতিটি শিক্ষার্থীদের জন্য মন্ত্রী কি পেরেছেন একটা ডিজিটাল ডিভাইস এবং একটা টিভির ব্যবস্থা করতে?

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) নামে একটি প্রতিষ্ঠানের জরিপে দেখা গেছে করোনাকালে শিশু শ্রমিকদের সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে গেছে। নিম্ন আয়ের মানুষেরা সন্তানদের পড়াশোনার পরিবর্তে কাজে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন পরিবারকে সাপোর্ট দেয়ার জন্য। এছাড়া বেকারদের হাজার হাজার নিয়োগ পরীক্ষা আটকে আছে সরকারের তথাকথিত নিয়মের প্রহসনে। কিন্তু এসব মন্ত্রী আমলাদের ভাববার বিষয় না। মন্ত্রী আমলারা নির্বাচন এবং বিরোধী দল দমনে ব্যস্ত। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বললেন, ‘বিএনপির নেতিবাচক ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি অদৃশ্য শত্রæ করোনার চেয়েও ভয়ংকর।’ আবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ.কে.এম নুরুল হুদা বললেন, ‘করোনার চেয়ে নির্বাচন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বুঝতে পারছি না তাহলে কেন এই লকডাউন নামের প্রহসন? বোঝা গেলো নির্বাচন আর বিরোধীদল দমন করোনার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলেও শিক্ষার তেমন একটা গুরুত্ব নেই। তাই আশ্চর্যজনকভাবে করোনাকালে শিক্ষার হার বাড়লেও আমরা প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হই না। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে পড়াশোনা করেও আমরা চাকরি পাই না বা সাবলম্বী হই না। তাই আমরা উন্নয়নের রোল মডেল হলেও চৈনিকদের ধারের কাছেও যেতে পারি না। লেখক : শিক্ষার্থী

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত